মানবজাতির ইতিহাসের যে সময়ের কোন লিখিত দলিল নেই,সেই সময়কার ইতিহাসও আমরা জানতে পারি তৎকালীন সময়ের শিল্পকলার মাধ্যমে। মানুষ তার প্রয়োজনেই প্রথমে শিল্পকলার চর্চা শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে শিল্পকলা একটি বৃহৎ ও বিস্তৃত বিষয়ে পরিণত হয়। সৃজনশীল ব্যক্তিরা তাদের স্বীয় অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটান শিল্পের মাধ্যমে। চিত্রকলা শিল্পকলার একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। মানুষ যখন গুহায় বসবাস করত সেই সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মানুষ চিত্রকলার চর্চা করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে চিত্রকলার চর্চা করেছে যেগুলো স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। ইসলামি শাসনামলে মুসলিমরাও বিভিন্নভাবে চিত্রকলার চর্চা করেছে। যদিও একেশ্বরবাদী ধর্ম ইসলামে চিত্রাঙ্কন একটি বিতর্কিত বিষয়। এই বিতর্কের মূল বিষয় হল প্রাণীবাচক বিষয়বস্তুকে চিত্রে উপস্থাপন করা।

ইসলাম ধর্মমতে প্রাণীবাচক বিষয়বস্তু চিত্রে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আল কুরআনে মূর্তি তৈরির ক্ষেত্রে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চিত্রকলার উপরে নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নেই। সুরা আল হাশরের চব্বিশ বা শেষ আয়াতে বলা হয়েছে- “তিনিই আল্লাহ, তিনি সৃষ্টিকর্তা, তিনিই নির্মাতা এবং আকৃতিদানকারী।” এখানে মুসাব্বির শব্দটির অর্থ আকৃতিদানকারী। মূর্তি তৈরির প্রেক্ষাপটে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সুরা আল মাইদাহ এর ৯০ আয়াতে বলা হয়েছে “হে বিশ্বাসীগণ, মদ, জুয়া, মূর্তি এবং দৈবীক শক্তি বলে তীর নিক্ষেপ শয়তানের ঘৃণিত কাজ; অতএব এগুলো পরিহার করো।” হাদীসে চিত্রকলার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে সেটা শুধুমাত্র প্রাণীবাচক বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে। গাছপালা বা প্রাকৃতিক চিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে কোন নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়নি। চিত্রকলা সম্বন্ধে হাদীসের কয়েকটি উদ্ধৃতি হলো:

১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ বলেন, “আমি আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত পুরুষকে বলতে শুনেছি, মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শাস্তিপ্রাপ্ত সেই হবে যে চিত্রাঙ্কন করে”।

২. ইবনে আব্বাস বলেন, ” আমি নবী করিম (সাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, কেউ চিত্রাঙ্কন করলে সে শাস্তি ভোগ করবে এবং প্রাণ দান করার জন্য বাধ্য করা হবে, কিন্তু সে এতে প্রাণ দান করতে সক্ষম হবে না।”

৩. আবু তালহা বর্ণনা করেন যে, রাসূলে করিম (সাঃ) বলেন, “যে ঘরে চিত্র বা কুকুর আছে সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করেন না”।

৪. সাইদ বিন আবুল হাসান বলেন, আমি ইবনে আব্বাসের নিকট ছিলাম এমন সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি এসে বললো, ” হে আবুল আব্বাস, আমি একজন মানুষ যে তার হস্তশিল্প দ্বারা জীবীকা অর্জন করি এবং আমি এ সমস্ত চিত্রাবলী তৈরি করেছি”। ইবনে আব্বাস প্রত্যুত্তরে বললেন, “আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত রাসূলের নিকট হতে যা শুনেছি তা ব্যতীত আমি অন্যকিছু বলবো না। আমি তাকে বলতে শুনেছি: যে কেউ ছবি অঙ্কন করে তাতে জীবন দান করতে না পারলে তাকে আল্লাহ শাস্তি প্রদান করবেন; কিন্তু সে কোনটাতেই জীবন দান করতে পারবে না।” তা শ্রবণ করে চিত্রকরের মনে ভয়ের সঞ্চার হলো এবং তার চেহারা পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করলো। ইবনে আব্বাস তখন বললেন, “যদি তুমি চিত্রাঙ্কন থেকে বিরত না থাকতে পারো তাহলে তুমি বৃক্ষ এবং এরূপ প্রাণহীন বস্তু অঙ্কন করব”।

