The Political Philosophy of Muhammad Iqbal: Islam and Nationalism

که ملت از وطن است سرود بر سر منبر
عربی است ا چه بی خبر از نام محمد

ওই শোন, সে ঘােষণা করছে বাণী।
মসজিদের মিম্বর থেকেঃ
"মিল্লাত গড়ে ওঠে ওয়াতনের বুনিয়াদে"--- আহা! কি করে সে অবজ্ঞা করছে, দেখ,
মােহাম্মদ আল-আরাবীর মর্যাদা!

এই কবিতাংশে ‘মিল্লাত’ শব্দটি আমি ‘কওম’ (জাতি) অর্থে ব্যবহার করেছি। আরবী ভাষায়, বিশেষ করে কুরআন মজিদে ‘মিল্লাত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে নিঃসন্দেহে কানুন ও ধর্ম অর্থে; কিন্তু আধুনিক আরবী, ইরানী ও তুর্কী ভাষায় মিল্লাত শব্দটির জাতি অর্থে প্রয়ােগেরও বহু নজির রয়েছে। আমার রচনাবলীতে আমি সাধারণতঃ শেষােক্ত অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করেছি। যেহেতু মিল্লাত শব্দটির তাৎপর্য কোনাে দিক দিয়েই আমাদের বিবেচ্য বিষয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে না তাই এ বিতর্কের দিকটা পুরােপুরি বাদ দিয়ে আমি ধরে নিই যে, দেশের ভিত্তিতে জাতি গড়ে ওঠে বলে মওলানা হোসায়েন আহমদ মত প্রকাশ করেছেন। বস্তুতঃ মওলানার এ উক্তির বিরুদ্ধেও আমার কিছু বলার নেই। যখন মত প্রকাশ করা হয় যে, আধুনিক কালে দেশের ভিত্তিতেই জাতি গড়ে ওঠে এবং সেই সংগে ভারতীয় মুসলিমদেরকে এই মতবাদ স্বীকার করে নিতে উপদেশ দেওয়া হয় তখন অবশ্য আপত্তি উত্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই ধরনের উপদেশ আমাদের মনের সামনে জাগিয়ে দেয় জাতীয়তাবাদের পাশ্চাত্য ধারণা। তার একটি দিক সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করা মুসলমানদের পক্ষে পুরােপুরি অপরিহার্য। মওলানা এরূপ ধারণার দিকে চালিত হয়েছেন যে, কোনাে
রাজনৈতিক দলবিশেষের লক্ষ্য প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে আমি আপত্তি তুলেছি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। প্রকৃত ব্যাপারটি মােটেই তা নয়। ভারতে ও মুসলিম জাহানে যখন জাতীয়তাবাদের ধারণা তেমন পরিচিত হয়ে উঠেনি তখন থেকেই আমি এর বিরােধিতা করে এসেছি। গোড়াতেই ইউরােপীয় লেখকদের রচনাবলী থেকে এ ধারণা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলাে যে, ইসলামের ধর্মীয় ঐক্যকে চূর্ণবিচূর্ণ করে বহুধাবিভক্ত করবার জন্য ইউরােপের সাম্রাজ্যবাদী চক্রের অতি বড়াে প্রয়ােজন ছিলাে এই কার্যকরী হাতিয়ারের অর্থাৎ মুসলিম দেশসমূহে জাতীয়তাবাদের ইউরােপীয় ধারণা প্রচারের; আর এ পরিকল্পনা সফল হয়েছিলাে মহাযুদ্ধের আমলে। এখন অবস্থা এতটা চরমে পৌঁছে গেছে যে, ভারতের কোন কোন ধর্মীয় নেতাও এই ধারণা সমর্থন করছেন। বাস্তবিকই অদ্ভুত কালের এই বিবর্তন! আগে আধা পশ্চিমী ধরনের শিক্ষিত মুসলিমেরা ইউরোপের এই যাদুতে সম্মােহিত ছিলাে, এখন সে অভিশাপ নেমে এসেছে ধর্মীয় নেতাদের উপরেও। সম্ভবতঃ আধুনিক ইউরােপের ধারণা তাঁদের কাছে আকর্ষণীয় বোধ হচ্ছে কিন্তু আফসোস !

