‘জরথুস্ত্র’ অামার ভাইয়ের সবচেয়ে ঘনিষ্টতর ব্যক্তিগত সৃষ্টি । তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সুনিবিড় অভিজ্ঞতা, তাঁর বন্ধুত্ব, আদর্শ, আনন্দ, তিক্ত ব্যর্থতা এবং দুঃখের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে এই গ্রন্থে ।এ সবের উপরে তাঁর সবচেয়ে মহত্তম আশা এবং সুদূরতম লক্ষ্যের প্রতিছবি এতে রূপ নিয়ে ডানা মেলেছে উর্ধ্বলোকের পানে। জীবনের প্রথম শুরু থেকেই তাঁর মনের মধ্যে দানা বেঁধেছিল জরথুস্ত্রের রূপ। একবার আমাকে বলেছিলেন, ছেলে বয়স থেকেই তিনি জরথুস্ত্রকে স্বপ্নে দেখে আসছেন ।
জীবনের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন তাঁর, এই স্বপ্নের প্রতিচ্ছায়াকে । ‘কিন্তু অবশেষে’, এ বিষয়ে একটি মন্তব্যে তিনি বলেন “আমার এই কল্পলোকের জীবটির রূপে জরথুস্ত্রকে রূপান্তরিত করে একজন পার্শীকে সম্মানিত করতে হলো। ইতিহাসের সমুদার সম্যক উপলব্ধির ব্যাপারে পার্শীদের স্থান সবার আগে। তাদের দৃষ্টিতে বিবর্তনের প্রত্যেকটি স্তর ছেপে বিরাজ করেছেন এক একজন পয়গম্বর এবং প্রত্যেক পয়গম্বরের ছিল অাপন ‘হাজার’—হাজার বছর ব্যাপী রাজত্ব।”

জরথুস্ত্রের সমস্ত মত এবং ব্যক্তিত্ব ছিল আমার ভাইয়ের প্রথম জীবনের ধ্যানধারণা। ১৮৬৯-৮২ সালের যে সব লেখা তাঁর মৃত্যুর পরে বের হয়েছে সেগুলি যারা যত্নের সঙ্গে পড়েছেন তারা স্থানে স্থানে এমন সব উক্তি দেখতে পাবেন যেগুলি জরথুস্ত্রের চিন্তা এবং আদর্শেরই প্রতিফলন । উদাহরণ স্বরূপ ১৮৭৩-৭৫ সালের কথা বলা যায় । এ সময়ের সব লেখাতেই তিনি মহামানবের আদর্শ খুব স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছেন । “We Philologists” শীর্ষক লেখাটিতে তাঁর নিম্নলিখিত উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য।

তিনি বলছেন, “একটা জাতিকে লোকে কেমন করে সম্যকভাবে প্রশংসনীয় এবং মহিমান্বিত করতে পারে ? এমন কি গ্রীকদের মধ্যেও বিশেষ ভাবে ব্যক্তিগণকেই কেবল গণনার মধ্যে আনা হয়েছে।”

‘গ্রীকগণ অপূর্ব ভাবে এবং বিশেষ করে এক জরুরী কারণে জন্ম দিয়েছে এক বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিকে । এটা কেমন করে সম্ভব হয়েছিল ? সেটা নিবিষ্ট মনে প্রণিধান করার মত একটি প্রশ্ন ।

“ব্যক্তি মানুষের সৃষ্টির ব্যাপারে জনতার যে সম্পর্ক কেবল সেটার প্রতি আমার যা কিছু আগ্রহ । গ্রীকদের সামাজিক অবস্থা আশ্চর্যজনক ভাবে ব্যক্তিত্ব সৃষ্টির স্বপক্ষে ছিল, এর মানে এ নয় যে সেখানকার জনসাধারণ সৎ ছিল বলেই মহৎ ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব সম্ভব হয়েছিল—বরঞ্চ জনতার দুষ্ট প্রবৃত্তির সংঘাতের ভিতর দিয়েই সম্ভব হয়েছিল সেটা ।”

“সুযোগ -সাপেক্ষ প্রচেষ্টার সাহায্যে মহান ব্যক্তিবর্গের জন্ম সাধন করা যেতে পারে ; অার ইতিপূর্বে যারা দৈবক্রমে মহৎ ব্যক্তিত্বের অধিকার পেয়েছে তাদের অপেক্ষা পৃথক এবং উচ্চতর হবে এই মহান ব্যক্তিদের জীবন । এইভাবে আমরা অপূর্বতর মহান ব্যক্তিদের আবির্ভাব সম্বন্ধে আশান্বিত হতে পারি।”

মহামানব গড়ে তােলা সম্বন্ধে নীটশের যে ধারণা সেটা তাঁর প্রথম জীবনে সমুদ্ভূত আদর্শেরই নতুন রূপ । এতে তিনি বলেছেন, “মানবজাতির উদ্দেশ্য নিহিত থাকা চাই উর্ধ্বতম ব্যক্তিসৃষ্টির কাজে । তাঁর ‘Schopenhauer as Educator’ বইতে তিনি বলেছেন, ”মানবজাতি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে চলবে মহামানুষ সৃষ্টি করবার জন্য । এ ছাড়া তার থাকবে না অন্য কোন কর্তব্য।” কিন্তু সে সময়ে যে সব আদর্শ তিনি সম্মানের সঙ্গে পুষে রেখেছিলেন, পরে সে সব আর খুব উঁচু স্তরের মানব হিসাবে তাঁর কাছে স্থান পায়নি। তার ভবিষ্যৎ আদর্শ মানুষ -মহামানবের আগমনী ঘিরে তিনি রচনা করেন বিকাশের আবরণ । কে বলতে পারে গৌরবের কোন উঁচু শিখরে আরােহণ করবে মানুষ। তাই নতুন মূল্যবোধের আলােকে আমাদের মহত্তম আদর্শ ত্রাণকর্তা যীশুর মূল্যকে যাচাই করার পর কবি তাঁর জরথুস্ত্রের মধ্যে বিশেষ জোরের সঙ্গে বলছেন;
“আজ অবধি কখনও একজন মহামানবের অভ্যুদয় হয়নি। বৃহত্তম এবং ক্ষুদ্রতম, এই উভয় মানুষকে দেখেছি উলঙ্গ।”
“তারা পরস্পর এখনও একান্তভাবেই এক রকমের । এমন কি তাদের মধ্যে সবচেয়ে মহান ব্যক্তিকেও দেখেছি একান্তভাবেই সাধারণ রূপে।”

