Recep Tayyip Erdoğan-Abdul Kader Zilani

শত বছর ধরে চলতে থাকা কামালবাদের (সেকুলারিজম) পিঠে যিনি পেড়েক ঠুকে দিয়েছেন । পশ্চিমা নেতারা ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পালিত আরব শাবকদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে এই এরদোগান । তুরস্কের কট্টর পন্থী কামালবাদ সরিয়ে তিনিই ইসলামী মতাদর্শ বাস্তবায়ন করেছেন ।বিশ্বে প্রভাবশালী মুসলিম নেতাদের মধ্যে শীর্ষে এই এরদোগান । গোটা পৃথিবী যখন পশ্চিমা সভ্যতার দাসত্ব করছে ঠিক তখন তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠে আওয়াজ দিয়েছেন ,ফিলিস্তিন সমস্যা, কাতার অবরোধ, সৌদি ইসরাইল ঘনিষ্ঠতা,আরব ইসরাইল চুক্তি, জেরুজালেম প্রসঙ্গ,ইয়েমেনে সৌদি হামলা ,ইরান- রাশিয়া মিত্রতা, আমেরিকার -ন্যাটো -তুরস্ক বৈপরীত্য, কাশ্মীর ও রোহীঙ্গা ইস্যু এসব কিছুতেই তিনি প্রকাশ্যে তুরস্কের অবস্থান বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন ।যদিও শত বছরের লুজান চুক্তিতে আটকে আছে তুরস্ক ।

চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়,তুরস্ক তার আগের আরব প্রদেশগুলোর ওপর কোনো দাবি করতে পারবে না এবং সাইপ্রাসে ব্রিটিশদের দখল এবং ডডেকানিজের ওপর ইতালীয় অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে। অন্য দিকে মিত্ররা তাদের তুরস্কের কুর্দিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি পরিত্যাগ করবে। সাথে সাথে তুরস্ক আর্মেনিয়ার স্বত্ব ত্যাগ করবে। আর তুরস্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করার দাবি ত্যাগ করবে মিত্র শক্তি এবং তুরস্কের আর্থিক বা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ চাপাবে না। এজিয়ান সাগর এবং কৃষ্ণ সাগরের মধ্যে বসফরাস প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে কোনো প্রকার ফি নিতে পারবে না তুরস্ক। কিন্তু এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালে । কি হতে পারে চুক্তির মেয়াদ শেষে ?তবে কি তুরস্ক অট্যোমান শক্তিতে বলিয়ান করার মানসে উজ্জীবিত হচ্ছে ? দিরিলিস আর্তুগ্রুল নামে বিশ্ব ব্যাপী যে সংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার চলছে এর উদ্দেশ্যই বা কি ? তবে সব কিছু জানা যাবে ২০২৩ সালের লুজান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ।

এরদোগান ফোবিয়া এখন বিরুদ্ধ শিবিরে খুবই আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় । বিশেষ করে পশ্চিমা ও তাদের আরব মিত্রবাহিনীর কাছে এরদোগান এখন প্রকাশ্য শত্রু হয়ে আবির্ভূত হয়েছে । এ বছর নভেম্বরে আমেরিকায় নির্বাচন হবে। ডেমোক্রেট ব্লকের জো বাইডেন কে উদ্দেশ্যে করে ডোনাল্ট ট্রাম্প বলেছেন এরদোগান একজন দক্ষ দাবারু খেলোয়াড় তার সঙ্গে কৌশলে পেরে ওঠা তোমার পক্ষে সম্ভব না! তাই বোঝাই যাচ্ছে আমেরিকা এরদোগান ফোবিয়ায় অলরেডি আক্রান্ত হয়ে গেছে । এদিকে এরদোগানও ইরাক লিবিয়া, কাতার ,মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান নিয়ে আলাদা ব্লক তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন । তবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ও পরমাণু নিয়ে তার মন্তব্যে কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় । তবে কি পাকিস্তান তুরস্ককে পরমাণু শক্তি অর্জনে সহযোগিতা করবে ? তবে এর উত্তরও লুজান চুক্তি শেষ হওয়ার ন্যায় ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখতে হবে ।

