The Secrets of the Self- Muhammad Iqbal

মুসলিম জাহানের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ইকবাল পাকিস্তান রাষ্ট্ৰোদ্বোধনের উদগাতা বলে সর্বজন -স্বীকৃত । তাঁর বাণীই পাকিস্তানের জীবনদর্শনরূপে গণ্য হবার সব চেয়ে বেশী দাবী রাখে । কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানেও তাঁকে উপলব্ধি করবার কোনাে প্রত্যক্ষ উপায় নেই; কারণ তাঁর কাব্য উর্দু ও ফারসী ভাষায় রচিত । বাংলায় তাঁকে পেতে হলে কেবল অনুবাদেই পাওয়া যেতে পারে এবং সে কাজ অবিভক্ত বাংলায় সৈয়দ আবদুল মান্নান হাতে নিয়েছিলেন। তিনি ভার নিয়েছিলেন ইকবালের কাব্যবার্তাকে বাংগালীর ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দেবার । তারই ফলে তাঁর কৃত ‘আসরারে খুদী’র বঙ্গানুবাদ রূপ নিয়েছিল ।

ইকবালের ধর্মাশ্রিত আত্মোপলব্ধি স্বভাবতই প্রকাশ পেয়েছে গভীর তত্ত্বকথায় । তত্বকে কাব্যরূপ দেওয়া এবং তাকে রসােত্তীর্ণ করা সহজ কাজ নয় । ইকবালের মূল রচনা পাঠের অধিকারী যাঁরা, তাঁরা তাঁর কাব্যরস উপভােগ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন । অনুবাদকের কাজ এদিক দিয়ে আরও কঠিন; কারণ তাঁর তাে মূল রচনার বক্তব্য কোনােভাবে ক্ষুন্ন করা চলবেই না, তার উপর কাব্যভঙ্গীও যতটা সম্ভব বজায় রাখতে হবে । ইকবাল নিজেই বলেছেন :

কাব্য সৃষ্টি নয় এ মসনভীর লক্ষ্য
এর লক্ষ্য নয় সৌন্দর্য-পূজা,
আর প্রেম-সৃষ্টি
ওগো পাঠক,
দোষ দিওনা আমার সুরাপাত্র দেখে
গ্রহণ করো অন্তর দিয়ে ;
এই সুরার স্বাদ ।

ইকবালের মূল রচনার রূপ গদ্যকবিতা কিনা, বাংগালীর তা’ প্রত্যক্ষভাবে জানা নেই ; কিন্তু এর অনুবাদ শুধু গদ্য-কবিতার রূপই নিতে পারে । সৈয়দ আবদুল মান্নান কতৃক অনুবাদিত “আসরারে খুদী”র প্রথম অধ্যায়ের উদ্বোধনে আমরা পাই :

অস্তিত্বের রূপ হোল আত্মার পরিণাম,
সব কিছুই আত্মার রহস্য ।
যা দেখছো তুমি,
জাগ্রত হোল যখন আত্মা চৈতন্যে ,
প্রকাশ করল সে
চিন্তার বিশ্ব ।
নির্যাসে তার শত বিশ্ব লুক্কায়িত:
আত্ম-অনুভূতি আনয়ন করে বে -খুদীকে
প্রকাশ আলোকে ।

আর সে অধ্যায়ের শেষে আছে :

জীবন যখন শক্তি সঞ্চয় করে ,
আত্মা থেকে ,
জীবন-তটিনী বিস্তার লাভ করে ,
সমুদ্রের মহত্বে ।

প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে জীবনের মূলরূপে আত্মার পরিচয় বিধৃত । সাবলীল গদ্যকবিতায় এর যে অনুবাদ সৈয়দ আবদুল মান্নান করেছেন, সংবেদনশীল মনে তার মর্ম গ্রহণ করতে কোনােই অসুবিধা বােধ হবে না । এমনি করে অধ্যায়ের পর অধ্যায়ে উদঘাটিত হয়েছে খাঁটি মুসলিম জীবনদর্শন । সৈয়দ আবদুল মান্নানের অনুবাদে তার বলিষ্ঠতা কোথাও ক্ষুন্ন হয়েছে বলে পাঠকের মনে হবে না। একটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার : ইকবালের সাধনা ছিল মুসলিম মানসে আত্মার ইসলামানুসারী বিবর্তনকে ফুটিয়ে তােলা, হৃদয়ের পরতে পরতে তিনি তাকে ছন্দায়িত করতে চেয়েছিলেন । জীবনের সব কিছু আত্মার বিকাশের অধীন ; “আর্ট ফর আর্টস্ সেক” মতবাদকে তিনি বিনা দ্বিধায় অগ্রাহ্য করেছিলেন :

