Relevance of Iqbal in Bangladesh - Manohar Shamsi Sakhawat

আল্লামা ইকবালের স্বদেশচেতনার প্রথম পর্যায়:


আল্লামা ইকবালের উম্মাহচেতনা গড়ে ওঠার একটি বিবর্তনমূলক ইতিহাস রয়েছে। এই চেতনা একদিনে গড়ে ওঠেনি, এটি গড়ে উঠতে সময় লেগেছে। পাশ্চাত্যে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের আগে তিনি ‘তারানা-ই-হিন্দী’ (১৯০৪) নামক যে কবিতা লিখেছিলেন সেখানে তিনিও হিন্দুস্তানের ভৌগোলিক সীমানানির্ভর এক জাতীয়তাবাদের প্রতি তার আবেগ ও আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। উপমহাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ কবি ইকবাল এই কবিতায় ভারতীয় ভূখন্ডভিত্তিক ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যভিত্তিক এক সম্মিলিত জাতীয়তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।তিনি লিখেছিলেন:
সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা
হাম বুলবুলেঁ হ্যাঁয় ইস কী ইয়ে গুলসিতাঁ হামারা
গুর্বাত মেঁ হোঁ আগার হাম, রেহতা হ্যাঁয় দিল ওয়াতান মেঁ
সমঝো ওয়াহীঁ হামে ভী দিল হো যাহা হামারা
পর্বত য়োহ সবসে উঁচা, হাম-সায়া আসমাঁ কা
য়োহ সঁনতরী হামারা, য়ো পাসবাঁ হামারা
গোদী মেঁ খেলতী হ্যাঁয় ইস কী হাজারোঁ নদিয়াঁ
গুলশন হ্যাঁয় যিস কে দম সে রশ্ক-এ-জিনা হামারা
অ্যায় আব-এ-রুদ-এ-গঙ্গা য়োহ দিন হ্যাঁয় ইয়াদ তুঝ কো?
উতরা তীরে কিনারে যব কারওয়াঁ হামারা
মাযহাব নেহীঁ সিখাতা আপস মেঁ বেয়র রাখনা
হিন্দী হ্যায়ঁ হাম, ওয়াতান হ্যাঁয় হিন্দুস্তাঁ হামারা
য়ুনান-ওয়া-মিসর-ওয়া-রুমা সব মিট গেয়ে জাহাঁ সে
আব তক মাগার হ্যাঁয় বাকী নাম-ওয়া-নিশানা হামারা
কুচ বাত হ্যায় কে হাস্তি মিটতি নেহি হামারি
সাদিয়োঁ রাহা হ্যায় দুশমন দৌড়-এ-জাহাঁ হামারি
ইকবাল! কোই মাহরুম আপনা নেহীঁ জাহাঁ মেঁ
মালুম ক্যা কিসী কো দর্দ-এ-নিহাঁ হামারা! [১]

অনুবাদ:
সারা বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম আমাদের এই হিন্দুস্তান
আমরা এদেশের বুলবুল, এদেশ আমাদের গুলিস্তান
বিদেশ বিভুয়ে-ও যদি পড়ে থাকি তবুও এদেশ থাকে আমাদের হৃদয়ে
তুমি মনে কোর আমি সেখানেই থাকি যেখানে আমার হৃদয় বিরাজে
ঐ পর্বত সবচেয়ে উঁচু, যেন আসমানের নিকটতম প্রতিবেশী
জেনো ওরা আমাদের সান্ত্রী, ওরা আমাদের নিরাপত্তা রক্ষী
সহস্র নদী আর তটিনী এদেশের কোলে কুলু কুলু বয়
এদেশের প্রাণজ ফুলবাগান জেনো অনেকের ঈর্ষা জাগায়
হে গঙ্গা নদীর তরঙ্গমালা, তোমার কি সেই দিনের কথা মনে পড়ে?
যেদিন তোমার তীরে আমাদের অভিযাত্রীদল স্থায়ী আবাস গড়ে
ধর্ম তো শেখায়নি নিজেদের মধ্যে গড়তে বিভেদ-বিদ্বেষ
আমরা সবাই হিন্দী, হিন্দুস্তান-ই আমাদের দেশ
গ্রীক, মিশর ও রোম সব পতিত হয়েছে এই বিশ্ব থেকে
অথচ আমাদের নাম ও নিশানা আজ অবধি টিকে আছে
একথা বলা যায় যে আমাদের অস্তিত্ব মিটে যাবার জন্য নয়
যদিও শতাব্দীর পর শতাব্দী ছিলাম পরস্পর শত্রু তা নিশ্চয়
ইকবাল! এই জগতে কেউ-ই আমাদের আপনজন নয়
গোপন ব্যাথার সমব্যথী হবে কে আছে এমন এ বিশ্বময় [২]