نو نه گردد کعبه را رخت حیات
لات و منات گر ز افرنگ آيدش

কখনাে নতুন করে গড়ে ওঠেনা ।
কাবার জীবন-পরিচ্ছদ,
আমদানী হােক যতােই লাত ও মানাত ।
পশ্চিমের দেশ থেকে ।

এইমাত্র আমি বলেছি যে, জাতিসমূহ দেশকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বলে মওলানা যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে আপত্তি উত্থাপনের কিছু নেই । এর কারণ, সুদূর অতীত থেকে সব জাতিরই সংযােগ হয়েছে দেশের সাথে এবং দেশের সংযােগ হয়েছে জাতির সাথে। আমরা দুনিয়ার যে অংশে বাস করি, তা ভারত নামে পরিচিত বলেই আমরা সবাই ভারতীয় এবং এ নামেই আমাদের পরিচয়। চীনা, আরবী, জাপানী, ইরানী প্রভৃতির বেলায়ও সেই একই ব্যাপার। দেশ (country) শব্দটি এ বিবৃতিতে ব্যবহার করা হয়েছে একটা ভৌগোলিক পরিভাষা হিসাবে; সুতরাং ইসলামের সাথে তার কোনাে সংঘাত নেই। সময়ের সাথে সাথে তার সীমানা পরিবর্তিত হয়। সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত বার্মার বাসিন্দারা ছিলাে ভারতীয়, বর্তমানে তাঁরা বর্মী ( Burmese )। এই অর্থে প্রতিটি মানুষই তার জন্মভূমিকে ভালোবাসে এবং তার ক্ষমতা অনুযায়ী তার জন্য সে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে।হুব্বুল অয়াতন মিনাল ঈমান (দেশপ্রেম ঈমানের অন্তর্গত)। কথাটিকে রসূল করিম (দঃ)-এর হাদীস মনে করে কোন কোন চিন্তাবােধহীন লােক তা’ দিয়ে এই ধারণা সমর্থন করেন কিন্তু তাদের সমর্থন অনেকটা অনাবশ্যক ;স্বদেশের প্রতি প্রেম মানুষের স্বাভাবিক সহজাত বৃত্তি এবং তাকে পুষ্ট করার জন্য কোনাে তত্ত্বের প্রয়োজন নাই।

আজকের দিনের রাজনৈতিক সাহিত্যে অবশ্যি জাতির ধারণা নিছক তৌগােলিক নয়। এটা বরং মানব-সমাজের একটা নীতি ; সুতরাং এটা একটা রাজনৈতিক ধারণা (political concept)। যেহেতু ইসলামও মানব-সমাজের একটি বিধান তাই রাজনৈতিক ধারণা হিসাবে ব্যবহৃত ‘দেশ’ কথাটির সাথে ইসলামের সংঘাত রয়েছে। মওলানা হােসায়েন আহমদ অপেক্ষা বেশী করে আর কেউ জানেন না যে, মানবীয় সম্পর্কের নীতিতে ইসলাম কোনাে আপােস-ব্যবস্থার অবকাশ (modus vivendi) রাখে না এবং মানুষের সমাজকে নিয়ন্ত্রিত করবার জন্য রচিত অপর কোনাে কানুনের সাথে ইসলাম আপোস করতে তৈরী নয়। বস্তুতঃ ইসলাম ঘোষণা করে যে, ইসলামী কানুন ব্যতীত অন্যবিধ যে-কোনাে কানুন অসম্পূর্ণ ও গ্রহণের অযোগ্য। এ নীতি থেকেই জন্ম নেয় ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট কতকগুলো রাজনৈতিক বিতর্ক। দুটান্তস্বরূপ, মুসলমানরা কি অন্যান্য জাতির সাথে ঐক্য সহকারে বাস করতে পারে না? দেশের লক্ষ্য অর্জন ও এবম্বিধ অন্যান্য ব্যাপারে কি বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হ’তে পারে না ? আমি অবশ্যি প্রয়োজনবােধে এ প্রশ্নগুলোর আলোচনা বাদ দিয়ে যাচ্ছি, কারণ বর্তমান মুহূর্তে আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে মওলানার বিবৃতির কেবলমাত্র এমীয় দিকেরই বিচার করা।