‘মহামানুষ গড়ে তোলা’ কথাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল বােঝা হয়েছে । এ ক্ষেত্রে ‘গড়ে তোলা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে নতুন এবং উঁচু মূল্যবোধের দ্বারা রূপান্তর ঘটান -ব্যবহার এবং মতবাদের নীতি ও নির্দেশ রূপে মূল্যবোধ তার শাসন বিস্তার করবে মানবজাতির উপর । সাধারণ ভাবে মহামানবের আদর্শকে সঠিক বােঝা যেতে পারে নীটশের অন্যান্য ধারণার সমবায়ে । যথা, the Order of Rank, the Will to Power, and the Transvaluation of All Values, তাঁর মতে দুর্বল এবং ভীরুদের আত্ম-অনুশোচনা থেকে খ্রীস্টমতবাদের উৎপত্তি । তাই যা কিছু সুন্দর, শক্তিমান, উন্নত, ক্ষমতাপ্রবণ- এবং শক্তি থেকে যে সব গুণের জন্ম- এবং ফলতঃ যে সব শক্তি জীবনকে আগে বাড়িয়ে নেয় অথবা উপরে তোলে—সে সবকে খ্রীস্টমতবাদ অত্যন্ত গুরুতরভাবে দাবিয়ে রেখেছে । অতএব এখন মানুষের উপরে আরােপ করতে হবে একটি নতুন মূল্যমান ; সে হচ্ছে শক্তিমান, ক্ষমতাশালী এবং গৌরবান্বিত মানুষ । জীবনের ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ এবং মহামানবেন সমুচ্চ স্তরে উন্নীত । এই মহামানবকে আমাদের সামনে ধরা হয়েছে বিস্ময়কর ক্ষমতার আবেগ সহকারে । তাকে খাড়া করা হয়েছে আমাদের জীবনের, আমাদের আশা এবং আকাঙক্ষার লক্ষ্য রূপে । পুরাতন মূল্যবোধের নীতি যত দুর্বল, দুঃখী এবং পীড়িত জীবনের সহায়ক সব গুণগুলিকেই কেবল উপরে তুলেছে ; আর এতে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল, দুঃখী এবং আধুনিক জাতিকে । অতএব এর বিপরীত এই শক্তিমানের মূল্যনীতির প্রভাবে গড়ে উঠবে স্বাস্থ্যবান, শক্তিধর, জীবন্ত এবং সাহসী সব আত্মা—এবং তারা হবে জীবনের মহান গৌরব । সংক্ষেপে মূল্য-নির্ধারণের এই নতুন নীতির অন্তর্নিহিত মর্ম হবে, ‘ক্ষমতা থেকে যা কিছু আসে সব ভালো- এবং দুর্বলতা থেকে যা কিছুর উৎপত্তি সব মন্দ।’

এ আদর্শকে কোন কাল্পনিক চিত্ররূপে গ্রহণ করা উচিত হবে না। এটা এমন কোন বাষ্পীয় আশাও নয় যে এর রূপায়ণ সম্ভব হতে পারে কেবল আজ থেকে বহু হাজার বছর পরের কোন সুদূর ভবিষ্য কালে অথবা ডারউইনিয়ান মত অনুসারে এটা এমন কোন নতুন রকমের স্পেসিসও নয় যে এর সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতে পারি না ; অতএব এর জন্য কোন চেষ্টা করাই বৃথা । প্রকৃতপক্ষে এর সফলতা মানুষের জন্য বাস্তবভাবেই সম্ভব । বর্তমান কালের মানুষ তার সমস্ত আত্মিক এবং শারীরিক শক্তির দ্বারা একে সার্থক করে তুলতে পারে । অবশ্য এজন্য তাদের গ্রহণ করতে হবে নতুন মূল্যবোধ ।

গ্রীক এবং রোমানদের দেবত্বে আরোপিত জীবন ও চিন্তাধারার সমস্ত মূল্যমান খ্রীস্টবাদের প্রভাবে বেশ স্বল্প কালের মধ্যেই একটি সম্যক রূপান্তরিত মূল্যমান পেয়েছিল—এ দৃষ্টান্ত ‘জরথুস্ত্র’-প্রণেতার দৃষ্টি এড়ায়নি। একটা পুনর্জীবিত গ্রীক-রোমান মূল্যবােধের নীতি কি ( একদা খ্রীস্টবাদের দু’হাজার বছরের সাধনায় অধিকতর সুষ্ঠু এবং গভীরতা লাভ করেছে ) একটা পরিগণিত কালের মধ্যে এ রকম আরেকটা বিপ্লব ঘটাতে পারে না ? এর জন্য চাই এক মানবতার অভ্যুত্থান । সে হবে আমাদের নতুন বিশ্বাস এবং আশা । তারি সৃষ্টিকাজে অংশ নেওয়ার জন্যই কি জরথুস্ত্র আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন না ?

এ বিষয়ে তার ব্যক্তিগত মন্তব্যে ‘মহামানব’ শব্দ ব্যবহার করেছেন (এবং সব সময় এক বচনে)। ‘আধুনিক মানুষ ‘-এর বিরুদ্ধে তাকে খাড়া করা হয়েছে এক পরিপূর্ণ রূপ সুগঠিত আকারে । তিনি সর্বোপরি জরথুস্ত্রকেই ‘মহামানব’-এর দৃষ্টান্ত রূপে প্রদর্শন করেছেন। তাঁর “Ecce Homo গ্রন্থে তিনি বিশেষ যত্নের সঙ্গে উচ্চতম মানবের আবির্ভাব মুহূর্তের পূর্বাবস্থা ও অবশ্যম্ভাবী লক্ষণগুলি সম্বন্ধে আমাদের ওয়াকিবহাল করেছেন। ‘The Joyful Wisdom’ গল্পে তিনি বলেছেন,

“এই আদর্শ মানবকে বুঝতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা চাই সেই উন্নত দৈহিক অবস্থা সম্বন্ধে যার উপর নির্ভর করে এর অভত্থান । এই অবস্থাকে আমি বলি মহান স্বাস্থ্যসম্পন্নতা । ‘The Joyful Wisdom’ এর পঞ্চম বইয়ের শেষের দিকে আমি এর যে অর্থ ব্যাখ্যা করেছি জানি না তার চেয়ে অধিক সহজ এবং অধিক ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা কি হতে পারে । সেখানে আমি বলেছি,

