In search of peace of mind: Seneca

বর্তমানের এ জটিল ও সংকটময় সময়ে মানসিক তৃপ্তি ও প্রশান্তি সবচেয়ে দুর্লভ জিনিসে পরিণত হয়েছে। হয়তো সর্বকালেই এটা দুর্লভ ছিল। খুব অল্প মানুষই মানসিক প্রশান্তি লাভের উপায় জানতে সক্ষম হয়েছেন এবং প্রশান্তির সঙ্গে জীবনযাপন করতে পেরেছেন। ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের বড় একটা উদ্দেশ্য বলা যায় এ মানসিক তৃপ্তি ও প্রশান্তি দেয়া। প্রাচীনকালের সব দার্শনিকই এ বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন; পিথাগোরাস থেকে শুরু করে করে প্লেটো, হেরাক্লিটাস থেকে শুরু করে এপিকিউরাস,সকলেই সুখী জীবনের পথ অনুসন্ধান করেছেন। সুখী জীবনের বড় একটা লক্ষণ হচ্ছে মানসিক প্রশান্তি। স্টোয়িক দার্শনিকরা এক্ষেত্রে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দর্শনের মূল বিষয় হচ্ছে সংকটপূর্ণ ও প্রতিকূল পৃথিবীতে আমাদের অনুকূল বিষয়গুলোর উপর জোর দিয়ে জীবন থেকে সর্বোচ্চ প্রশান্তি বা সুখ আদায় করা। সেনেকা, এপিকটেটিউস ও মার্কাস অরেলিয়াসের লেখাগুলো এ মূল সুরকে নিয়ে এগিয়েছে। সেনেকার ‘মোরাল লেটার্স’-এর সবগুলো চিঠি বা প্রবন্ধই আদর্শ ও সুখী জীবনের পথ বাতলে দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিংবা তিনি যেভাবে এ পথ অনুসন্ধান করেছেন পাঠককে সে পথ দেখিয়ে দেয়ার চেষ্টা তিনি করেছেন। মায়ের কাছে সেনেকার চিঠির পর আমরা এখানে তার ‘অন ট্রানক্যুইলিটি অব মাইন্ড’ বা ‘মানসিক প্রশান্তি অর্জন’ নিয়ে আলোচনা করব। এখানে এই চিঠি বা নিবন্ধের সারকথাগুলো তুলে আনার চেষ্টা করবো।
সেরেনিউস নামে এক মিত্র চিঠিতে সেনেকার কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আমি যখন আমার দোষ-ত্রুটির ডালা খুলে বসি তখন সেগুলো এমনভাবে আমার সামনে আবির্ভূত হয় যা আমি স্পষ্ট করে দেখতে পাই। আবার কিছু কিছু ত্রুটি কোণা-কাষ্টিতে লুকিয়ে থাকা, কিছু গুণ সবসময় উপস্থিত থাকে না, নিয়মিত বিরতিতে দেখা দেয়। আমি বলব এ শেষ পর্যায়ের ত্রুটিগুলো বিরক্তিকর। এগুলো যেন এমন কঠিন শত্রুর মতো যারা সুযোগ পেলেই হানা দেয়-বিপক্ষ দলকে প্রস্তুতি দেয়ার ফুরসত দেয় না, আবার শান্তিকালীন সময়ে আরামে বসে থাকতেও দেয় না।

তো, আমি এ চিঠিতে আপনার কাছে আমার মনের রোগবালাই এমনভাবে পেশ করছি যেমনটা কোনো রোগী তার চিকিৎসকের সামনে উপস্থাপন করেন। সত্য কথা বলতে কী আমি ওই বালাই থেকে মুক্ত হতে পারিনি যেগুলো আমি ঘৃণা করি ও ভয় পাই। বরং বলা যায় আমি যেন সেগুলোর দাসত্বের বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা। আমি যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি এটাকে সবচেয়ে খারাপ বলতে পারি না; তবু আমি এটা নিয়ে অভিযোগ করছি এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছি। আমি নিজেকে সুস্থ্য কিংবা অসুস্থ-কোনটাই বলতে পারছি না। আমাকে তুমি এ বলে শান্তনা দিওনা যে, সব ভালো গুণই শুরুতে নাজুক থাকে, সময়ের ব্যবধানে দৃঢ়তা ও শক্তি অর্জন করে।