৫. ইমাম বুখারী আবু হুরাইরার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে, মদীনা শহরের একটি গৃহের দ্বিতলে একদিন আবু হুরাইরা এক ব্যক্তিকে চিত্রাঙ্কন করতে দেখেন এবং এতে খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যান। তিনি ঐ ব্যক্তিকে বলেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন, ” আল্লাহর সৃষ্টিকার্যকে অনুসরণ করে যে কার্যকলাপে নিয়োজিত থাকে তা অপেক্ষা নিকৃষ্ট মানুষ কে আছে? তারা একটি গমজাতীয় শস্য অথবা একটি পিপীলিকা অঙ্কিত করুক”।
এই হাদীসসমূহ হতে জানা যায় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাণীর প্রতিকৃতি অঙ্কন নিষিদ্ধ, কিন্তু পিপীলিকা একটি প্রাণীবাচক হওয়া সত্ত্বেও এর অঙ্কন নিষিদ্ধ নয়। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী যথা, লতা-পাতা, ফুল-ফল, গাছপালা এবং কৃষিজাত বিষয়বস্তু যেমন, গম, বার্লি, যব প্রভৃতির অঙ্কন স্বীকৃতি লাভ করেছে।

একারণে মুসলিম চিত্রকলার প্রাথমিক যুগের চিত্রে প্রকৃতি, গাছপালা, ফুল,লতা-পাতা ও বিভিন্ন ধরণের জ্যামিতিক নকশা প্রাধান্য পেয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে প্রাণী ও মানুষের ছবিও চিত্রকলায় অনেক অঙ্কিত হয়েছে। প্রাণীবাচক বৈশিষ্ট্যটি ইসলামী চিত্রকলায় প্রাণী হিসেবে আসেনি। এসেছে সৌন্দর্যকরণের উপকরণ হিসাবে,চিকিৎসা বিজ্ঞান বা যন্ত্রকৌশলের প্রায়োগিক জ্ঞান হিসেবে বা খলিফা ও খলিফা তনয়দের রাষ্ট্র পরিচালনায় উপদেশমূলক তত্ত্ব হিসাবে।অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে যখন সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান ভাণ্ডার আরবী ভাষায় অনূদিত হয় তখন মহানবীর(সাঃ) বাণী “জ্ঞান চর্চার জন্য প্রয়োজনে চীন দেশ ভ্রমণ কর” সবচেয়ে বেশি উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।এই উদ্দীপনার বশবর্তী হয়েই বিভিন্ন সভ্যতার বহু জ্ঞানগ্রন্থ পাহলভী এবং সিরীয় ভাষার মাধ্যমে আরবী ভাষায় অনূদিত হয়। অনুবাদের সময় বা পরবর্তীতে অনুবাদ গ্রন্থকে আকর্ষণীয় ও দৃশ্যমানে উপদেশমূলক করার জন্য ছবি সম্বলিত করা হয়।

প্রাক-উমাইয়া যুগে চিত্রশিল্পের কোনো নিদর্শন পাওয়া না গেলেও পরবর্তী যুগে চিত্রকলার উপর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা পালন অপেক্ষা খণ্ডনেই বেশি কার্যকরিতা লক্ষ্য করা যায়। একথা নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে যে, বৈদেশিক প্রভাব ব্যতিরেকে মুসলিম চিত্রকলার আবির্ভাব একেবারেই অসম্ভব ছিল। মুসলিম চিত্রকলার উন্মেষ ও বিকাশে বাইজান্টাই,সাসানীয়,ম্যানিকিয়ান ও চীনা শিল্পকলার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।উমাইয়া যুগে মুসলিম সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে শিল্পকলার উন্মেষ হয়।এসময় স্থাপত্যে নকশা ও অলংকরণ হিসেবে মোজাইক ও ফ্রেসকো পদ্ধতিতে চিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। ধর্মীয় স্থাপত্যের অলংকরণে বাইজান্টাইন এবং সাসানীয় বিষয়বস্তু অ্যাকেন্থাস পত্র,ফুল,পাতা,পাখা,হার নকশা ইত্যাদি লক্ষ্য করা যায়।কিন্তু তৎকালীন স্নানাগার বা প্রাসাদের দেয়াল এবং মেঝেতে মানুষ ও পশুপাখির বিভিন্ন ধরনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।কিন্তু এই চিত্রসমূহ কোনোভাবেই পূজনীয় বিষয় বলে বিবেচিত হয়নি।