৩০ আগস্ট তুরস্ক পালন করল ৯৮ তম বিজয় দিবস ।১৯২২ সালে গ্রিক বাহিনী তুরস্কের হাতে পরাজিত হয় । বিজয় দিবসের বক্তৃতায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে উত্তেজনা নিয়ে এরদোগান বলেন,পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বিশেষ করে ভয় দেখিয়ে বা ব্লাকমেইল করলে তুরস্ক এসব হুমকিতে মাথা নত করবে না । আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি থেকে উদ্ভূত তার অধিকার রক্ষা করতে থাকবে ।
সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে গ্রিসের সমুদ্র উত্তেজনা চলছে ।
গ্রিসের পক্ষ থেকে আইওনিয়ান সাগরের জলসীমা দ্বিগুণ করার ঘোষণার পর এরদোগান যুদ্ধের আভাস দিয়েছেন । সমুদ্র সীমা ছয় নটিক্যাল মাইল থেকে বারো নটিক্যাল মাইল বৃদ্ধি করার কারণে আঙ্কারা সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর আগে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মিশর ও সাইপ্রাস বড় জ্বালানির সন্ধান পেয়েছে । এরপর তুরস্ক গ্যাসের খনির সন্ধ্যান পেলো । তুরস্ক গ্রিসকে ছেড়ে দিয়ে কথা বলছে না ।

আবার লিবিয়ায় হাবতার সরকার ও বিদ্রোহীদের যুদ্ধ লেগেই আছে। মিসর সরকার সেখানে হাবতারকে সহযোগিতা করছে অন্যদিকে তুরস্ক বিদ্রোহীদের বুদ্ধি সেনা ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে । লিবিয়ার মাটিতে তুরস্ক ও মিশর মুখোমুখি অবস্থানে আছে বললে ভুল হবে না । আরব বিশ্বে কামালবাদ(সেকুলারিজম) ও ইসলামী আদর্শের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে ।১৯৭৯ সালে মিসর এবং ১৯৯৪ সালে জর্ডান ইসরাইলের সাথে চুক্তি করে । সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে আরব্য আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ও চুক্তি সম্পাদন করতে সম্মত হয়েছে ।

এখানে দুটি বিষয় একদম স্পষ্ট,

এক .

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে কামালবাদের অনুসারীরা হোয়াইট হাউজ মুখাপেক্ষি এবং ট্রাম্প তাদের রাজনৈতিক পিতা ।

দুই .

এরদোগান আরব থেকে রাষ্টদূত ফিরিয়ে আনা ও সম্পর্ক স্থগিত রাখার কথা বলেছেন ।

মিশর সরকার সে দেশের ইসলামী মতাদর্শের রাজনৈতিক সংগঠন ব্রাদারহুডের উপর নির্যাতন ও জুলুম করার সেখানে এক নয়া কামালবাদের উত্থান ঘটেছে । মুসলিম ছদ্মবেশী জেনারেল সিসি ইহুদিবাদী ইচ্ছার বাস্তবায়ন যেমন করছে তেমনি স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে চলেছেন।অন্যদিকে সৌদি যুবরাজেরা মার্কিনীদের মিত্র হয়ে যুগের পর যুগ রাজতন্ত্রের নামে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত করছে । মধ্যপ্রাচ্য ও আরব জুড়ে এই সব মোনাফিকেরা একদিকে যেমন হোয়াইট হাউজ মুখি অন্য দিকে নেসেট মুখি ।

বিশ্ব পরিস্থিতি যখন এই ঠিক তখন মুসলিম বিশ্ব নেতা হয়ে মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন এরদোগান । বিশ্ব নেতারা জাতিসংঘে যখন নিজ নিজ দেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন এরদোগান তখন ফিলিস্তিন মুসলিমদের পরাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরেছেন । মুসলিম নেতারা যখন বিবেকের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এরদোগান তখন মুসলিম নেতাদের ঘুমের ভাব ধরা বিবেক জাগানোর চেষ্টা করেছেন । কিভাবে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে। কিভাবে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে । কিভাবে দমন পীড়ন ও নির্যাতন করা হয়েছে ।