‘আমরা নতুনেরা -নামহীন, বুঝতে-কঠিন-আমরা’—সেখানে বলেছি—’অনাগত অনাস্বাদিত ভবিষ্যের প্রথম সন্তান আমরা —অামরা চাই এক নতুন লক্ষ্য -এক নতুপ পথ। যথা, আমরা চাই এক নূতন স্বাস্থ্যসম্পন্নতা, শক্তিমান, তীক্ষ্ণতর, কঠিনতর, হিম্মতদার এবং সর্বযুগের স্বাস্থ্যসম্পন্নদের অপেক্ষা অধিক আনন্দময় স্বাস্থ্যসম্পন্নতা । আত্মা যার আকুল হয়েছে ইতিপূর্বে স্বীকৃত সব মূল্য এবং বাসনাকে জানবার জন্য—আকুল হয়েছে এই আদর্শের ‘ভূমধ্যসাগর’ ঘুরে তার সব কূলের সব বন্দরের খবর নিতে -আকুল হয়েছে আপন নিবিড়তর অভিজ্ঞতার আলােকে আদর্শকে জয় করার এবং আবিষ্কার করার আনন্দ অনুভব করার জন্য -অধীর হয়েছে সেই আনন্দ অনুভব করার জন্য যে আনন্দ অনুভব করে শিল্পী, সাধু, আইনপ্রবর্তক, জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, ধার্মিক, পয়গম্বর এবং পুরা যুগের অনিশ্চিত বিশ্বাসী অাল্লাপরায়ণ ব্যক্তি-আর সে আনন্দের জন্য সবার উপরে চাই পরম স্বাস্থ্যসম্পন্নতা; এমন এক স্বাস্থ্যসম্পন্নতা যা মানুষ কেবল অধিকার করেই সন্তষ্ট থাকে না, ধারাবাহিকভাবে আহরণ করে -অবশ্য তাকে আহরণ করতে হয়—কারণ মানুষ অফুরন্তভাবে তাকে পুনরায় উৎসর্গ করে—অবশ্য তাকে উৎসর্গ করতে হয় । তারপর এইভাবে দীর্ঘদিন পথ চলার পর আমরা আদর্শের দুরন্ত নাবিকগণ, বুদ্ধিমান অপেক্ষা অধিক হিম্মতদার এবং বারংবার জাহাজ-ডোবা ,অসহায়, তথাপি বিপজ্জনক ভাবে স্বাস্থ্যবান ; পুন:সব সময় স্বাস্থ্যবান -তখন মনে হবে এ সব ক্ষতিপূরণ স্বরূপ আমাদের সামনে রয়েছে আরও বৃহৎ অনাবিষ্কৃত দেশ—আজও তার সীমা ধরা পড়েনি কোনও মানুষের চোখে – সমস্ত জানা দেশ, সমস্ত জানা আদর্শের সমস্ত কোল ছাড়িয়ে অনেক অনেক দূর তার বিস্তৃতি । সে এক দেশ অসীম সৌন্দর্যের সম্পদে অতি-উদ্বেলিত-আশ্চর্য, সন্দেহ-দোদুল, ভয়ানক এবং স্বর্গীয়—তাকে লাভ করার উদ্বেগ অার পিপাসা ছাড়িয়ে যায় সংযমের সীমা—আহা! তারপর আর কিছুই আমাদের পরিতৃপ্ত করতে পারে না !

“এমনি এক দৃষ্টিভঙ্গি আর ক্ষুধা যখন আমাদের বিবেক আর চেতনায় দানা বেঁধে উঠল তখন কেমন করে আমরা আর পরিতৃপ্ত থাকতে পানি বর্তমান কালের মানুষকে নিয়ে ? পরিতাপের কথা; তবু অপরিহার্যরূপে সত্য, এ কালের মানুষের সব উঁচু লক্ষ্য এবং আশার পানে তাকাই ক্বচিৎ প্রদমিত কৌতুকের চোখে । অথবা আদৌ তাকিয়ে দেখিনে তাদের ;আর একটি আদর্শ আমাদের সামনে আত্মবিস্তার করেছে—এক আশ্চর্য, আকর্ষণীয় আদর্শ, ভয়ানক বিপদে আচ্ছন্ন । এ আদর্শ গ্রহণের জন্য আমরা কাউকে উৎসাহ দিতে পারি না। কেননা, সহসা তাকে গ্রহণ করার অধিকার কারও আছে তেমন স্বীকৃতি আমরা দি না। এ সেই দুঃসাহসী আত্মার আদর্শ যে হেলা ভরে খেলা করে (অর্থাৎ স্বাভাবিক ভাবে উদ্বেলিত পর্যাপ্ততা এবং ক্ষমতা থেকে) সবকিছুর সঙ্গে যা অাজ অবধি পবিত্র, কল্যাণ, অননুভনীয় অথবা স্বর্গীয় । যে উচ্চতর ধারণাকে লােকে গ্রহণ করেছে, তাদের মূল্যমান রূপে তার কাছে সেটা ইতিপূর্বেই বাস্তবে সূচনা করেছে বিপদ, ধ্বংস, নীচতা, অথবা প্রশ্রয়, অন্ধতা, অথবা অস্থায়ী আত্মবিস্মৃতি । কিন্তু, মানবতাপূর্ণ মহামানবীয় মঙ্গল ও কল্যাণ প্রায় সব সময়ে দেখা দেবে অমানুষিক আকারে । অমানুষিক মনে হবে যখন তাকে ধরা হবে অতীতের সব গুরুত্বপূর্ণতার পাশে—যখন ধরা হবে তাকে অতীতের সব পবিত্রতার স্বরূপ স্বভাব, কথা, সুর, চেহারা, নীতি, অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতির শ্রেষ্ঠতম স্বাভাবিক সত্য নাটকের আকারে । তারপর তার মহান গুরুত্বপূর্ণতা শুরু হয় —স্থাপন করা হয় জিজ্ঞাসার যােগ্য প্রশ্ন-চিহ্ন—তখন পরিবর্তিত হয় সেই আত্মার নিয়তি -সময়ের কাঁটা ঘুরে যায়—মর্মান্তিক নাটকের আরম্ভ হয়,,,,,”