রেফারেন্স:
[১] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-হিন্দী, উর্দু টেক্সটের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ করা হয়েছে Rekhta.org অবলম্বনে
[২] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-হিন্দী, বাংলা অনুবাদ: মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

আল্লামা ইকবালের স্বদেশচেতনার দ্বিতীয় পর্যায়:


আমরা জানি যে আল্লামা ইকবাল ১৯০৫ সালে উচ্চশিক্ষার্থে ইউরোপে গিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড ও জার্মানীতে উচ্চশিক্ষা সূত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করে তিনি তিন বছর পরে ভারতে ফিরে আসেন। এই সময়ে তার মানসগঠনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে; এই পরিবর্তন এত সুগভীর ও মৌলিক ছিল যে একে জ্ঞানকান্ডিক মহাসরণ (Paradigm Shift) আখ্যা দেয়া যায়।
পাশ্চাত্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাকে পশ্চিমা আধুনিক এবং সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী সংঘাত ও সংঘর্ষ সম্পর্কে শংকিত করে তোলে। নৃসত্তাগত, ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গঠিত ইউরোপীয় জাতি ও রাষ্ট্রগুলি কিভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে গণঘৃণা ও হিংসায় লিপ্ত হয় তা তিনি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক উদার গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত নাস্তিক্য, বস্তুবাদ, বিজ্ঞানবাদ, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতালিপ্সা ও প্রকৃতিবিনাশ তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বিশ শতকের শুরুতেই।

আবার এসবের বিকল্প হিশেবে উদ্ভূত কমিউনিজম ও ফ্যাসিজমের শুভংকরের ফাঁকিও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আল্লামা ইকবাল হলেন আধুনিক কালের মুসলিম মনীষীদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন অগ্রনায়কের একজন; যদিনা তাকে এদের মধ্যে সবচাইতে সমৃদ্ধতম ব্যক্তিত্ব-ই বলা যায়, তাহলেও বলা যায় যে তিনি এনলাইটেনমেন্ট-উত্তর ইউরোপের সেক্যুলার এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার শিখর মুহূর্তেই এর অন্তর্নিহিত অন্তর্বিরোধ, অসম্পূর্ণতা এবং একমাত্রিকতা লক্ষ করতে পেরেছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার এই সংকটের একটি অভূতপূর্ব জ্ঞানকান্ডিক পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন; এবং এই পর্যালোচনা ও সমালোচনার ক্ষেত্রে তিনি কুরআনভিত্তিক তৌহিদী ইলমকে তার জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎস ও সূত্র হিশেবে প্রয়োগ করেছিলেন।
জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটে, দার্শনিক নিটশে এবং ফরাসি দার্শনিক অঁরি বের্গসঁ আল্লামা ইকবালের এই প্রতীচ্য পর্যালোচনায় অনুপ্রেরণা ও পুষ্টি জুগিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইমাম গাজালী, ইবনুল আরাবী, মওলানা রুমী এবং ল্যাটিন মহাকবি দান্তে তার সৃজনশীল রচনার বিষয়, ভাষা, আঙ্গিক, প্রকরণ ও শৈলীর উপরে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এইসব কিছু বিবেচনায় আল্লামা ইকবাল হলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে আধুনিক যুগের মুসলিম তাজদীদি চিন্তা, রচনা ও কর্মকান্ডের প্রধানতম নকীব — একথা বললে খুব বেশি আপত্তি উঠবে বলে মনে হয় না।
এই প্রেক্ষিতে যদি আমরা আল্লামা ইকবালের ১৯১০ সালে লেখা ‘তারানা-ই-মিল্লী’ পুনর্পাঠ করি তাহলে আমরা ‘তারানা-ই-হিন্দী’র (১৯০৫) সঙ্গে এর শিকড়িক ভিন্নতা অনুধাবন করতে পারব। অর্থাৎ ইউরোপফেরত পরিবর্তিত ইকবাল ইসলামের মর্মবাণী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভারতীয় ভূখন্ডভিত্তিক ও সম্মিলিত জাতিভিত্তিক আত্মপরিচয়ের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে তৌহিদী চেতনাভিত্তিক আখলাকী ও রুহানী বিশ্বমুসলিম উম্মাহ বা মিল্লাত চেতনায় নিজেকে অভিষিক্ত করলেন।

