The source of Islam

ইসলামের উৎস কি? মানে আমরা ইসলাম কোথা হতে পেলাম বা পাই? যদি আমরা আমাদের পূর্বপুরুষ বা সমাজ থেকে পাওয়া অভ্যস্ত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করি(২:১৭০) তাইলে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নের বুঝাপড়ার জন্য আমাদের প্রথমেই স্পষ্ট করে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসলাম আর শরীয়াহর মাঝে ফারাক আছে। আমরা সাধারণত উৎসের সন্ধানে ইসলাম আর শরীয়াহকে গুলিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত।

ইসলাম(আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন) একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন আল্লাহর কাছে(৩:১৯)। অর্থ্যাৎ মানুষের জন্য আল্লাহ নির্ধারিত একমাত্র দ্বীন। এই দ্বীনের বহু রূপভেদ সম্ভব যা ভিন্ন ভিন্ন শরীয়াহ ও মিনহাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে(৫:৪৮)। এইখানেই দ্বীন ও ধর্মের পার্থক্যের জায়গাটাও স্পষ্ট হয়। ধর্ম মূলত শরীয়াহ ও মিনহাজের সুসমন্বিত রূপ, আর দ্বীন এর চেয়েও বৃহত্তর কিছু, সার্বজনীন কিছু। অর্থ্যাৎ আল্লাহর কাছে ভিন্ন ভিন্ন শরীয়াহ, মিনহাজ তথা ধর্ম বা দ্বীনের রুপভেদ গ্রহণযোগ্য কারণ তিনিই এই বৈচিত্র্যময় ধর্মগোষ্ঠীসমূহ সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগত স্বতন্ত্রতায় পরীক্ষা করতে চান বলে(৫:৪৮)।

ফলে দ্বীনের প্রশ্নে ও উৎপত্তিগত অর্থে মানুষ মূলত একক জাতি (২১:৯২, ৪৯:১৩) কিন্তু ধর্ম প্রশ্নে ও নৃতাত্ত্বিকতার প্রশ্নে মানুষ বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত(৫:৪৮, ৪৯:১৩)। এই বিভক্তি বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং আলাদা আলাদা বিশেষত্বের, বৈচিত্র‍্যের সৌন্দর্যের(১৩:০৪)।

বর্ণবাদ বা ধর্মবাদের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ণীত হওয়ার কোন সুযোগ নাই বরং মর্যাদা নির্ণীত হয় তাকওয়ার ভিত্তিতে(৪৯:১৩) আর তাকওয়া নির্ধারিত হয় বিশ্বাস ও কর্মের ভিত্তিতে(২:১৭৭)। তাই আল্লাহ ধর্ম নিয়ে বিরোধ না করে সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করতে বলেন(২:১৪৮, ৫:৪৮)। এরপরও যারা ধর্ম নিয়ে, বর্ণ নিয়ে বিরোধ করে তারা মূলত অজ্ঞতা(২:১১৩) ও গোষ্ঠীগত বিদ্বেষবশত তা করে(৪২:১৪) এবং মানুষের একক জাতিসত্তায় বিচ্ছিন্নতা তৈরী করে(২১:৯৩) যা আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দনীয়।

আল্লাহ ভিন্ন ভিন্ন শরীয়াহ-মিনহাজ তথা ধর্মীয় ঐতিহ্য আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীনকে চিহ্নিত করার মৌলিক বিবেচনায় তিনটি মৌলিক নীতির কথা উল্লেখ করেন। মৌলিক এই তিন নীতি হল আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস, আখিরাতে বিশ্বাস ও সৎকর্ম করা (২:৬২, ৫:৬৯)। আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসের সার হল শিরক না করা, আখিরাতে বিশ্বাসের সার হল অস্তিত্বের পার্থিব মাত্রিকতায় নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ না ভাবা বরং জবাবদিহিতার অধীন ও আল্লাহ একান্ত ইচ্ছার হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে কর্মের অবশ্যম্ভাবী পরিণামকে স্বীকার করা। সৎকর্মের সার হল হাওয়া তথা প্রবৃত্তিকে অনুসরণ না করা।

এখন আমরা খুঁজে দেখতে পারি ইসলামের উৎস কি? দ্বীনকে ইসলাম নাম দিয়েছে কোরান। কোরান বলে ইসলামের উৎস দুইটি। ইসলামের সবচেয়ে আদি ও অকৃত্তিম উৎস হল আল্লাহর ফিতরাত যার উপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন(৩০:৩০)। এইটা হল সাবজেক্টিভ উৎস। আর এর অবজেক্টিভ উৎস হল ঐশী বার্তা যা আল্লাহ রাসূলের উপর নাযিল করেন(৫:০৩, ৮১:১৯)। অবজেক্টিভিটি মূলত সাবজেক্টিভিটি থেকেই আসে। কোরানে আমরা ইসলাম পাই মূলত এই সূত্র ধরেই। কোরান রাসূলের প্রতিনিধিত্ব করার মধ্য দিয়েই(৬:১৯) ইসলামের উৎস হয়ে উঠে।

ফলে আমরা ইসলামকে তথা দ্বীনকে খুঁজে পেতে পারি দুই পন্থায়। এক, কোন ধর্মকে অনুসরণ করে তাতে বিদ্যমান ঐশী বার্তা থেকে(১০:৪৭)। আবার ব্যক্তিক প্রচেষ্টায় সত্যানুসন্ধ্যানে আত্মানুসন্ধ্যানের মধ্য দিয়ে(এইক্ষেত্রে কোরানের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হল নবী ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম)। কেননা প্রত্যেকের মধ্যেই সৃষ্টি হতেই দ্বীন মজুদ আছে যাতে ক্ষয়, লয় নাই(৩০:৩০)। দ্বীন খুজে পাওয়ার পথও মানুষের মধ্যেই মজুদ থাকে(৮৭:২-৩, ২০:৫০)।  অন্যভাবে বলা যায় কিতাব তথা ধর্ম মূলত অবজেক্টিভ স্পেস থেকে মানুষকে তার সাবজেক্টিভ স্পেসে দ্বীনের উৎসে নিয়ে যায়। তাই ধর্মে বিশ্বাস এত বেশি কেন্দ্রীয় ও মৌলিক প্রপঞ্চ। এই জন্যে কোরান বলে বিশ্বাস করা মানে আত্মকে অর্জন করা(৬:১২)।

লেখক পরিচিতি :
আব্দুল্লাহ আল মাছউদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.