জরথুস্ত্রের চিত্র এবং এ গ্রন্থের প্রধান চিন্তাভাবনাগুলি গ্রন্থকারের নানা স্বপ্নে ও লেখায় অনেক আগে থেকেই রূপ পরিগ্রহ করেছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘জরথুস্ত্র বললেন’ (Thus Spake Zarathustra) গ্রন্থের উদ্ভব হয় ১৮৮১ সালের আগস্ট মাসে সিলস-ম্যারিয়াতে । অনন্তকাল ধরে সমস্ত পদার্থের পুনঃ পুনঃ প্রত্যাবর্তনের বিশ্বাস নিয়ে তিনি কবিতার ভাষায় তাঁর নতুন মতবাদ তুলে ধরেন। এই ধারণার প্রথম উপলব্ধি সম্পর্কে তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘Ecce Homo’ তে নিম্নলিখিত বর্ণনা পাওনা যায়।

“আমার এই গ্রন্থের মৌলিক ধারণা হচ্ছে অনন্ত কাল ধরে সমস্ত পদার্থের পুনঃ পুনঃ প্রত্যাবর্তন, বিশ্বাসবাদী দর্শনের এই সর্বশ্রেষ্ট কাঠামটি প্রথম রূপ পরিগ্রহ করে ১৮৮১ সালের আগস্ট মাসে । এক পাতা কাগজের উপরে আমি সেই ধারণাটি লিখেছিলাম। তাতে আমার এ রূপ মন্তব্য ছিলঃ মানুষ এবং কাল ছাড়িয়ে ৬০০০ হাজার ফিট উপরে । সেদিন আমি চলেছিলাম সিলভাপ্লানা হ্রদের ধারে বনের পথ দিয়ে ; তারপর আমি থেমে দাঁড়ালাম সুরলির অনতিদূরে এক বিরাট পিরামিড স্তম্ভ পাহাড়ের পাশে । সে সময়ে এই চিন্তাটি নাড়া দিয়ে উঠল আমার মনে । পিছন দিকে তাকালে এখন দেখতে পাই এই ভাবটি উদয় হওয়ার ঠিক দু’মাস আগে এর অসার ইঙ্গিত এসেছিল আমার রুচিগত পরিবর্তনের অাকারে–বিশেষ করে সঙ্গীতের ব্যাপারে । এমন কি সমস্ত ‘জরথুস্ত্র’ -কে একটি সঙ্গীতমূলক রচনা বলে বিবেচনা করা কিছু অসম্ভব ব্যাপার নয়। এ গ্রন্থ সৃষ্টির অপরিহার্য অবস্থা হচ্ছে শ্রুতিশিল্পে আমার নবজন্ম । ভিসেনজার কাছে একটি ছােট পাহাড়ে বাড়ীতে ১৮৮১ সালের বসন্তকাল কেটে গেল। সঙ্গে আমার বন্ধু পিটার গাস্ট এবং আরও একজন যিনি পুনরায় জন্ম নিয়েছিলেন আমরা দেখতে পেলাম আমাদের মাথার উপরে যে সঙ্গীত উড়ে বেড়াচ্ছে—তার পাখায় পালকে ঝলমল করছে আগের চেয়ে অধিক সুন্দর অধিক উজ্জ্বল আলাে।”

১৮৮১ সালের আগস্ট মাসে আমার ভাই অনন্ত প্রত্যাবর্তন মতবাদের শিক্ষা ব্যক্ত করার সঙ্কল্প নেন এবং জরথুস্ত্রের মুখ দিয়ে এক অপূর্ব কবিতার ভাষায় তিনি তাকে রূপ দেন। এ সময়ের বিভিন্ন টুকিটাকি লেখার মধ্যে একটি পাতা আমাদের চোখে পড়ে। এতে দেখা যায় ‘জরথুস্ত্র বললেন’ গ্রন্থের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা । লেখাটি এইরূপ :

“মধ্যদিন এবং অনন্ত বাঁচবার নতুন পথের নির্দেশক -স্তম্ভ”

এর নীচে লেখা হয়েছে: –
“ঊর্মি হ্রদের তীরে জরথুস্ত্র জন্ম নিলেন। তিরিশ বছর বয়সে তিনি ঘর ছেড়ে বের হলেন। গেলেন আরিয়া প্রদেশে। দশ বছর একাকী জীবন যাপন করলেন পাহাড়ে-পর্বতে—রচনা করলেন ‘জেন্দাবেস্তা’।”

‘জ্ঞানের সূর্য আরেক বার দাঁড়াল মধ্যদিনের মাঝখানে—তার আলাের তলায় বিড়ে পাকিয়ে আছে অনন্তের ভুজঙ্গ। হে মধ্যদিনের ভ্রাতৃগণ, এইত তোমাদের সময়।’

অনেক বছর ধরে একদা সাস্থ্যসম্পদে সুন্দর তার দেহ ক্ৰমে ভেঙ্গে পড়ছিল— তারপর সেই ১৮৮১ সালের গ্রীষ্মকালে রোগমুক্তির প্রথম পর্যায়েই নিজেকে সংহত কনে নিলেন সৃষ্টিকাজে । লিখলেন, ‘The Joyful Wisdom’ মানে ‘আনন্দময় জ্ঞান’ এবং পরিশেষে রূপদান করলেন জরথুস্ত্রকে । অবশ্য ‘আনন্দময় জ্ঞান’ গ্রন্থকে জরথুস্ত্রের ভাবমূলক উপক্রমণিকা বলা যেতে পারে । কিন্তু পুনরায় স্বাস্থ্যলাভ করার সঙ্গে সঙ্গেই নির্মম ভাগ্য তাঁকে টেনে নিয়ে ফেলল আবার এক ব্যক্তিগত বেদনার আবর্তে । তাঁর বন্ধুরা তাঁর জীবনে এনে দিলেন অনেক নৈরাশ্য । বন্ধুবিচ্ছেদ তাঁর জন্য বড়ই মর্মান্তিক ছিল । কেননা, বন্ধুত্বের সম্পর্ককে তিনি মনে করতেন এক পরম পবিত্র জিনিস বলে । জীবনে এই প্রথমবার তিনি অনুভব করলেন একাকিত্মের নিষ্ঠুর বেদনা। এমনি একাকিত্বেই বোধ হয় নির্বাসিত হয় সব মহত্ব । আর পবিত্র একাকিত্বকে বেছে নেওয়ার ব্যাপার থেকে পরিত্যক্ত হওয়ার দুঃখ ভিন্নতর । এ সময়ে তিনি মনেপ্রাণে অনুভব করেছেন এমন একজন আদর্শ বন্ধুর অভাব যিনি তাকে সম্যকভাবে বুঝতে পারবেন এবং যার কাছে প্রাণ খুলে বলতে পারবেন সব কথা ; আর তার মনে হয়েছে এ রকম বন্ধুর দেখা যেন প্রথম জীবন থেকে তিনি জীবনে বহুবার পেয়েছেন -তারপর তিনি যে পথ বেছে নিলেন সেটা ক্রমেই অধিকতর বিপদ-সঙ্কুল এবং দুরূহ হয়ে উঠল—আর সে পথে এমন কাউকে তিনি পেলেন না যে তার অনুসরণ করতে পারে । অতএব নিজের জন্য গড়ে তুলতে হল এক আদর্শ আকারের বন্ধু, একজন মহিমান্বিত দার্শনিকের রূপে । আর তার সৃষ্টিকে বানালেন পৃথিবীর কাছে তাঁর বাণীর প্রচারক ।