এ এক নতুন ইকবাল; এ এক নতুন চেতনা ও বিশ্ববোধ যা শুধু তাকেই বদলে দেয় নি; যা সমগ্র ভারতবর্ষের মুসলিম থেকে শুরু করে এমনকি মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলের অন্বেষী মুসলিমকেও প্রভাবিত করেছে। আলজেরিয়ার মুসলিম চিন্তক মালেক বেন্নাবি, ইরানের বিপ্লবী তাত্ত্বিক আলী শরীয়তি থেকে হালের মিশরীয়-সুইস মুসলিম চিন্তক ও লেখক তারিক রমাদান প্রমুখ অনেকেই আল্লামা ইকবালের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বলে জানা যায়।
আসুন আমরা আল্লামা ইকবালের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আলোকে ‘তারানা-ই-হিন্দী’র প্রতিকবিতা হিশেবে তার ‘তারানা-ই-মিল্লী’ পাঠ করি:

চীন**-ও-আরব হামারা, হিন্দুস্তাঁ হামারা
মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ হামারা
তাওহীদ কি আমানত সিনোঁ মে হ্যায় হামারে
আসাঁ নেহি মিটানা নাম-ও-নিশান হামারা
দুনিয়া কে বুত-কাদোঁ মে পেহলা য়ো ঘর খোদা কা
হাম ইস কে পাসবাঁ হ্যায়, য়ো পাসবাঁ হামারা
তেগোঁ কে সায়ে মে হাম পল কর জওয়াঁ হুয়ে হ্যায়
খঞ্জর হিলাল কা হ্যায় কওমি নিশান হামারা
মাগরিব কি ওয়াদিয়োঁ মে গুঁজি আযাঁ হামারি
থামতা না থা কিসি সে সায়ল-এ-রাওয়াঁ হামারা
বাতিল সে দাবনে ওয়ালে এয় আসমাঁ নেহি হাম
সৌও বার কর চুকা হ্যায় তু ইমতিহাঁ হামারা
এয় গুলিস্তান-এ-উন্দুলুস! য়ো দিন হ্যায় ইয়াদ তুঝ কো
থা তেরি ডালিয়োঁ মে যব আশিয়াঁ হামারা
এয় মৌজ-এ-দাজলা তু ভি পেহচানতি হ্যায় হাম কো
আব তক হ্যায় তেরা দরিয়া আফসানা-খাঁ হামারা
এয় আরদ-এ-পাক! তেরি হুরমত পে কাট মারে হাম
হ্যায় খুন তেরি রগোঁ মে আব তক রাওয়াঁ হামারা
সালার-এ-কারভাঁ হ্যায় মীর-এ-হিজায আপনা
ইস নাম সে হ্যায় বাকী আরাম-এ-জাঁ হামারা
‘ইকবাল’ কা তারানা বাঙ্গ-এ-দরা হ্যায় গোয়া
হোতা হ্যায় জাদা-পেয়মা ফির্ কারভাঁ হামারা [১]