৮৬ বছর জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর পুনরায় মসজিদ হিসেবে আয়া সোফিয়ায় আজান ও নামাজ আদায় হওয়ার মাধ্যমে নতুন করে এরদোগান ইসলামী মতাদর্শের ইঙ্গিত দিলেন ।এরদোগান বললেন খুব শিগগিরই আল আকসা মসজিদ ইহুদিদের থেকে মুক্ত করা হবে । কিন্তু তারপর? তবে কি মক্কা মদিনা তার পরবর্তী টার্গেট! তবে এটা ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখলাম । গোটা পৃথিবীর মুসলমানরা যখন নির্যাতন ও জুলুমের স্বীকার ।

একজন অভিভাবক, একজন নেতার অপেক্ষায় পৃথিবী যখন তাকিয়ে ঠিক তখন ফুটবল মাঠ থেকে অভিষেক হলো রাজনীতির ময়দানে এক নেতার । ১৯৫৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের কাসিম পাশা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে তুরস্কের কৃষ্ণসার অঞ্চলের রিজ শহরে । ১৯৬০ সালে তিনি কাসিম পাশা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন । এবং ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের ইমাম হাতিপেতে পড়াশোনা করেন । ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আঞ্চলিক পর্যায়ে ভালো ফুটবলার হিসেবে নাম কুড়িয়েছেন।কিন্তু সব ছেড়ে তরুণ বয়সেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন । উচ্চমাধ্যমিক পাঠ শেষে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় তিনি তুর্কি স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনে যোগ দেন । এবং ১৯৭০ সাল ন্যাশনাল স্যালভাতিন পার্টির ছাত্র সংগঠনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন । ১৯৮০ র মিলিটারি ক্যু এর পর ১৯৮৪ সালে ওয়েলফেয়ার পার্টি গঠন করা হয় ,সেখানে তিনি ইস্তাম্বুল শহরের প্রধান নির্বাচিত হন । ১৯৯৪ সালে প্রথম কোন ইসলামপন্থী হিসেবে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন । তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ও বিচক্ষণ হিসেবে প্রমান করতে সক্ষম হন ।

একজন কবির কবিতা পাঠের অপরাধে ১৯৯৭ সালে কারাবরণ করেন । আদালত তাকে দশ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন । কবিতার লাইন গুলো ছিল এ রকম,

“মসজিদ গুলো আমাদের ঘাটি
গম্বুজ গুলো আমাদের শিঁরনাস্ত্র
আর মিনার গুলো আমাদের বেয়নেট
এবং আমাদের ইমামগন মোজাহিদ”

জনসমক্ষে এই কবিতার লাইন গুলো পাঠ করার অপরাধে তাকে দণ্ডিত করা হয় । তার এই শব্দ গুলো কামালবাদের আনুগত্য অস্বীকার করার অপরাধে অভিযুক্ত করে এই শাস্তি দেওয়া হয় ।২০০১ সালে এরদোগানের নেতৃত্বে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল্লাহ গুলের উপস্থিতিতে জাস্টিস এন্ড ডেভলপমেন্ট (একে পার্টি) প্রতিষ্ঠা করেন ।২০০২ দুই সালের নভেম্বরের নির্বাচনে ৩৪.২ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হন । কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেননি । তাই পরবর্তীতে একটি আসনে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন । এবং ২০০৩ সাল থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সাফল্যের সাথে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত তুরস্কের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হয়ে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
বিশ্ব নেতা হিসেবে আবির্ভূত হোক এরদোগান ।
লুজান চুক্তি শেষে নতুন কিছু ঘটবে তুরস্কে ।
এবং তার আভাস বিশ্ব জুড়ে দেখা যাবে ইনশাআল্লাহ ।

লেখক পরিচিতি : আবদুল কাদের জিলানী
সম্পাদক

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.