১৮৮১ সালের গ্রীষ্মকালে আমার ভাই যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন সেটার উপরে ভিত্তি করে পূর্ব বর্ণিত ব্যক্তিগত দুঃখের আঘাত না পেলে তিনি ‘জরথুস্ত্র বললেন’ গ্ৰন্থখানা লিখতেন কি না সে প্রশ্ন এখানে নিরর্থক । কিন্তু এ ব্যাপারে যেখানে ‘জরথুস্ত্র’ জড়িত সেখানে মাস্টার একহার্টের (Master Eckhardt ) ভাষায় বলতে পারি, ‘সবচেয়ে দ্রুত প্রাণী যে তােমাকে বয়ে নিয়ে যাবে পূর্ণতার পানে—সে হচেছ দুঃখ’ ।

জরথুস্ত্রের প্রথম অংশের উৎপত্তি সম্বন্ধে আমার ভাই লিখেছেন, ‘১৮৮২-৮৩ সালের শীতকালে অামি বাস করছিলাম ছােট্ট সুন্দর রেপালো গালফের তীরে । স্থানটি ছিল জেনােয়ার অনতিদূরে চিয়াভারি এবং কেপ পোর্টো ফিনোর মাঝখানে । আমার স্বাস্থ্য খুব ভাল ছিল না ; আর তখন শীত ছিল খুব প্রবল—তার উপর বৃষ্টি । আমার বাসস্থানটি ছিল একেবারে পানির কিনারে ; আর সমুদ্র যখন উন্মত্ত হয়ে উঠত তখন আমার রাতের ঘুম যেত ভেঙে । এ অবস্থাটা মােটেই সুবিধাজনক ছিল না, অথচ এমনি এক দুরন্ত অবস্থার মাঝখানেই হল জরথুস্ত্রের উৎপত্তি । এতে করে যেন আমার বিশ্বাসকেই বাস্তবে প্রদর্শন করা হল । আমার বিশ্বাস যে জীবনে যা নির্ঘাতভবে আসবার আছে—সমস্ত বাধা সত্বেও সে আসবেই । ভোরবেলা আমি বেরিয়ে পড়তাম দক্ষিণ দিকে জুয়াগলির ( Zongli) সুন্দর রাস্তায় । পাইন বনের ভিতর দিয়ে রাস্তাটি উঠে গেছে উপরে । সেখান থেকে দেখা যায় বহুদূর বিস্তৃত সমুদ্রের দৃশ্য ।শরীর ভাল থাকলে বিকালের দিকে সান্তা মার্গেরিটা থেকে পোর্ট ফিনো ছাড়িয়ে সমস্ত বাঁক ঘুরে আসতাম । এই স্থানটি আমার অধিকতর প্রিয় ছিল—আর এ জায়গাটিকেই নিবিড় ভাবে ভালবেসেছিলেন সম্রাট তৃতীয় ফ্রেডারিক । ১৮৮৬ সালে পুনরায় এখানে আসার সুযােগ ঘটে এবং তিনিও তখন এই ভুলে-যাওয়া পৃথিবীর আনন্দমন ছোট্ট জায়গাটিতে আসেন শেষ বারের জন্য। এই দুই পথের মধ্যেই জীবনে জরথুস্ত্রের আগমন ঘটল । জরথুস্ত্র এলেন আদর্শ-সৃষ্টি রূপে, বরঞ্চ বলতে হয় এই ভ্রমণের পথের উপরেই অামার ধারণা সব এসে জুটল আমার সঙ্গে ।

প্রায় দশ দিনে সমাপ্ত হয় জরথুস্ত্রের প্রথম অংশ—মানে ১৮৮৩ সালের ফেব্রুয়ারীর প্রথম থেকে সেই মাসেরই মাঝখানের ভিতর । শেষ পংক্তি লেখা হয় সেই পরম মূহুর্তে যখন রিচার্ড ওয়াগনার ভেনিসে ত্যাগ করেন জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ।