অনুবাদ:
চীন** ও আরব আমাদের, হিন্দুস্তান আমাদের
আমরা মুসলমান; সারা বিশ্ব-ই দেশ আমাদের
তাওহীদের আমানত বহন করছি সিনায় আমাদের
সহজ নয় মিটিয়ে ফেলা নাম ও নিশান আমাদের
এই পৃথিবীর মূর্তিশালায় প্রথম ঐ ঘর খোদার
আমরাই তার প্রহরী, সেটিও প্রহরী আমাদের
তলোয়ারের ছায়ায় পালিত হয়েছে যৌবন সকলের
সরু চাঁদের মত খঞ্জর ঐ জাতীয় নিশান আমাদের
পাশ্চাত্যের উপত্যকায় ছড়িয়ে দিয়েছি আযান সুমধুর
থেমে যায় নি কোনো কিছুতেই অগ্রাভিযান আমাদের
হে আসমান! মিথ্যা কভু দাবাতে পারেনি আমাদের
শতবার তুমি পরীক্ষা নিয়েছো আমাদের সকলের
হে আন্দালুসের গুলিস্তান! তোমার কি মনে পড়ে সে প্রহর
যখন তোমার শাখা-প্রশাখায় ছিল আমাদের প্রিয়তম নীড়?
হে দজলার লহরী! তুমিও তো ঠিকঠাক চিনেছো আমাকে
আজও তোমার স্রোতপ্রবাহে আমাদের বীরগাঁথা বয়ে চলে
পবিত্র পৃথিবী! মৃত্যুকে বরণ করে রেখেছি তোমার সম্মান
তোমার শিরায় শিরায় আজও আমাদের শোণিত প্রবহমান
হেজাযের নেতা আমাদের কাফেলার নায়ক
তার নাম-ই আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি-বাহক
ইকবালের গান যেন জাগরণী ঘন্টাধ্বনি আমাদের
আবার যেন হয়েছে চলমান কাফেলাযান সকলের

রেফারেন্স:
**উর্দু ভাষায় চীন বলতে সে সময়ে মধ্য এশিয়ার বৃহত্তর তুর্কিস্তান বোঝায়। আমু ও সির দরিয়া কেন্দ্রিক এই মধ্য এশীয় অঞ্চলে বিভিন্ন দেশ অন্তর্ভুক্ত যেমন উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, জিনজিয়াং ইত্যাদি।
[১] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-মিল্লী, উর্দু টেক্সটের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ করা হয়েছে Rekhta.org অবলম্বনে
[২] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-মিল্লী, বাংলা অনুবাদ: মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

আল্লামা ইকবালের সম্প্রদায়চেতনা, লাহোর প্রস্তাব ও দেওবন্দী আলেম সমাজ:

“Nations are born in the hearts of poets; they prosper and die in the hands of politicians.” -Allama Muhammad Iqbal [১]
আল্লামা ইকবাল তার কবিতা ও চিন্তায় উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়চেতনা ও আত্মপরিচয়ের ধারণা পরিস্ফুট করেছিলেন। তার এই ধারণাটি উপমহাদেশের তৎকালীন স্থান ও কালের বাস্তবতাকে স্বীকার করেই সূচিত হয়েছিল। অর্থাৎ তিনি তার ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ ভাষণে ভারতের মুসলিমদের জন্য যে স্বতন্ত্র ও পৃথক আবাসভূমির প্রস্তাব করেছিলেন তা প্রথমত উপমহাদেশ-কেন্দ্রিকই ছিল। এক্ষেত্রে তিনি উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু আধিপত্যের প্রেক্ষিতে উপমহাদেশের অপেক্ষাকৃত সংখ্যালঘু মুসলিমদের সার্বিক সুরক্ষার জন্য এই ধর্মভিত্তিক ভিন্ন পরিচয়ের ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন।
উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য তার এই সুনির্দিষ্ট দেশ ও সম্প্রদায়চেতনাকে আপাতদৃষ্টিতে একটি প্রতিক্রিয়ামূলক (Reactive) ও নেতিবাচক ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠিচেতনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তার এই নির্দিষ্ট স্থানিক ও কালিক চেতনা ও পরিচয়ের যে উপরিতল তার গভীরে প্রোথিত ছিল একটি অবতলীয় স্থান-কালের সংকোচন-অতিক্রমী এক বৈশ্বিক ও ভবিষ্যমুখী মুসলিম মিল্লাত বা উম্মাহর ধারণা। কাজেই তার এই ধারণাকে “সাম্প্রদায়িক”, “প্রতিক্রিয়াশীল” ও “নেতিবাচক” বলার কোন অবকাশ নেই। বরঞ্চ তার এই ধারণা একাধারে স্থানিক ও কালিক এবং বৈশ্বিক ও ভবিষ্যবাচক। কারণ তিনি তার এই উপমহাদৈশিক বাস্তবোচিত মুসলিম জাতি ও রাষ্ট্র চেতনার রূপকল্পের মধ্যে এক ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য বিশ্বমুসলিম উম্মাহ ও খেলাফতের সূচনাকল্প দেখতে পেয়েছিলেন।