সেরেনিউস তার মনের রোগবালাই নিয়ে বলতে গিয়ে আরও জানায়, ভোগের প্রতি তার কোন বিশেষ মোহ নেই। তিনি বলেন, আমি আসলে কৃপণতাপূর্ণ স্বভাবে আটকে পড়ে আছি। আপনার কাছে স্বীকারে দ্বিধা নেই, আমি দেখানোর জন্য সুন্দর আসনের পিয়াসী নই, বিলাসী পোশাক-আশাকে মোহগ্রস্থ নই। বরং সাধারণ ও সস্তা জিনিসেই আমার প্রয়োজন মিটে যাচ্ছে। আমার খাবারদাবার তৈরিতে ব্যতিব্যস্ত নয় ডজনখানেক দাসদাসী। কোন বিলাসী খাবার ক্রয় ও তৈরিতে অনেক দিনের আয়োজনে ব্যস্ত রাখিনা কাউকে। ব্যক্তিগতভাবে কৃচ্ছতার মধ্য দিয়ে গেলেও রোমান সাম্রাজ্যের বড় এক কর্তা হিসেবে তার আশপাশে বিলাস-ব্যসনের উপস্থিতি অবজ্ঞা করতে পারছেন না, এ বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। এগুলোতে তার চোখ মাঝে মাঝে ঝলসে যায় সে বিষয়টিও খোলা মনে স্বীকার করেন তিনি । এতে নিজের মধ্যে যে গভীর অনুতাপের সৃষ্টি হয় এবং তাতে অনেকদিন ধরে জ্বলেন সে বিষয়টি উল্লেখ করেন সেরেনিউস। তার গভীর সংকটের প্রকৃতি হচ্ছে এমন-আশপাশে বিলাস-ব্যসন তাকে পরিবর্তন করতে পারে না আবার সেগুলো তাকে ডিসটার্ব করতেও ছাড়ে না।
তিনি বলেন, আমার শিক্ষকদের নির্দেশের প্রতি আনুগত্যস্বরূপ রাজ দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে যেতে চাই। আমি বড় পদে বা কনসালশিপ পাওয়ার জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী। গোলাপি আলখেল্লা বা লিকটর দণ্ডের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যে এ প্রত্যাশা করছি এমন নয় বরং আমার বন্ধু-স্বজন, পুরো দেশবাসী এবং সবশেষে সমগ্র মানবজাতির প্রতি দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে ওই পদ কামনা করছি। প্রস্তুতি এবং দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আমি জেনো, ক্লিনথেস ও ক্রাইসিপ্পাসকে অনুসরণ করেছি। কিন্তু তাদের কেউই রাজ দরবারে প্রবেশ করেননি এবং অন্যদেরকেও সে জীবন কামনা করা থেকে বিরত থাকতে চাপ দিতে ইতস্তত করেননি।
তারপর, কোন কিছু যখন আমার মনকে বিক্ষিপ্ত করে যা কঠিন পরিস্থিতির সাম্মুখীন হতে ভয় পায়, যে জিনিসগুলো আমার অধিক সময় দাবি করে না সেখান থেকে পালাতে আমি অবকাশে যেতে চাই। আমি ঘরের দিকে দ্রুত পায়ে আগাই। আমি নিজেকে চার দেয়ালের ভেতরে আটকে রাখতে চাই। কিন্তু যখনই কোন সাহসী কাজ সম্পর্কে পড়ি বা অসাধারণ বীরত্বের কথা শুনি তখন আমি রাজ দরবারে চলে আসি। তখন আমি রাজ দরবারের ভেতরে বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চাই। সফলতার কৃতিত্ব নিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠা ব্যক্তিদের দেখি। 
