Shikwa-Muhammad Iqbal

কাজী নজরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুলতান এর অনুবাদের ভূমিকা লেখেন । তিনি মোহাম্মদ সুলতানের অনুবাদ সম্পর্কে লিখেছিলেন :

” সুলতান- এর ‘শেকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া’র কাব্যানুবাদ পড়লাম আসল ‘শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া ‘পাশে রেখে । অনুবাদের দিক দিয়ে এমন সার্থক অনুবাদ আর দেখেছি বলে মনে হয় না । ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ইকবালের অপূর্ব সৃষ্টি এই ‘শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া ‘। উর্দূভাষী ভারতবাসীর মুখে মুখে আজ শেকওয়ার বাণী । সেই বাণীকে রূপান্তরিত করা অত্যন্ত দুরূহ মনে করেই আমি এতে হাত দিতে সাহস করিনি । কবি সুলতানের অনুবাদ পড়ে বিস্মিত হলাম । অরিজিনাল ভাবকে এতটুকু অতিক্রম না করে এর অপরিমাণ সাবলীল সহজ গতি -ভঙ্গী দেখে । পশ্চিমের বোরকা পরা মেয়েকে বাংলার শাড়ীর অবগুন্ঠনে যেন আরো বেশী মানিয়েছে ।”

             শিকওয়া

কেন বলো ত্যজি লাভের আশা
ক্ষতিই সহিব নির্বিকার,
ভবিষ্যতের ভুলিয়া ভাবনা
অতীত চিন্তা করিব সার ?
বিভোর হিয়ায় শুনে যাব আর
গা’বে বুলবুল ব্যথা -বেভুল !
রব নির্বাক জড়ের মতন
আমি কি গো মূক ফুল-মুকুল ?

কন্ঠে আমার শক্তি অপার ,
সেই সে সাহসে করিব ভাই ,
এ মাটির মুখে নিন্দা খোদার ;
ধিক ! মোর মুখে পড়ুক ছাই !

তব অনুরাগী বলিয়া অতুল
কীর্তি লভেছি বিশ্ব- মাঝ,
নিবিড় ব্যথার কন্ঠে আমার
দুঃখের কাহিনী ধ্বনিছি আজ
লাগিলে আঘাত বীণার তন্ত্রী
তুলে গো যেমন আকুল তান ,
বক্ষ ছাপিয়া আসিছে কান্না,
গাই যে আঘাতে বেদন-গান ।

নিন্দা কতই করিয়াছে প্রভু
যারা চিরকাল আস্থাহীন,
গ্লানির কথা শুনে লও দু’টো,
বলিবে গো আজ ভক্ত দীন ।

কোন সে আদিম প্রভাত -বেলায়
আছিলে গো তুমি বিদ্যমান,
বাতাসবিহীন বাগিচায় যেন
কুসুম সদ্য বিকাশমান !
চির-চঞ্চল সমীরণ বিনা
বলহে ক্ষমতা কার সে আর ,
দিতে ছড়াইয়া দিক দিগন্তে
ফুলের অতুল গন্ধ- ভার ?

বাঁধিতে নিখিলে একতার ডোরে
পরাণ আমার ছিল আকুল ,
নহে কি তোমার প্রিয় রসূলের
ভক্তেরা হায় ছিল বাতুল ?

যত দিন আমি আসি নাই হেথা ,
দুনিয়াটা ছিল আজব ঠাঁই!
পাষাণে পাদপে দেবতা বলিয়া
মূর্খ মানব পূজিত তাই ।
তারেই মানুষ মানিত তখন
আপনার চোখে দেখিত যায়,
অ-দেখা খোদায় বল তো তাহারা
ঈমান আনিল কেমনে হায় ?

হয়তো আজিও হইবে স্মরণ
কাহারা সাধিল এ কাজ তোর,
সে কি নহে এই কুলিশ-কঠোর
মুসলমানের বাহুর জোর ?