উসমানী খেলাফতের সদ্য বিলুপ্তির প্রেক্ষাপটে আল্লামা ইকবাল উপমহাদেশের মুসলিমদের উপর আধুনিক যুগের বিশ্বমুসলিম নবজাগরণের গুরুদায়িত্ব ও নেতৃত্ব অর্পিত হয়েছে বলে মনে করতেন। তার এই স্বতন্ত্র ও পৃথক মুসলিম সম্প্রদায় ও রাষ্ট্র চেতনা ও ধারণার ছিল বিভিন্ন মাত্রা ও বহুস্তর। আর এই আনুভূমিক ও উল্লম্ব বহুত্বের অন্তর্নিহিত সুষমা ও ভারসাম্য তার এই ধারণাটিকে একটি স্থান-কাল-পাত্র-উত্তীর্ণ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। তার এই ধারণার এই উচ্চায়ত ও তুরীয় অবস্থানের প্রধান কারণ হল এই ধারণাটির শিকড় ও উৎস নিহিত ছিল ঐশী সত্যের আধার পবিত্র কু’রআন ও সুন্নাহ-তে। তিনি তার মেধাশ্রমলব্ধ ইলম ও আধুনিক জ্ঞানের সংশ্লেষণের মাধ্যমে তিনশ বছর ব্যাপী মুসলিম উম্মাহর ক্রমাগত পতনের ধারাকে একটি নবজীবন ও পুনর্গঠনের ধারায় পুনর্স্থাপনের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল অগ্রনায়ক বা নকীব ছিলেন।
উপমহাদেশের বিশেষ প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে প্রস্তাবিত আল্লামা ইকবালের এই বিশ্বমুসলিম উম্মাহ বা মিল্লাত চেতনা সমকালীন ও উত্তরকালের মুসলিমদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রথমত আমরা দেখতে পাই যে এই ধারণাটিকে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে উপমহাদেশের আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম এলিট ও নেতৃত্বগোষ্ঠী তাদের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ রূপকল্প হিশেবে গ্রহণ করেছিল। উপমহাদেশের মুসলিমদের প্রধান রাজনৈতিক দল হিশেবে মুসলিম লীগের কর্মসূচি ও কার্যক্রমকে বিবেচনায় রাখলেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব। এই পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা থেকে বোঝা যায় যে কিভাবে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে আল্লামা ইকবালের এই চৈন্তিক মহাসরণকে স্বতন্ত্র ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র ভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেছিল।
এই পর্যালোচনা থেকে আরো লক্ষ করা যায় যে মুসলিম লীগের বাঙালি মুসলিম নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে এই লাহোর প্রস্তাবের পরবর্তীকালের বিবর্তিত রূপ অর্থাৎ প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠন ও কাঠামো নিয়ে ভিন্নমত ছিল। এই ভিন্নমত বা সংশয় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে এই রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার পূর্বেই। [২] কাজেই ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বোঝাপড়া নিয়ে বাঙালি মুসলিম এলিট ও সাধারণের এই ভিন্নমত ও দোদুল্যমানতা স্মরণে রাখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। [৩]
আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম এলিট ও নেতৃত্বের ভূমিকা ও মনোভাব বিশ্লেষণের পাশাপাশি তৎকালীন ঐতিহ্যবাদী মাদরাসা শিক্ষিত মুসলিম উলামা বা আলেম সমাজের ভূমিকাও এই প্রেক্ষিতে পর্যালোচনার দাবী রাখে। এই পর্যালোচনা থেকে বিস্ময়কর যে প্রবণতাটি লক্ষ করা যায় সেটি হল আল্লামা ইকবালের চিন্তার আলোকে গঠিত এই পাকিস্তান প্রশ্নে উলামাদের মধ্যেও দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে দেওবন্দ মাদরাসা ভিত্তিক উলামাদের একাংশ মওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীর নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত জাতীয়তার ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন। এক্ষেত্রে তারা যে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল তৎকালীন কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। [৪]