পড়াশুনার সময় যখন কারো কারো এ কথা পড়ি তিনি আগামী প্রজন্মের জন্য বেঁচে থাকতে চান তখন আমার বিরক্ত লাগে। মনে মনে বলি, তোমাকে কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকতে হবে? উত্তর-প্রজন্ম যেন তোমাকে নিয়ে চুপ না থাকে সেজন্য তোমার এই ব্যতিব্যস্ততা বন্ধ করবে না? তোমার জন্ম হয়েছে মৃত্যুর জন্য; নীরব অন্তেষ্টিক্রিয়া/শেষকৃত্যে ঝক্কি ঝামেলা কম।

সেরেনিউসের চিঠির একেবারে শেষ দিকে চমৎকার কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রজ্ঞা অর্জন করে ফেলেছে অনেকে এমনটা ভাব না ধরে যদি সে চেষ্টা জারি রাখতো তাহলে অনেকেই সেখানে পৌঁছাতে পারতো। আত্মরতিতে মগ্ন থাকা অন্যের চাটুকারিতার চেয়ে ক্ষতিকর। নিজের কাছে সত্য উন্মোচন করতে চায় কজনা? (বেশিরভাগই নিজেকে মিথ্যা প্রলোভনে ভুলিয়ে রাখে) আশপাশে অসংখ্য চাটুকার পরিবেষ্টিত থেকেও অনেকে ভুলে যায় সে নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় চাটুকার। নিজের এমন মানসিক বিকারের ছবি এঁকে সেনেকার কাছে বালাই চেয়েছেন। তিনি তার মানসিক অস্থিরতার প্রতিকার চেয়েছেন।
লেখাটির এ অংশে সেনেকার পরামর্শ সম্পর্কে আমরা জানতে পারব। চলেন দেখি বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত সেরেনিউসের জন্য কী প্রতিকার বিধান করেছেন সেনেকা।
সেনেকা তার চিঠির শুরুতে সেরেনিউসকে আশ্বস্ত করেন তিনি, প্রকৃত অর্থে  সঠিক জিনিসের সন্ধানেই রয়েছেন। বিভিন্ন স্তরের বেশিরভাগ মানুষ যে বিভিন্ন কারণে এ মানসিক প্রশান্তি অর্জন করতে পারেন না সে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন তিনি। কেউ কেউ নিত্য চঞ্চলতায়/অনিঃশেষ অস্থিরতায় নাকানিচুবানি খান; বারংবার লক্ষ্য/গন্তব্য পাল্টান এবং প্রতিনিয়ত ওই ফেলে আসা জিনিসের জন্য অনুশোচনায় ডুবেন। তারা যেন এমনভাবে বাঁচেন যেমনটা আশা করেন না বরং অতীতের কানাগলিতেই বারংবার ফিরে আসেন। অনেকে আবার মনে করেন দেশ বিদেশ ঘোরাফেরা করে তারা তাদের চঞ্চলতা/অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু আসলে তারা যেখানেই যান না কেন পুরনো সংকটগুলো/অস্থিরতাগুলো তাদের পিছু ছাড়ে না। অনেকটা যেন লুক্রেটিউসের কথার প্রতিধ্বনি; মানুষ আসলে নিজ থেকেই পালিয়ে বেড়াতে চায়। সেনেকা এই সিদ্ধান্ত দেন যে, আমাদের সমস্যাগুলো আমরা কোন জায়গায় বা স্তরে অবস্থান করছি তার উপর নির্ভরশীল নয় বরং আমরাই আমাদের সমস্যার কারণ। সেনেকা তখন এ রেটরিকাল প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘আর কতদিন একই কাজ করে মরবে মানুষ? এখনো কী সময় আসেনি আমরা কোন কাজ কেন করি তার কারণ অনুসন্ধান করা?’