বসতি করিত সেলজুল হেথা
ছিল তুরস্কে তুরানীও ,
চৈনিক ছিল চীন দেশ জুড়ে,
ইরান দেশেতে সাসানীও ।
ধরণীর এই বুক হতে কভু
ইউনানীরাও পড়েনি বাদ ;
খ্রীস্টভক্ত আরও ইহুদ
কতনা জাতির ছিল আবাদ ।

কেহ কি তোমার মহিমার লাগি ‘
করেছিল তেগ উত্তোলন ?
বিকল তোমার সৃষ্টিযন্ত্রে
বাঁধিল নিয়মে কোন সে জন ?

তব নাম ল’য়ে বুঝিয়াছি একা
আমি মুসলিম অমিতবল,
কখনো ভূতলে মেতেছি সমরে ,
আলোড়িয়া কভু সিন্ধু- জল ।
আযান দিয়াছি উচ্চে কখনো
গির্জা শিখরে ইয়োরোপের,
দাঁড়ায়ে বক্ষে আফরিকার
তপ্ত শাহারা মরুভূমের ।

হেলায় তুচ্ছ করিয়াছি সদা
শাহন-শাহার তখত ও তাজ,
বক্ষ প্রসারি তলোয়ার ছায়ে
কলেমা পড়েছি জোর আওয়াজ ।

ধরিয়াছি প্রাণ অকাতরে শুধু
সহিতে নিত্য সমর ক্লেশ ;
মহিমায় তব বরিতে মরণ
করি নাই কভু দ্বিধার লেশ ।
ধরি নাই মোর অসি খরসান
লাগিয়া তুচ্ছ বাদশাহীর ,
লভিবারে ধন ফিরিতাম কি হে
করতলে সদা লইয়া শির ?

সম্পদ লাভে বীর মুসলিম
করিত যদি হে পরাণ পণ-
মূর্তিবেপারী কেন বা না হ’য়ে
মূর্তি করিল চির নিধন ?

দাঁড়ায়েছি যবে রুখিয়া সমরে
ফিরি নাই কভু পশ্চাতে
সম্মুখ হতে ভীম শার্দুল
পলায়েছে মোর শঙ্কাতে ।
উন্মাদ আমি হইতাম হায়
তোমা হতে কেহ ফিরালে মুখ ,
ছার তরবারি ভুলিয়া মরণ
তোপের সমুখে পেতেছি বুক ।

আঁকিয়া দিয়েছি বক্ষে সবার
ছবি পবিত্র তৌহীদের,
তরবারি- তলে শুনায়েছি বাণী
নির্ভয়ে তব একত্বের ।

হলায় উপাড়ি ফেলেছিল কেবা
লৌহ-কবাট খায়বরের ?
বাহুবলে কা’র হইল বিজিত
বিরাট শহর কাইসারের ?
কাহারা চূর্ণ করিল তোমার
মানুষের গড়া মূর্তি সব ?
কাফের -বাহিনী দলিল চরণে
জিনিয়া কাহারা ভীম আহব ?

ইরান দেশের হোমের আগুন
ফুৎকারে কা’রা নিভাইল?
খোদার মহিমা চরাচরময়
বল সে কাহারা প্রচারিল ?

প্রাণের অধিক বেসেছিল ভাল
মরতে তোমায় কোন সে জন ?
সমর ঝঞ্ঝা বহিত মাথায়
করি তব তরে পরাণ -পণ ?
জগৎ- বিজয়ী কা’র তরবারি
জগৎ- পালক হইল ফের ?
জাগিয়া উঠিল দুনিয়া আবার
ধ্বনি শুনি কার তাকবীরের ?

মাটির প্রতিমা শঙ্কাতে কার
গণিত সদাই ঘোর প্রমাদ ?
লুন্ঠিয়া ভূমে কাঁপি থর থর
হাঁকিত আল্লা-হু আহাদ ।

তথ্য সূত্র: শিকওয়া- মুহাম্মদ ইকবাল
তর্জমা: মুহাম্মদ সুলতান

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.