তবে ঐতিহ্যবাদী আলেম সমাজের আরেকটি অংশ মওলানা আশরাফ আলী থানভীর অনুপ্রেরণা এবং আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত ভারতীয় জাতীয়তার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা পাকিস্তান ধারণার মধ্যে ভবিষ্যত মুসলিম উম্মাহ ও খেলাফতের পুনরুজ্জীবনের প্রাথমিক সূত্রপাতের সূপ্ত সম্ভাবনা আবিস্কার করেছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে তারা এই লক্ষ্যে উপমহাদেশের মুসলিমদের সংহতি ও ঐক্যমূলক এক মহাপ্রস্তুতি হিশেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এক্ষেত্রে তারা পাকিস্তানকে আধুনিক যুগে ও বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে একটি মৌলিক ভিত্তিভূমি হিশেবে দেখেছিলেন।
তারা পাকিস্তানকে একটি “দ্বিতীয় বা নয়া মদিনা” আকারে চিন্তা করেছিলেন। [৫] আধুনিক ও ঐতিহ্যবাদী মুসলিমদের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে একটি ক্রমবিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ইসলাম-ভিত্তিক মার্কাজটি প্রতিষ্ঠিত ও পরিগঠিত হবে বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। তারা পাকিস্তানকে রাসুল (স.) কর্তৃক পূর্বঘোষিত শেষ জামানায় অনুষ্ঠিতব্য গাজওয়ায়ে হিন্দ, ঐতিহাসিক খোরাসান থেকে আগন্তুক ইমাম মাহদীর সহযোগী লশকর বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যে গমন, হজরত ঈসা (আ.)-এর আগমন-সহ বিভিন্ন মহা সংঘটনের পূর্বপ্রস্তুতিমূলক মুসলিম উম্মাহর একটি প্রারম্ভিক কাঠামো হিশেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ আল্লামা ইকবালের উম্মাহচেতনা আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানীর ব্যাখ্যা ও ভাষ্যের মধ্য দিয়ে একটি শারি’য়ি বয়ান ও আখ্যানে পরিণত হয়েছিল। এই বয়ান ও আখ্যান মানবেতিহাসের ইহলৌকিক পরিসমাপ্তি ও এর পারলৌকিক অভিযাত্রার আখলাকি ও রুহানি সময়কালকে অনুসরণ করে গঠিত হয়েছিল। এটি শুধুমাত্র একটি ইহজাগতিক মানবকেন্দ্রিক প্রকল্প ছিল না; বরঞ্চ একটি দ্বীন ভিত্তিক একাধারে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক লক্ষ্যাভিসারী প্রকল্প ছিল।

কাজেই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি পাকিস্তানের যে বাস্তবতা অর্থাৎ যে সামন্তবাদী, ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও সেনাবাহিনী এবং পাশ্চাত্য জ্ঞানকান্ড ভিত্তিক সিভিল সোসাইটি দ্বারা সেই পাকিস্তান পরিচালিত হয়েছে তার সমস্যা ও সংকটের দায় ও দায়িত্ব না আল্লামা ইকবালের না আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানীর। কামালবাদী উগ্র সেক্যুলার ও মডার্ন ক্ষমতাসীন এলিট পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ইসলামিক রেটরিক্সের আড়ালে যে ইউরোকেন্দ্রিক, ভেস্টফ্যালিয়ান, প্রেটোরিয়ান, ক্লেপ্টোক্র্যাটিক অলিগার্কিতে পরিণত করেছিল সেই বিচ্যুত রাষ্ট্রটি ১৯৭১ সালে একটি পূর্বাঞ্চলিক গৃহযুদ্ধ ও এর অব্যবহিত পরে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রথাগত যুদ্ধে নিপতিত হয়ে বিভক্ত হয়েছিল। কিন্তু এর মাধ্যমে আল্লামা ইকবাল ও আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানীর দ্বিজাতিতত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়নি। [৬]
একটি বাঙালি ভাষাগত, জাতিসত্তাগত ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার বয়ানকে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বঞ্চণা ও বৈষম্যের অতিরঞ্জিত আখ্যান দ্বারা পরিপুষ্ট করে তুলে পাকিস্তানের পূর্বাংশকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। এর ফলাফল হিশেবে একটি স্বাতন্ত্র্যবাদী স্বায়ত্বশাসনের রাজনৈতিক আন্দোলন পারস্পরিক বিভেদ, বিদ্বেষ, ঘৃণা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসে পর্যবসিত হয়ে একটি আঞ্চলিক গৃহযুদ্ধের অবতারণা করেছিল। [৭] এই গৃহযুদ্ধ কালে পাকিস্তানের অস্তিত্বমূলক হুমকি হিশেবে উপমহাদেশের প্রতিবেশী যে রাষ্ট্রটি ১৯৪৭ সাল থেকে এর অঙ্গচ্ছেদের বদলা নিতে বদ্ধপরিকর ছিল তা এই পরিস্থিতির সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে কোন কসুর করেনি। ফলে কামালবাদী পাকিস্তানের পূর্বাংশকে ১৯৭১ সালে একটি করদ রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। উপমহাদেশ ও বিশ্বমুসলিম উম্মাহ – উভয় প্রেক্ষিতেই এটি উপমহাদেশীয় সম্মিলিত মুসলিম রাষ্ট্রের আদিপ্রকল্পের জন্য একটি মহা বিপর্যয় বা নাকবা। আর এই প্রেক্ষিতে আল্লামা ইকবালের সেই উক্তিটি প্রযোজ্য ও প্রাসঙ্গিক যেটিকে এই নিবন্ধের শুরুতেই উদ্ধৃত করা হয়েছে। তার এই উক্তিটি এত প্রফেটিক যে বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না।
এই গবেষণামূলক নিবন্ধের শেষের পর্বগুলিতে আমরা পর্যালোচনা করতে চাই যে ১৯৭১-এ বাংলাদেশ সৃষ্টির পর প্রায় পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হবার পরে আজকের বাস্তবতায় আল্লামা ইকবালের উম্মাহচেতনাভিত্তিক উপমহাদেশের মুসলিম ঐক্য ও সংহতি কতটা প্রযোজ্য ও প্রাসঙ্গিক। এক্ষেত্রে আমরা যা আশার সঞ্চারী হিশেবে লক্ষ করি তা হল বাংলাদেশ রাষ্ট্র বর্তমান ভারত রাষ্ট্রের প্রভাবাধীন হওয়া সত্ত্বেও এখানে পশ্চিম বাংলা বা ভারতের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের দাবী এখন অবধি অত্যন্ত ক্ষীণ ও দুর্বল। কাজেই আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব একেবারে হারিয়ে যায়নি।