যে দশ দিন তিনি এই গ্রন্থের প্রথম অংশ রচনায় ব্যয় করেছেন সে সময়টা ছাড়াও আমার ভাই এই সময়ের শীতকে সবচেয়ে কঠিন এবং কষ্টকর অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করেছেন । এতে করে তিনি এ কথা বলতে চাননি যে তাঁর অগেকার ব্যাধি তাঁকে তখন পীড়া দিচ্ছিল—বা সান্তা মার্গেরিটায় তিনি যে গুরুতর ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং যার জন্য জেনোয়াতে এসেও তাঁকে কয়েক সপ্তাহ ভুগতে হয়েছিল । প্রকৃতপক্ষে তিনি যে সম্বন্ধে অভিযোগ করেছিলেন সেটা তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থা—এক অবর্ণনীয় পরিত্যক্ত জীবনের যাতনা । অার এর হৃদয় -বিদারক প্রকাশ ঘটেছে জরথুস্ত্রের মধ্যে । এই গ্রন্থের প্রথম ভাগ তাঁর বন্ধু এবং পরিচিতদের কাছে পেয়েছে অত্যন্ত হৃদয়হীন অনাদর । যাদের তিনি এ বই উপহার দিলেন তারা প্রত্যেকেই এর মর্ম সম্বন্ধে ভুল ধারণা করে বসলেন । ‘আমি দেখেছি আমার অনেক ধ্যানধারণা গ্রহণ করার জন্য লােকের মন তৈরি হয়নি। জরথুস্ত্রের ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়া গেল, যথেষ্ট পরিষ্কার করে সত্য কলা বলা সত্ত্বেও কেউ তা বুঝতে রাজী নয়।’ এই অনাদর আমার ভাইকে অত্যন্ত নিরুৎসাহ করে তুলল। সে সময়ে তিনি চেষ্টা করছিলেন তাঁর অভ্যস্ত ওষুধ হাইড্রেট অব ক্লোরাল বর্জন করতে । ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত থাকা কালে তিনি এ ঔষধটির ব্যবহার শুরু করেন -এর পরের বসন্তকাল তিনি রোমে কাটান । আর এ বাসন্ত কালটা ছিল তার জন্য কিছুটা বিষাদে ভরা। এ সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন, “রোমে আমার বসন্তের দিনগুলি কাটল বিষাদের ভিতরে । কোন প্রকারে বেঁচে রইলাম মাত্র । এই কোন রকমে বেঁচে থাকা কোন সহজ ব্যাপার নয় । জরথুস্ত্রের কবি-গ্রন্থকারের জন্য এই নগর একেবারেই অযোগ্য । আর এখানে আসার জন্য আমি দায়ী নই—এ কথা ভাবলে আরও বেশী দুঃখ পাই । চেষ্টা করেছি এই নগর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য । কুইলায় যেতে ইচ্ছা করেছি, সব দিক দিয়ে রোমের বিপরীত এই কুইলা শহর । রোমের সাথে শত্রুতা করেই এর পত্তন ।(আমি এমনি এক নগর গড়ে তুলব একদিন)। এক নাস্তিক এবং প্রকৃত ধর্মশত্রু মহান্ হোহেনস্টাফেন, সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের কীর্তি হচ্ছে এই কুইলা নগর। কিন্তু, আমার ভাগ্য এ সবের পিছে পড়ে রইল। আমাকে আবার ফিরে আসতে হল রোমে। অবশেষে পিয়াজা বারবেরিনি নিয়ে আমাকে সঙ্গষ্ট থাকতে হল । কেননা, ক্রিশ্চিয়ান-বিরোধী অঞ্চল আর কোথাও খুজে পেলাম না। মনে পড়ে একবার দুর্গন্ধ থেকে বাঁচবার জন্য প্যালাজা ডেল কুইরিনেলে খোঁজ করেছি, তারা একজন দার্শনিকের জন্য একটি নির্জন ঘর দিতে পারে কিনা। পিয়াজার অনেক উপরে এক নিরালা কক্ষ থেকে দেখা যায় রোমের সাধারণ দৃশ্য, নীচে শোনা যায় ঝর্ণার ঝরঝর শব্দ, সব গানের সুনির্জন গান রচিত হচ্ছে সেখানে। রাত্রির নীরব সঙ্গীত। এ সময়ে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল অব্যক্ত বেদনার সুর। তার ধুয়া প্রকাশ করা যায় এ তিনটি শব্দে, ‘অমরতার ভিতরে মৃত’।”

আমরা সেই বসন্তকালে রোমে বেশ কিছুদিন ছিলাম । কিন্তু ক্রমে বেড়ে উঠা গরম এবং অনাদরের অস্বস্তিকর মানসিক বেদনায় আহত অামার ভাই স্থির করলেন, তিনি অার কলম হাতে নিবেন না ‘জরথুস্ত্র’ লিখবার জন্য । অথচ প্রুফ এবং প্রকাশকের সব ঝামেলা তখন আমি ঘাড় পেতে নিয়েছি। তারপর জুনের শেষ ভাগে আমরা যখন সুইজারল্যাণ্ডে ফিরে গেলাম এবং তিনি সেখানকার পাহাড় পর্বতের নির্মল পরিবেশে আবার ফিরে পেলেন তাঁর সৃষ্টির আনন্দ—তখন কতকগুলি পাণ্ডুলিপি পাঠানোর ব্যাপারে তিনি আমাকে লিখেছিলেন, “এখানে একটি থাকবার স্থান ঠিক করেছি তিন মাসের জন্য । ইটালীয় আবহাওয়ায় আমার সাহস ভেঙে পড়তে দিয়েছিলাম, এটা আমার এক মস্তবড় বােকামি । ‘কিন্তু তার পরে কি ? এই চিন্তা মাঝে মাঝে আমাকে বেদনা দেয় । এই পৃথিবীতে আমার ‘ভবিষ্যৎ’ বড়ই অন্ধকারময় । কিন্তু আমার এখনও অনেক কিছু কাজ করবার রয়েছে । তাই ভাবছি ভবিষ্যতের চিন্তা না করে কাজ করে যাওয়াই ভাল । আর বাদ বাকী সবকিছু তোমার উপর এবং দেবতাদের উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাক ।”

জরথুস্ত্রের দ্বিতীয় অংশ লেখা হয়েছিল ২৬ শে জুন এবং ৬ই জুলাইয়ের মধ্যে । এবার গ্রীষ্মে অনেক বার ফিরে এসেছি সেই পবিত্র ভূমিতে- এখানে জরথুস্ত্রের প্রথম ধারণা চমক দিয়েছিল আমার মনের মধ্যে । এখন এর দ্বিতীয় অংশ উপলব্ধি করলাম। তাকে রূপ দেওয়ার জন্য দশটি দিনই যথেষ্ট ; এর দ্বিতীয়, প্রথম বা তৃতীয় ভাগের জন্য এর অধিক সময়ের আবশ্যক বোধ করি না।

যে ভাব-মুহূর্তে জরথুস্ত্ৰ লেখা হয়েছিল তার কথা তিনি প্রায়ই বলতেন । পাহাড় এবং উপত্যকার উপর দিয়ে চলতে চলতে মনের মধ্যে ভিড় করে আসত সব ধারণা—সে সব তিনি লিখে রাখতেন নোট বইয়ে—এর পরে সেগুলি বিস্তৃত আকারে রূপ দিতেন। এ জন্য তাঁকে মাঝ রাত অবধি জেগে লিখতে হত । এক পত্রে তিনি আমাকে লিখেন, ‘এ রকম রচনার চাপ যে কত খানি সে সম্বন্ধে তুমি কোন ধারণা করতে পার না ; আর ‘Ecce Horno’-তে (১৮৮৮ শরৎকাল) তিনি যথেষ্ট আবেগময় ভাষায় বিবৃত করেছেন কি প্রকার অতুলনীয় আবেগ ভরে তিনি জরথুস্ত্র’কে সৃষ্টি করেছেন—