ইসলামী চিত্রকলার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটেছে পাণ্ডুলিপি চিত্রায়ণের মাধ্যমে। পাণ্ডুলিপিতে চিত্রকলা কখন প্রবেশ করেছে তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও অনুবাদের সময় থেকেই যে তা আরম্ভ হয়েছে তা অনুমান করা যায়।তবে যেহেতু কোরআনই ইসলামের আদি গ্রন্থ এবং কোরআন শিক্ষাই প্রাথমিক শিক্ষা তাই গ্রন্থাকারে কোরআনের সজ্জিতকরণই সম্ভবত প্রথম আরম্ভ হয়েছিল। কোরআনের সজ্জিতকরণে অ্যারাবেস্ক,মেড্যালাকৃতি বা জ্যামিতিক নকশা ব্যবহারের মাধ্যমে পাণ্ডুলিপি চিত্রায়ণের কাজ শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়।প্রারম্ভিক সময়ে শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থসমূহ চিত্রায়ণের কারণে প্রাণীবাচক ছবির দৃশ্য ধর্মীয় মূল্যবোধে বাধা দেয়নি। ডায়োসকোরিডিস্ এর ডি ম্যাটেরিয়া মেডিকা, অজ্ঞাত লেখকের কালীলা ও দিমনা, সিওডো-গ্যালেনের কিতাব আদ-দিরইয়াক(বিষনাশক গ্রন্থ),আল-জাযারীর কিতাব ফী মা’রিফাত আল-হিয়াল আল-হান্দাসিয়া(যন্ত্রকৌশল জ্ঞান গ্রন্থ) বা রাসা’ইল ইখওয়ান আস-সাফার(ইখওয়ান আস-সাফার রচনাবলী) পান্ডুলিপিতে প্রাণীজগতের ছবি জ্ঞানার্থে চিত্রায়িত হলে তাতে অধর্মীয় কোন চিন্তা-চেতনা অনুভব করা যায় না। তবে প্রারম্ভিক সময়ে চিত্রায়িত জ্ঞান বিজ্ঞান বিষয়ক এসব চিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তবহীনতা। এতে আইডিয়োলিজম আছে, কিন্তু রিয়েলিজম নেই। ‘কালীলা ও দিমনা’ (দুটি শিয়ালের নাম) প্রকৃতপক্ষে রাজন্যবর্গের প্রশাসনিক দর্শন। রোমান ডায়োসকোরিডিস আরব চেহারায় আরব পোশাকে সজ্জিত হয়ে ছাত্রদের জ্ঞান দান করছেন বা পাখি ও পশুর কাউন্সিলে কাক ও সিংহ যথাক্রমে সভাপতিত্ব করছেন এগুলো কাল্পনিক জগতের ধ্যান ধারণা। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিষয় ছাড়াও ইতিহাস, কাব্য, উপদেশমূলক গল্প, রাজা ও রাজদরবারের কাহিনী, প্রেম কাহিনী, যুদ্ধের কাহিনী এবং ধর্মীয় কাহিনীর পান্ডুলিপি চিত্রায়ণ হয়েছে পুরো মুসলিম শাসনআমল জুড়ে।

উমইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমীয়, মামলূক, মোঙ্গল, তৈমুরীয়, সাফাভী, উসমানীয় এবং ভারতের সুলতানী ও মোগল শাসনামলে চিত্রকলার চর্চা হয়েছে এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে উৎকর্ষ লাভ করেছে। অনেক প্রণী ও মানুষের ছবি আঁকা হয়েছে এসব পান্ডুলিপি ভিত্তিক চিত্রকর্মে। একই পান্ডুলিপি বিভিন্ন চিত্র ঘরানার চিত্রশিল্পীদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ পেয়েছে। আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য এবং পোশাক ও জীবন যাপনের ধারা ফুটে উঠেছে এসব চিত্রে। চরিত্রগুলোর চেহারায়ও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। ধর্মীয় বিষয়বস্তুর চিত্রায়নের ক্ষেত্রে নবী রাসূলদের মাথার পিছনে হ্যালো ব্যবহার করা হয়েছে। মিরাজনামায় মহানবী (সাঃ) এর মিরাজ গমনের দৃশ্য অঙ্কন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে অগ্নিশিখার মাধ্যমে মহানবী (সাঃ) এর মুখমণ্ডল অস্পষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া ভারতীয় মুসলিম চিত্রকলার বিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে মোগল আমলে প্রতিকৃতি অঙ্কন বিকাশ লাভ করে। সম্রাট ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অসংখ্য প্রতিকৃতি পাওয়া যায়। তাছাড়া বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতিও অঙ্কিত হয়েছে।

ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী প্রাণির ছবি অঙ্কন নিষিদ্ধ থাকলেও ইসলামী শাসনামলে এই নিষেধ খুব একটা মান্য করা হয়নি। বিভিন্ন শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থ চিত্রায়ন হয়েছে বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করার জন্য। ইসলামী চিত্রকলার মূল লক্ষ্য নান্দনিকতা। যদিও ইসলামী চিত্রকলা আইডিয়েলিজমকে গ্রহণ করে রিয়েলিজমের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। এজন্যই ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইসলামী চিত্রকলা বিকাশ লাভ করেছে। তবে অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো মুসলিমরা শিল্পকলাকে ধর্মের হাতিয়াররূপে ব্যবহার করেনি।

লেখক পরিচিতি:
মুনিরা দিলশাদ ইলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.