অতএব বাংলাদেশেও আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম মধ্যপন্ন্থীদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাদী উলামাদের একটি বড় অংশের সমঝোতা, ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলা সম্ভব হলে বাংলাদেশও দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম মার্কাজ হয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ২০১৩-এর শাপলা গণসমাবেশ-উত্তর বাংলাদেশে ভারতপন্থী আওয়ামী লীগের সঙ্গে এদেশের দেওবন্দী উলামাদের একাংশের গাঁটছড়া একটি প্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। এই বাস্তবতায় এদেশে আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী প্রদর্শিত চিন্তা ও আদর্শ লালনকারী কওমি উলামাদের উত্থান ও আধুনিক শিক্ষিত মধ্যপন্থীদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা এখন সময়ের দাবী। এই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে মৌলিক রূপান্তর সম্ভব হতে পারে তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্যও একটি সম্পদসদৃশ কাঠামো হিশেবে পরিগণিত হতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।

রেফারেন্স:
[১] Muhammad Iqbal, Stray Reflections (1910): The Private Notebook of Muhammad Iqbal, Edited by Dr. Javid Iqbal, Revised and annotated by Khurram Ali Shafique, Iqbal Academy Pakistan, Lahore, 1961, 94. Poets and Politicians, p. 112, This reflection was first published in ‘New Era’, Lucknow, 1917.
[২] Mohammad Shah, Lahore Resolution, Banglapaedia, en.banglapedia.org/index.php?title=Lahore_Resolution, Accessed on May 14, 2020
[৩] Harun-or-Rashid, The Foreshadowing of Bangladesh: Bengal Muslim League and Muslim Politics 1906-1947, The University Press Ltd, 2010
[৪] Venkat Dhulipala, Creating A New Medina: State Power, Islam, and the Quest for Pakistan in Late Colonial North India, Cambridge University Press, Cambridge, 2015
[৫] Ibid, p. 361.
[৬] Salman Sayyid, Recalling the Caliphate: Decolonisation and World Order, C. Hurst & Co., London, 2014, p. 126
[৭] Richard Sisson & Leo E. Rose, War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh, University of California Press, Berkeley, 1990, p. 1

লেখক পরিচিতি:
মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত
লেখক ,কবি
গবেষক ,চিন্তাবিদ

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.