এই উনিশ শতকের শেষ পর্যায়ে কারও কি এমন কোন স্পষ্ট ধারণা আছে যে শক্তিসম্পদে পরিপূর্ণ অতীত যুগের কবি ‘প্ৰেরণা’ বলতে কি বুঝতেন? যদি না থাকে তবে শােন বলছি, যদি কারও মধ্যে বিশ্বাসের কিছুমাত্র ছোঁয়া থাকে তবে সে কিছুতেই অস্বীকার করতে পারবে না যে মানুষ কেবল কোনও এক মহাশক্তির অবতার, মুখপাত্র বা মধ্যস্থ মাত্র । স্বর্গীয় প্রত্যাদেশের অর্থ হচ্ছে এমন একটা কিছু যা সহসা চোখে ধরা দেয় এবং শোনা যায় । সে ধরা দেয় অবর্ণনীয় সঠিকভাবে এবং সুনিশ্চিত রূপে । বর্ণনা করে পরিষ্কার সত্যকে । আর মানুষকে করে অভিভূত । কেউ খুঁজে না তাকে—কিন্তু শুনতে পায় । লােকে গ্রহণ করে—কিন্তু জিজ্ঞেস করে না, কে দিল । একটা চিন্তা হঠাৎ বিদ্যুতের মত ফেটে পড়ে—সে আসে আপন গরজে—বিনা দ্বিধায়—এ ব্যাপার নির্ভর করে না কারও কোন পছন্দ অপছন্দের উপর । জীবনে এমন ভাব আছে যার বেদনার উপশম হতে পারে কেবল চোখের পানিতে । তার সাথে লোকের গতি দ্রুত এগিয়ে চলে অথবা পিছনে পড়ে থাকে । এমন অনুভূতি আছে যা মানুষকে বেহুঁশ করে ফেলে- যার প্রভাবে পা থেকে মাথা অবধি সর্বাঙ্গে অনুভূত হয় সচেতন আনন্দের হিল্লোল । আছে এক গভীর আনন্দ—সে আনন্দের মাঝে সবচেয়ে ব্যথিত এবং বিমর্ষ মনও আনে না কোন বিরােধী প্রতিক্রিয়া-বরঞ্চ স্থির থাকে অফুরন্ত আলোর প্লাবনে অাবশ্যকীয় ছায়ার মত অচঞ্চল ভাবে । ছন্দময় সম্পর্কের জন্য এক স্বাভাবিক অনুবৃত্তি আছে—রূপের বিস্তৃত স্থান জুড়ে তার অধিকার (সেই বিস্তৃতি-জোড়া ছন্দের আবশ্যক হচ্ছে দৈর্ঘতা -সে প্রেরণা- শক্তির পরিমাপ -সে এই প্রেরণার চাপ এবং তীব্রতার একটি দিক)। সবকিছু ঘটে সম্পূর্ণ ইচ্ছা ব্যতিরেকে যেন মুক্তি, পাপমোক্ষণ, ক্ষমতা এবং পবিত্রতার প্রলয়ঙ্কর আত্মবিদারণ । রূপ এবং প্রতিরূপের ইচছা -ব্যতীত স্বতঃপ্রকাশ একটি
অপূর্ব ব্যাপার । লােকে অনুভব করতে পারে না কিসে থেকে গড়ে উঠল এই -রূপ আর প্রতিরূপ; এর প্রত্যেকটি অঙ্গ সূচনা করে স্বতঃপ্রস্তুত, সঠিক এবং সহজ প্রকাশ -ভঙ্গি । এতে করে প্রকৃতই মনে হয় যেন জরথুস্ত্রের নিজেরই একটি বাক্য ব্যবহার করছি—যেন সবই এসেছে একজনের কাছে এবং ইচ্ছা করছে প্রতিরূপ হওয়ার জন্য । ‘এখানে সব জিনিস স্নেহভরে ছুটে আসে তোমার কথার কাছে এবং স্তুতিবাদ করে তোমাকে—কারণ, তারা চায় তোমার পিঠে চড়ে বসতে । এখানে প্রত্যেকটি প্রতিরূপের উপর সােয়ার হয়ে তুমি পৌঁছাও প্রত্যেক সত্যের কাছে । এখানে তােমার সামনে খুলে যায় সব সত্তার কথা এবং কথার জগৎ । এখানে সব সত্তা হতে চায় কথা । এখানে সমস্ত বিকাশের ধারা তোমার কাছে শিখতে চায় কথা কওয়া।’ এই আমার প্ৰেরণার অভিজ্ঞতা । আমার কোনও সন্দেহ নেই, তাকে খুজবার জন্য লােককে যেতে হবে হাজার হাজার বছর পিছের দিকে যিনি আমাকে বলবেনঃ এটা আমারও মত ।

১৮৮৩ সালের শরৎকালে আমার ভাই এনগাডাইন থেকে জার্মানীতে যান এবং সেখানে কয়েক সপ্তাহ কাল থাকেন । পরের শীতকালে কিছুটা এলােপাথাড়ি ভ্রমণ করেন স্ট্রেসা, জেনোয়া এবং স্পেজিয়ার ভিতর দিয়ে । অবশেষে পৌঁছান নাইসে। সেখানকার আবহাওয়া তাঁর সৃষ্টি ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে -তিনি লিখে ফেলেন ‘জরথুস্ত্র’-এর তৃতীয় খণ্ড ।” শীতের দিনে নাইসের নরম আকাশের তলায় দেখা দিলেন তৃতীয় জরথুস্ত্র এবং সমাপ্ত হল আমার কাজ – পুরা এক বছরও হয়নি ব্যাপৃত ছিলাম এই কাজে । মনে হল, জীবনে প্রথম আকাশ আমার পানে তাকাল প্ৰসন্ন দৃষ্টি মেলে । ভােলা যায় না, এমনি সব মূহুর্তের আনন্দে পবিত্র হয়েছে নাইসের অনেক নির্জন কোণ এবং পাহাড় পর্বত । পাহাড়ের মাথায় মুরদের অপূর্ব গ্রাম এজরাতে উঠবার কষ্টকর প্রচেষ্টার মাঝখানে রচনা করেছি চূড়ান্ত পরিচ্ছেদ ‘পুরাতন এবং নতুন মূল্য-তালিকা’। আমার সৃষ্টির অধিকাংশ মুহূর্তে সঙ্গী হয়েছে অস্বাভাবিক শারীরিক শ্রমক্রিয়া । দেহ অনুপ্রাণিত হয়েছেঃ আত্মার প্রশ্ন স্থগিত থাক । এ সময়ে আমাকে প্রায়ই নাচতে দেখা গিয়ে থাকতে পারে । শান্তিহীন হেঁটে চলেছি সাত আট ঘন্টা ধরে পাহাড়গুলির মাঝখানে । ঘুমিয়েছি, হেসেছি প্রাণ ভরে—ছিলাম পরিপূর্ণ ভাবে সুস্থ সাবলীল।”