যুক্তিবাদী পর্যালোচনা ছাড়া অভিক্ততা দ্বারাও ইসলামের উপরিউক্ত দাবীর সত্যতা প্রমাণিত হয়। প্রথমতঃ, মানব-সমাজের উদ্দেশ্য যদি হয়
জাতিসমূহের শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করা এবং তাদের সামাজিক সংগঠনকে একক সমাজ-বিধানে রাপান্তরিত করা, তাহলে কোন ব্যক্তিবিশেষ ইসলামী ব্যতীত অন্যবিধ সমাজ-বিধানের চিন্তাও করতে পারে না। প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে এ -ই । কারণ, কুরআন শরীফ আমি যতােটা অধ্যয়ন করেছি তাতে বুঝেছি ইসলাম কেবল ব্যক্তির নৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে না ,তার আরাে লক্ষ্য রয়েছে মানব জাতির সামাজিক জীবনের ক্রমিক ও বুনিয়াদী বিপ্লব ঘটাবার দিকে—যাতে তার জাতীয় ও গোষ্ঠীভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধন করে তার জায়গায় জন্ম দেয়া যায় এক বিশুদ্ধ মানবীয় চেতনার ধর্মসমূহের ইতিহাস চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, প্রাচীনকালে ধর্ম ছিল জাতীয় রূপসম্পন্ন ,যেমন, মিসরীয়, গ্রীক ও ইরানীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। পরে তা গোষ্ঠীভিত্তিক রূপ পরিগ্রহ করলো, যেমন দেখা গেছে ইহুদীদের বেলায়। ঈসায়ী মতবাদ শিক্ষা দিয়েছে যে, ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত ও ঘরোয়া ব্যাপার। ধর্ম যখন ঘরোয়া বিশ্বাসের সমর্থক হয়ে গেলাে তখন ইউরোপ চিন্তা করতে শুরু করলো যে, মানুষের সামাজিক জীবনের দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রেরই। ইসলাম এবং একমাত্র ইসলামই মানব-জাতির কাছে সবার আগে এই বাণী বহন করে আনলো যে, ধর্ম জাতীয় ও গোষ্ঠীভিত্তিক নয়, ব্যক্তিগত ও ঘরোয়াও নয়, বরং তা হচ্ছে বিশুদ্ধ মানবীয় এবং তার লক্ষ্য হচ্ছে মানবজাতির যাবতীয় স্বাভাবিক বৈষম্য সত্ত্বেও তাকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করে তােলা। এমন একটা পদ্ধতি নিছক ঈমানের উপর গড়ে তােলা যায় না। আর মানব-জাতির মানসিক ভাবপ্রবণতা ও চিন্তাধারার মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় বিধানের এই-ই হচ্ছে একমাত্র পন্থা। সম্প্রদায়ের সংগঠন ও সংরক্ষণের জন্য এ ঐক্য একান্ত অপরিহার্য। কি সুন্দর গেয়েছেন মওলানা রুমীঃ
هم دلی از هم زبانی بهتر است

"অন্তরের ঐক্য শ্রেষ্ঠতর,
যবানের ঐক্য থেকে।"