বিজ্ঞান ও কলার লক্ষ্য নয় জ্ঞান,
বাগিচার লক্ষ্য নয় কুঁড়ি আর ফুল ।
বিজ্ঞান হােল একটি যন্ত্র আত্মসংরক্ষণের,
বিজ্ঞান একটি পন্থা,
আত্মাকে শক্তিশালী করবার ।
বিজ্ঞান ও কলা জীবনের ভৃত্য,
যে ভৃত্য জন্ম নিয়েছে ও পালিত হয়েছে,
তার আপন গৃহে।

সৈয়দ আবদুল মান্নানের অনুবাদ স্বচ্ছ ; তাতে ইকবালের বাণীরূপ কোথাও বিকৃত বা অস্পষ্ট হয়েছে বলে সন্দেহ মনে আসবার অবকাশ পায় না।

প্রেম এলো আত্মাকে শক্তিশালী করতে: কোনােরূপ ভিক্ষাবৃত্তির স্থান নেই তাতে । নাই যেন প্রেমিকের আত্মবিলােপেরও: ইসলামের বৈশিষ্ট্য এখানে স্পষ্ট । প্রেমের শক্তিতে আত্না দুনিয়া জয় করবে : প্লেটোর ভাববাদিতার বিরুদ্ধে ইকবাল জানিয়েছেন সুস্পষ্ট প্রতিবাদ । কাব্য ও সাহিত্যও হবে বাস্তব প্রাণধর্মের অনুসারী । আত্মার বিকাশেরও রয়েছে বাস্তব, হাতেকলমে পালনীয় তিন দফা কার্যক্রম । তারপর নানা কাহিনীর ভিতর দিয়ে ইকবালের ধ্যান-ধারণার ইসলামের অন্তর্নিহিত দৃঢ়তা ও নিক্তিতে ওজন করা ন্যায়ান্যায়-বোধ ফুটে উঠেছে । এমনি করে লাভ হয়েছে এ দেশের মুসলিমের অনুসরণীয় জীবনদর্শন । তাকে পূর্ণতায় নেওয়ার সময় আসছে এই কবির বিশ্বাস ; এবং তারই জন্যে প্রার্থনায় বইখানি সমাপ্ত ।

ইসলামের আদর্শে রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিংশ শতাব্দীর দাবী পূর্ণ করতে পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । তার সাফল্য সম্বন্ধে অমুসলমান সমাজে সন্দেহও গােপন নেই। তবু তা’ করতে হলে সে রাষ্ট্র ও সমাজের বাণীরূপকে সামনে রেখেই তাতে ব্ৰতী হতে হবে । ব্যক্তিরও আত্মগঠন হবে তারই অনুসারী। ইকবাল গ’ড়ে তুলেছেন সে বাণীরূপ ; সৈয়দ আবদুল মান্নান বাংগালী মানসে তাকে জাগিয়ে দেবার সাধনায় বিফল হননি । তারপর অপেক্ষা কীসের, ফররুখ আহমদ বইখানির একটি কাব্যোপক্রমণিকায় সে কথা বলে দিয়েছেন :

দেরী শুধু তার জিঞ্জির খোলবার-
দেরী শুধু তার নীল নেশা ভোলবার…
তবু তোলপাড় শোনে সে তারার
উধাও বহ্নি – স্রোতে
দুর্মর বেগে পয়ামের সুরে ওঠে কোথা রণরণি।
ফারাণের বুকে বহুদূর পর্বতে ,
নতুন দিনের বিশাল পক্ষপানি ॥

সেই দিনেই মহাকবি ইকবাল হবেন জয়যুক্ত ; সৈয়দ আবদুল মান্নান কৃত অনুবাদের সার্থকতাও সে দিনের অভিমুখে প্রসারিত ।

লেখক পরিচিতি:
বসুধা চক্রবর্ত্তী
২০/৪, অশ্বিনী দত্ত রোড, কলিকাতা—২৯,
১৯৫০

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.