আমরা দেখেছি জরথুস্ত্রের তিন খণ্ডের প্রত্যেকটি খণ্ড লেখা হয়েছে কিছু কম-বেশী সময়ের প্রস্তুতির পর প্রায় দশ দিনের মধ্যে । কেবল চতুর্থ খণ্ডের রচনা সময় সময় ব্যাহত হয়েছে । এই খণ্ড সম্বন্ধে যখন নোট লেখা হয় তখন তিনি আর আমি জুরিখে বাস করছি। সেটা ১৮৮৪ সালের সেপ্টেম্বর । পরের নভেম্বরে এই সব নোট থেকে তিনি বিস্তৃত আকারে লিখতে শুরু করেন । তখন তিনি মেন্টোনে অবস্থান করছেন । তারপর দীর্ঘ বিরতির পর নাইসে থাকা কালে লেখা সমাপ্ত করেন ১৮৮৫ সালের জানুয়ারির শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে । তখন আমার ভাই এই খণ্ডটিকে চতুর্থ এবং শেষ খণ্ড বলে অভিহিত করেছিলেন । কিন্তু পরে এই খণ্ডটি ঘরোয়াভাবে ছাপানোর পর তিনি আমাকে লিখে জানিয়েছিলেন যে এর পঞ্চম এবং ষষ্ঠ ভাগও তিনি লিখবার ইচ্ছা করেন । এই খণ্ড দু’টি সম্বন্ধে তাঁর লেখা নোট এখনও আমার কাছে রয়েছে ; চতুর্থ খণ্ডের পাণ্ডুলিপির মধ্যে তাঁর লিখিত এরূপ মন্তব্য রয়েছে, সাধারণের জন্য নয়, কেবল মাত্র আমার বন্ধুদের জন্য।’ এটা লিখেছিলেন তিনি একান্ত ব্যক্তিগত ভাবের বশে । আর যে সব স্বল্পসংখ্যক বন্ধুকে তিনি এর কপি দিয়েছিলেন তাদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছিল এর মর্ম গোপন রাখার জন্য । মাঝে মাঝেমাঝে এই চতুর্থ খণ্ড গ্রন্থকে সাধারণের মধ্যে প্রচার করবার কথাও ভেবেছেন; কিন্তু তার সন্দেহ হয়েছে যে এর বিশেষ অংশ বাদ দিয়ে একে তিনি সাধারণের কাছে উপস্থিত করতে সক্ষম হবেন কিনা । সে যা হােক, তিনি এই চতুর্থ খণ্ডের পাণ্ডুলিপি মুদ্রিত আকারে কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুকে দেওয়ার মনস্থ করলেন। সে সময়ে তাঁর একান্ত নিঃসঙ্গতা এবং সান্ত্বনা লাভের আবশ্যকতা যে কতখানি ছিল সে সম্বন্ধে এ বইতে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। অতএব বইখানা চল্লিশ কপি ছাপা হয়েছিল, কিন্তু তার ভিতর থেকে মাত্র সাত কপি দেওয়া হয়েছিল বন্ধুবান্ধবদের।

কি কারণে আমার ভাই একজন পার্সীকে তাঁর আদর্শের সুমহান অবতার রূপে গ্রহণ করেছিলেন, সে ইতিহাস আমি শুরুতেই বর্ণনা করেছি। সবার মধ্যে থেকে জরথুস্ত্রকে তিনি কি কারণে তাঁর আদর্শ প্রচারের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করলেন সে সম্বন্ধে তিনি নিজে বলেছেন, ‘লোকের উচিৎ ছিল আমাকে জিজ্ঞাসা করা, অামার ন্যায় নীতিভ্রষ্টের মুখে জরথুস্ত্র নামের যথার্থ তাৎপর্য কি ? অতীতের অন্যান্য দার্শনিকদের থেকে জরথুস্ত্রের বিশেষত্ব এইখানে যে, তিনি ছিলেন নীতিভ্রষ্টদের বিপরীত । ভালমন্দের দ্বন্দ্বের মাঝখানে তিনিই প্রথম দেখতে পান জগতের সবকিছু পদার্থের কার্যকরী মূল চক্রটিকে । শক্তি, কারণ উদ্দেশ্য রূপে নীতিনিষ্ঠাকে তিনি দেন তত্ত্বরূপ । কিন্তু এই প্রশ্নের মধ্যেই স্পষ্ট তার উত্তর । নীতিনিষ্ঠার সবচেয়ে বড় অশুভসূচক ভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন জরথুস্ত্র ।

এই ভ্রান্তিও প্রথম তিনিই উপলব্ধি করেন সবার আগে । তার কারণ এ নয় যে অন্য চিন্তাশীলদের অপেক্ষা এ বিষয়ে কেবল তাঁর প্রভূত অভিজ্ঞতাই ছিল। আসলে সমস্ত ইতিহাস হচ্ছে তথাকথিত নৈতিক ব্যবস্থার অভিজ্ঞতামূলক প্রতিবাদ । কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে অন্য চিন্তাশীলদের চেয়ে তিনি ছিলেন অধিক সত্যনিষ্ঠ । কেবল তাঁর আদর্শের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ হিসাবে তুলে ধরেছেন সত্যনিষ্ঠাকে । এ গুণ হচচ্ছে আদর্শবাদী কাপুরুষতার বিপরীত । এই কাপুরুষরা বরাবরই বাস্তব থেকে পালিয়ে বেড়ায় দূরে দূরে । আর আগের এবং পরের অন্য সব চিন্তাশীল অপেক্ষা জরথুস্ত্রের দেহে ছিল অধিক হিম্মত । সত্য কথা বলা এবং সোজাসুজি লক্ষ্য স্থির করা—এটাই পার্সীদের প্রধান গুণ । এখন কি আমাকে বুঝতে আর কোন অসুবিধা হচ্ছে ? নীতিনিষ্ঠার নিজের ভিতর দিয়ে–সত্যবাদিতার ভিতর দিয়ে নীতিনিষ্ঠার পরাজয় আর নীতিবাদিদের বিপরীত আমার ভিতর দিয়ে নীতিবাদের অতিক্ৰমণ -এটাই হচ্ছে আমার মুখে জরথুস্ত্র নামের অর্থ ।

নীটশে আর্কাইভস
এলিজাবেথ ফরস্টার নীটশে(ফ্রেডারিখ নীটশের ভ্রাতা)
ওয়েমার, ডিসেম্বর ১৯০৫

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.