কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল:


কবি ও দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল শুধু উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে নন, বরঞ্চ তামাম মুসলিম বিশ্বের প্রেক্ষিতে বিশ শতকীয় আধুনিক মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাকে যদি এই নবজাগরণের প্রধানতম মনীষী বলা হয় তাহলেও হয়তো তা অত্যুক্তি হবে না। উপমহাদেশে সৈয়দ আহমদ খান উনিশ শতকে যে আধুনিক মুসলিম চিন্তাকান্ডের সূচনা করেছিলেন তার একটি সংশোধিত, সংস্কৃত ও পরিণত রূপকল্প আমরা দেখতে পাই আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের কাব্যচিন্তা এবং দার্শনিকতায়। এর সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় হল মিশর ও সিরিয়ায় মুফতী মুহাম্মদ আবদুহু এবং রশীদ রিদার ইসলামের তরফ থেকে আধুনিকতা মোকাবেলার প্রায় সমকালীন প্রচেষ্টাটি। ঔপনিবেশিক কালে ইসলাম ও আধুনিকতার মিথষ্ক্রিয়ার এই উভয় ধারাই প্রভাবিত হয়েছিল জামালউদ্দীন আফগানীর চিন্তা ও কর্মকান্ড দ্বারা ।

উপমহাদেশ, পারসিক ও তুর্কী মুসলিম বিশ্বে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল আধুনিক, সাধারণ শিক্ষিত শ্রেণির কাছে অত্যন্ত আদরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে উঠেছেন। এটি সম্ভব হয়েছে তার ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষা এবং জ্ঞানের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য অর্জিত হবার ফলে। এই সুষমিত জ্ঞানকান্ড তার মত করে আর কোন মুসলিম মনীষী তার সমকালে অর্জন করতে পেরেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তার সমকালে উপমহাদেশে ঐতিহ্যবাদী মুসলিম জ্ঞানকান্ডে বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। যেমন আহমদ রেজা খান বেরেলভী, শিবলী নোমানী, আশরাফ আলী থানভী, হোসাইন আহমদ মাদানী, হামিদুদ্দীন ফারাহি প্রমুখ। কিন্তু আল্লামা ইকবালের মত একাধারে ইসলাম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে দখল আর কারো ছিল বলে জানা যায় না। এমনকি সমগ্র আরব বিশ্ব, পারসিক ও তুর্কী বিশ্বসহ আধুনিক মুসলিম বিশ্বে তার মত এমন সব্যসাচী সুষমিত জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আর দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না ।

এর উপরে তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রথম শ্রেণির কবি ও দার্শনিক। ফারসি ও উর্দু — দুটি প্রধান ভাষায় তিনি তার কাব্য সাধনা করেছেন। এ কারণে তিনি আধুনিক যুগে মুসলিম নবজাগরণের কবি ও দার্শনিক হিশেবে উপমহাদেশ, ইরান ও তুর্কী অঞ্চলে সমধিক পরিচিতি লাভ করেছেন। তার এই অবস্থান, সম্মান ও পরিচিতি অনন্য ও অদ্বিতীয়। এক্ষেত্রে তিনি মধ্যযুগের চিরন্তন মরমী সুফী কবি জালালউদ্দীন রুমীর আধুনিক কালের উত্তরসূরি ।
এছাড়া তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রচিন্তক। তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশকালের শেষার্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় নির্মাণ করেছিলেন। এই স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টাও তিনিই ছিলেন। এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়েছিল ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ এর বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ার একটি উপজাত অনুসিদ্ধান্ত ।

আল্লামা ইকবালের সবচাইতে বড় অবদান হল তিনি আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমদের সামনে ইসলামের এমন একটি বোঝাপড়া উপস্থাপন করেছেন যেখানে আল্লাহ ও তার খলিফা হিশেবে সৃষ্ট মানুষের সম্পর্ক একটি সুষমিত এবং ন্যায্য অবস্থান পেয়েছে। তিনি তার খুদী তত্ত্বের মধ্য দিয়ে আল্লাহর খলিফা মানুষকে তার স্রষ্টা আল্লাহর সঙ্গে একটি আত্মপ্রত্যয়ী এবং ক্রিয়ামুখী আন্তঃসম্পর্কে বয়ান করেছেন। এভাবে তাসাউফের আধ্যাত্মিক সকর্মক শক্তিকে তিনি আহরণ করেছেন কিন্তু কর্মবিমুখ বৈরাগ্য, সন্ন্যাস ও ব্যক্তিপূজা পরিত্যাগ করেছেন। তিনি ইসলামের চিরায়ত ঐতিহ্য এবং এর বিচ্যুতি ও বিকৃতির মধ্যে বৈসাম্য বিদূরিত করেছেন। এ কারণে তিনি হলেন ইমাম গাজালী থেকে ইমাম তাইমিয়া ও শেখ আহমদ সিরহিন্দী হয়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলবী পর্যন্ত ধ্রুপদী ইলমের যে প্রবহমান ধারা তার আধুনিক কালের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী। তাকে পাঠ, অনুধাবন, অনুসরণ ও অনুশীলন যেকোন সমকালীন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য ।