লেখাটির তৃতীয় অনুচ্ছেদে কীভাবে মানসিক প্রশান্তি অর্জন করা যায় সে বিষয়ে সেরিনিউসকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট উপদেশ দেন সেনেকা। প্রথম উপদেশটি তিনি ধার করেছেন পূর্বসুরী অ্যাথেনোডোরাসের কাছ থেকে। মানসিক প্রশান্তির জন্য সবচেয়ে সেরা যে জিনিসটা করা যায় তা হলো নিজেকে কোনো কাজে মগ্ন করে দেয়া; রাষ্ট্রীয় কোন দায়িত্ব পালন বা নাগরিকের দায়িত্ব পালন করা। কারণ অন্যের কাজে আসা এবং দেশের প্রয়োজনে নিজেকে নিয়োজিত করা একটি ভালো চর্চা এবং নিজের জন্যও তা ভালো ফল বয়ে আনে। আবার কেউ দর্শন চর্চাতেও সৃজনশীল উপায়ে ব্যস্ত থাকতে পারেন। অন্যান্য স্টোয়িক দার্শনিকদের মতো সংকীর্ণ একাডেমিক প্রয়াসে দর্শনচর্চায় আত্মনিয়োগের কথা বুঝাননি সেনেকা। বরং ইউদাইমোনিয়া বা চরম সুখ অর্জনে দর্শনের সহবত গ্রহণের সাফাই গেয়েছেন তিনি। এ ধরণের পেশাতে সন্তোষ ও মনের প্রশান্তি মিলবে এবং আমাদেরকে ওই মানুষ থেকে আলাদা করে দেবে যাদের বয়স ও সাদা চুল ছাড়া পরিপক্কতা দেখানোর আর কোন উপায় নেই।
সেরেনিউসকে প্রশান্তির পথ বাতলে দিতে গিয়ে সেনেকা বলেন, মানুষকে মাঝে মাঝে অবকাশে যেতে হয়। তিনি লিখেন, ধীরে ধীরে আলতো পায়ে একজনকে অবকাশে/বিশ্রামে যাওয়া উচিত যাতে সে সত্যিকারের প্রয়োজনীয় জিনিস করার ফুরসত পায়। পরিস্থিতি যতোই জটিল হউক না কেন একজন মানুষ ইচ্ছে করলেই সম্মানজনক কাজের সুযোগ তৈরি করে নিতে পারে।
চিঠির পঞ্চম প্যারাতে সেনেকা এথেন্সের উদাহরণ টানেন। ৩০ জন স্বৈরশাসকের অধীনে এথেন্স কত খারাপ জায়গা ছিল সে প্রসঙ্গ আনেন। কিন্তু তখনো সক্রেটিসের সক্রেটিস হয়ে ওঠা আটকায়নি। বরং তিনি সমকালীন অসংখ্য অশান্ত, পীড়িত মানুষের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি নিপীড়ক শাসক এবং পীড়িত প্রজাকূলের মধ্যে স্বাধীন মানুষ হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সবচেয়ে খারাপ শাসনের সময়ও প্রজ্ঞাবান লোক সামনে আসার পথ করে নেন। এক্ষেত্রে সেনেকার উপদেশ হচ্ছে, আমাদের সামনে রাষ্ট্র যেভাবেই হাজির হউক সেরকমভাবেই হয়তো আমাদেরকে সংকোচিত বা সম্প্রসারিত করতে হবে। বা ভাগ্যের বিড়ম্বনায় আমরা যে পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হই না কেন তা মেনে নিতে হবে। কিন্তু সমাজের কল্যাণে কাজ বন্ধ করে দেয়া যাবে না। সেনেকা মনে করেন, সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হলো মৃত্যুর আগেই মরে যাওয়া। মানে কোন প্রকার চেষ্টা না করা।

লেখক পরিচিতি:
সাবিদিন ইব্রাহিম
লেখক,
অনুবাদক

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.