আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মানুষ আদালতকে কিভাবে দেখে? মানুষের আদালত সম্পর্কে ধারণা কি? অথবা যারা আদালতে কাজ করে তাদের ধারণাই বা কতটুকু , মানুষের আদালত সম্পর্কে ধারনার বিষয়ে এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম,
প্রথমে আসি মানুষ আদালতকে কিভাবে দেখে? বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের চোখে আদালতের অবস্থান বিভিন্ন রকম।
এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা আদালতের চৌকাট মাড়ানোকে নিজের সম্মানের পিন্ডি উঠা মনে করে।

একদিন ‘আদালত’ একজন গ্রাম্য সালিশদারকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করে। আদেশ পেয়ে সেই অতি বয়োবৃদ্ধ সালিশদার আদালতে উপস্থিত হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কেঁদে কেঁদে বলা শুরু করলেন, তার এই বৃদ্ধ কাল অবধি তিনি কোনদিন আদালতের চৌকাট মাড়াননি কিন্তু এই মামলার বাদীর সালিশ করে তাকে আদালতের চৌকাটে পাড়া দিতে হলো ।‌
বুঝে নিলাম বৃদ্ধ আদালতে আসার ব্যাপারে অনেক রিজার্ভেশন ছিল।

আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা ভাবে যখন কোন মেয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচার চায় তখন সে মেয়ে অচ্ছুত হয়ে যায় । তাদের মনোভাব খানিকটা এরকম যে, যেই মেয়ে আদালতের কাঠগড়ায় উঠেছে তাকে আর যাই হোক ঘরের বউ করে আনা যায় না ! তবে এখন পর্যন্ত এই ট্যাবু দেশের আদালতপাড়া থেকে দূর করা সম্ভব হয়নি । যেখানে আদালত হলো মানুষের বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল, যে কোন ব্যক্তি তিনি পুরুষ অথবা মহিলা যে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হলে আদালতের দ্বারস্থ হবেন আর এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমরা এই স্বাভাবিক বিষয় টাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে এবং মানাতে সক্ষম হইনি।

লেখকেরা হাইপোথিসিস বলে, আদালত যে একটি পাবলিক প্লেস এবং যেখানে উন্মুক্ত বিচার হয় সেখানে যে কেউ চাইলে সেই বিচার অবলোকন করতে পারেন এই ধারণা দেশের সিংহভাগ মানুষের নেই। তবে যাদের আদালত সম্পর্কে যথাযথ ধারণা আছে, তারা আদালতকে যেভাবে শ্রদ্ধার চোখে দেখে সেটা অবলোকন করে মাঝে মাঝে অভিভূত হই।

আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা আদালতকে ভয় পায় তারা ধরেই নিয়েছে যে, আদালতের ভেতরে গেলে কিনা কি যেন ঘটে। তারা আদালতের চৌহদ্দীর ভেতরে আসতে নারাজ ।
এবার আসি আদালত সম্পর্কে মানুষের ধারণা নিয়ে, এক শ্রেণীর মানুষ ধারণা পোষণ করে আদালতের দূর্বাঘাসও নাকি টাকা দাবি করে! মানে ঘুষ চায়।

বাস্তব অবস্থা হলো, মক্কেল অর্থাৎ বিচার প্রার্থীরা আদালতের কর্মচারীদেরকে টাকা মানে ঘুষ দিতে না পারলে নিজেরা অশান্তি ও কাজ না হওয়ার টেনশনে থাকে, এক প্রকার জোর করেই আদালতের কর্মচারীর কাছে টাকা দিয়ে যান। আদালতের কর্মচারীরাও হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলেন না বলা যায়।

এই জায়গায় প্রচারণার দরকার আছে যে, আদালতের কর্মচারীকে কোন প্রকার উৎকোচ না দিলেও আদালতে কর্তব্যরত বিচারক সব সময় আইনানুগ আদেশ দিয়ে থাকেন। আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে আদালতের কর্মচারীরা কোন প্রকার প্রভাব বা ভূমিকা রাখতে পারে না।

তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, খাস কামরায় বসে থাকা বিচারকের পক্ষে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, যেমন বিচারকের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে বিচার প্রার্থীর কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে থাকেন এই ক্ষেত্রে সেই বিচারক মহোদয়ের পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব বলা যায়। কারণ যে প্রতারিত হচ্ছে তার পক্ষে বিচারক পর্যন্ত পৌঁছে বিষয়গুলো ভেরিফাই করা সম্ভব হয় না। আর এ কারণেই প্রতারকেরা প্রতারণা করছে, সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে আর বিচারক এবং বিচার বিভাগের দুর্নাম হচ্ছে।

লেখক পরিচিতি :
মাহবুবুর রহমান
সহকারী জজ, টাঙ্গাইল

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.