দ্বিজাতিতত্ত্ব ও বাংলাদেশ:


আল্লামা ইকবাল দ্বিজাতিতত্ত্বের জনক বলে পরিচিত। তার এই দ্বিজাতিতত্ত্বে তিনি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রভাবিত করেছিলেন।
১৯৪০ সালে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে লাহোর/পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে। আল্লামা ইকবাল অবশ্য ১৯৩৮ সালেই ইন্তেকাল করেছিলেন।

বাংলার মুসলমানদের নেতা হিসাবে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এই লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। অর্থাৎ বাঙালি মুসলিমদের যে অংশটি মুসলিম লীগ সমর্থক ছিল তাদের এই দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি সমর্থন ছিল। শেরে বাংলা অবশ্য পরবর্তীকালে মুসলিম লীগে সক্রিয় ছিলেন না। কিন্তু খাজা নাজিমউদ্দীন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান- এরা সকলেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে দ্বিজাতিতত্ত্বের বোঝাপড়া সবার এক রকম ছিল না। যেমন সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম দ্বিজাতিতত্ত্ব ফর্মুলার অধীনে যুক্তবাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। জিন্নাহর তাতে সমর্থনও ছিল; কিন্তু কংগ্রেস হাই কমান্ডের বিরোধীতায় তা সম্ভব হয়নি। কেবল বাংলার পূর্বাংশ ও সিলেট নিয়ে ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা গঠিত হয়েছিল এবং তা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল।

বাংলার মুসলিম নেতাদের দ্বিজাতিতত্ত্ব সম্পর্কে এই রকমের বিভিন্ন বোঝাপড়া থেকে এটা বোঝা যায় যে খোদ বাংলার মুসলমানদের মধ্যেই এই প্রশ্নে একটা অস্পষ্টতা ও দোদুল্যমানতা ছিল। এই অস্পষ্টতা ও দোদুল্যমানতা বাঙালি মুসলিমের সাধারণ আইডেনটিটি ক্রাইসিসেরই প্রতিফলন। বাঙালি মুসলমান বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের মুসলিমদের মত নিজেদের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন নয়। তাদের পরিচয় নির্ধারণে তারা তাদের বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্ব নিয়ে বরাবরই দোদুল্যমান। কারো কাছে তাদের বাঙালিত্ব আগে আবার কারো কাছে তাদের মুসলমানত্ব আগে। এই বিভিন্নতার কারণে বাংলার মুসলমানের আত্মপরিচয় সংকট তৈরি হয়েছে এবং তা এক জাতিগত অনৈক্য ও বিভেদে পরিণত হয়েছে।

এই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশের উত্থান হল তখন অনেকেই বলেছেন যে দ্বিজাতিতত্ত্ব ভুল ছিল এবং তা বাতিল হয়ে গেছে। তারা বলতে চাইলেন যে যেহেতু বাঙালি আইডেনটিটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে সেহেতু দ্বিজাতিতত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আসলে কি তাই? বাঙালি আইডেনটিটি ভিত্তিক বাংলাদেশ তো একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠেছে এবং এই স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে এদেশের বাঙালিরা তাদের মুসলমানত্বকেই কাজে লাগিয়ে যাচ্ছে।

এদিক থেকে বলা যায় বাংলাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। দ্বিজাতিতত্ত্ব মানে এই নয় যে উপমহাদেশে দুটি জাতি তাই শুধু দুটি রাষ্ট্রই থাকতে হবে- হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান। দ্বিজাতিতত্ত্ব মানে আবার এটাও নয় যে উপমহাদেশের মুসলিমরা একজাতি তাই তাদের শুধু একটি রাষ্ট্রই থাকতে হবে আর সেটা হল পাকিস্তান। অথচ আরব মুসলিমরা যেমন এক জাতি হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বিভিন্ন রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তেমনিভাবে উপমহাদেশের মুসলিমরা এক জাতি হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দুটি রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। আবুল মনসুর আহমদ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দ্বিজাতিতত্ত্বকে এভাবেই তাবিল করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশ লাহোর প্রস্তাবের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।

এছাড়া হিন্দুস্তানেও উপমহাদেশের মুসলিমদের একটি বড় অংশ বাস করছে। আর হিন্দুস্তানে সাম্প্রতিককালে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থানে সেখানকার মুসলিমদের উপর যে অত্যাচার ও নিপীড়ন চলছে তা আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বকে বারবার সঠিক বলে প্রমাণ করছে।

আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব, সাম্প্রদায়িকতার বয়ান ও বাংলাদেশ:


আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব উপমহাদেশের মুসলিমদের একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখন্ডগুলি সম্মিলিতভাবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল।