অন্য যে-কোন ব্যবস্থাই হবে ধর্মবিরােধী ও মানব মর্যাদার পরিপন্থ । ইউরােপের দৃষ্টান্ত দুনিয়ার সামনে রয়েছে। ইউরােপের ধর্মীয় ঐক্য যখন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো এবং উক্ত মহাদেশের জাতিসমূহ পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাে তখন জাতীয় জীবনের বুনিয়াদ খুঁজতে শুরু করলো ইউরােপীয়রা । জাতীয়তার ধারণার মধ্যে ইউরােপ খুঁজে পেলাে সে বুনিয়াদ। কিন্তু তাদের নির্বাচিত পন্থার পরিণতি কি দাঁড়িয়েছে ? তার পরিণতিতে এসেছে লুথারের সংস্কার ব্যবস্থা, রুগ্ন যুক্তিবাদের যুগ এবং ধমীয় ও রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে বিচ্ছেদ—প্রকৃতপক্ষে সংঘর্ষ । এসব শক্তি ইউরােপকে কোন দিকে চালিত করেছে ? ধর্মহীনতা, ধর্মীয় সংশয়বাদ ও অর্থনৈতিক সংঘাতের দিকে। মওলানা হােসায়েন আহমদ কি চান যে, এশিয়ায় সেই একই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি হােক? মওলানা মনে করেন, আধুনিক দুনিয়ায় ভূমিই হচ্ছে জাতির প্রয়ােজনীয় বুনিয়াদ। নিঃসন্দেহে এই-ই হচ্ছে আজকালকার দিনের সাধারণ ধারণা। কিন্তু এটাও সুস্পষ্ট যে, এ বুনিয়াদ তার নিজের দিক থেকেই অসম্পূর্ণ। এ ছাড়া আরাে অনেকগুলাে শক্তি রয়েছে যার সমন্বয়ের প্রয়ােজন হয় একটা জাতি গড়ে তুলতে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ধরা যায়–ধর্মের প্রতি ঔদাসীন্য, দৈনন্দিন রাজনৈতিক সমস্যায় আত্মসমাহিত হওয়া প্রভৃতি। এ ছাড়া আরাে কতকগুলাে দিক রয়েছে সেই জাতির ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার জন্য যেগুলােকে রাজনীতিকরা নিজেরাই নির্ধারণ করে নেন। মওলানা এ সত্যটিকে উপেক্ষা করে গেছেন যে, যদি বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায় কোন জাতির অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে সাধারণতঃ সম্প্রদায়গুলাের সত্তা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সেই জাতির প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে একটিমাত্র সাধারণ দিক, ধর্মহীনতা অবশিষ্ট থেকে যায়। ধর্মীয় নেতাদেরকে বাদ দিলেও যে সাধারণ মানুষ ধর্মকে মানব জীবনের একটি প্রয়োজনীয় দিক বলে বিবেচনা করে সেও চায় না যে ভারতে এমনি একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হোক । মুসলিমদের কথা বলতে গেলে, সরলমনা বলেই তারা জাতীয়তাবাদের ধারণার পরিণাম সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত নয়। যদি কতক মুসলিম ভুল করে মনে করে যে, রাজনৈতিক ধারণা হিসাবে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ হাতে হাত মিলিয়ে চলতে পারে তাহলে আমি মুসলিমদেরকে একটি সময়োপযােগী হুশিয়ারী জানাতে চাই যে, এ পন্থা শেষ পর্যন্ত ধর্মহীনতার দিকেই চালিত হবে, আর যদি তা না-ও ঘটে তাহলেও এর অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হিসাবে ইসলাম রূপান্তরিত হবে একটি নিছক নৈতিক আদর্শে এবং তার সমাজবিধানের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শনে কোন বাধা থাকবে না।

মূল:মুহাম্মদ ইকবাল
তর্জমা: সৈয়দ আবদুল মান্নান
তথ্য সূত্র: [মওলানা হোসায়েন আহমদ মাদানীর এক বিবৃতির জবাবে ১৯৩৮ খৃস্টাব্দে ৯-ই মার্চ ‘ইহসান’ পত্রিকায় এ বিবৃতি প্রকাশিত হয় ।
এটাই মুহাম্মদ ইকবালের শেষ রাজনৈতিক বিবৃতি ।লেখাটি তিন পর্বে প্রকাশ করা হবে ।]

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.