কিন্তু আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচনায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিল। কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃত্ব তো বটেই এমনকি এর মুসলিম নেতা যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ দ্বিজাতিতত্ত্বকে “সাম্প্রদায়িক” আখ্যা দিয়ে এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়া দেওবন্দের মওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীও ইকবালের এই দ্বিজাতিতত্ত্বকে “সাম্প্রদায়িক” এবং উপমহাদেশের মুসলিম ঐক্যের পরিপন্থী মনে করে এর সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন। তিনি কংগ্রেসের কথিত “ধর্মনিরপেক্ষ” অখন্ড ভারত ধারণা সমর্থন করেছিলেন।

পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা আল্লামা ইকবালের এই দ্বিজাতিতত্ত্বকে উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন করে পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দিয়েছিল। এর কারণ ছিল পূর্ব বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক মুসলিমদের উপর সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দু জমিদারদের শোষণ ও জুলুম। এই অত্যাচার ও জুলুম এই অঞ্চলের মুসলিমদের কাছে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ের ধারণাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই পূর্ব বাংলায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি বাঙালিত্ব নির্ভর প্রতিবাদী ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বয়ানের সূচনা করে। ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েমের পরিবর্তে এমন একটি রাষ্ট্র কায়েম হয় যার নিয়ন্ত্রণে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ততন্ত্রের অবশেষ, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র। কমবেশি জাতিগত ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল এই রাষ্ট্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় ক্রমান্বয়ে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চণার বয়ান জোরদার হতে শুরু করে। এই আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চণার পাটাতনে দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচক হিশেবে “সাম্প্রদায়িকতা”র ভারতীয় বয়ানটি অনুপ্রবেশের সুযোগ পেয়ে যায়।

এক্ষেত্রে এদেশের বামপন্থী ও বাঙালি জাতিবাদী বুদ্ধিজীবি, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনীতিবিদেরা একজোট হয়ে ভূমিকা রাখে। এই বয়ানের বিনির্মাণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ থেকে শুরু করে আবদুল গাফফার চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হান, ওয়াহিদুল হক, সনজীদা খাতুন, আনিসুজ্জামান, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, সিরাজুল আলম খান প্রমুখ নিজ নিজ অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করেছেন।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের দুই প্রধান রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম অখন্ড ভারতীয় রাষ্ট্রচেতনার মধ্যে বাঙালি উৎকর্ষের প্রবক্তা ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দুজনকেই পূর্ব বাংলার এই নব স্বতন্ত্র বাঙালি আত্মপরিচয়ের প্রধানতম বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আইকন হিশেবে আত্মীকরণ করা হয়েছে। এভাবে আল্লামা ইকবালের ইনসাফ ও আদল-ভিত্তিক উম্মাহচেতনা বা বিশ্বমুসলিম চেতনা থেকে বিযুক্ত হয়ে এক আঞ্চলিক/ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক বাঙালি চেতনায় পূর্ব বাংলা নিজেকে অভিষিক্ত করেছে। এভাবে ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচনা ও কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নাকচ করার এই প্রক্রিয়াটি যেমন ছিল অর্গ্যানিক তেমনি ছিল একাধারে ভারতীয় সাংস্কৃতিক অনুচরদের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার সম্মিলিত ফলাফল।

এই প্রক্রিয়ার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হল ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ রাষ্টের অভ্যুদয়। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পরেও আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায়নি। এর কারণ হল ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিবেশী বৃহৎ আধিপত্যবাদী ভারত রাষ্ট্র থেকে নিজের স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করতে গিয়ে পুনরায় এর নাগরিকদের মুসলমানত্বকেই কাজে লাগাচ্ছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে যেমন তার “বাঙালি জাতীয়তাবাদ”কে মুসলমানত্ব দিয়ে সম্পূরণ করে নিতে হচ্ছে/ হবে তেমনি বিএনপিকেও তার ভৌগোলিক সীমানানির্ভর আধাখেঁচড়া “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”কে ফাইন টিউন করে নিতে হবে।

এদিক থেকে বলা যায় বাংলাদেশকে যত বেশি আত্মপ্রত্যয়ী এবং মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিশেবে গড়ে তোলা হবে তত বেশি এদেশকে আল্লামা ইকবালের ইনসাফ ও আদল-ভিত্তিক উম্মাহচেতনা বা বিশ্বমুসলিম চেতনায় ফিরে যেতে হবে। এভাবে বাংলাদেশ এই উপমহাদেশে একটি শক্তিমান ও আত্মনির্ভরশীল মুসলিম রাষ্ট্র হিশেবে বিকশিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্র থেকে একটি স্বকীয় সত্তা বজায় রেখে মুসলিম উম্মাহতে এর যোগ্য স্থান করে নিতে পারবে।

লেখক পরিচিতি:
মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত
লেখক
কবি
চিন্তাবিদ
গবেষক

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.