Islam and Bengali Muslims

ইসলাম মানে মৌলবাদ আর মুসলমান, জিহাদ(চেষ্টা প্রচেষ্টা) ও কুরবানী এই প্রসঙ্গ এলেই তখন সে মৌলবাদী, এই চরমপন্থী চিন্তার বিষ ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা প্রচার করে থাকে । তারপর এদেশে অবস্থানরত ভারতীয় দালাল শ্রেণীর কিছু বুদ্ধিজীবী যারা এই চিন্তাধারা লালন করে এবং প্রচার করতে থাকে । তসলিমা নাসরিন, মুনতাসির মামুন, শাহরিয়ার কবির, জাফর ইকবাল, হুমায়ুন আজাদ এরা প্রথমত মুসলিম ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে তাই লিঙ্গ ও পোষাকে পাক্কা মুসলমান । কিন্তু বুদ্ধি জ্ঞান ও ইলমে এরা মুসলমান হতে পারে নাই । লিঙ্গ কর্তন বা পোষাক পরিধানে মুসলমান হওয়া বা মুসলমান থাকা নির্ভর করে না ; মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে আসল পার্থক্য হচ্ছে উভয়ের ইলম বা জ্ঞানের পার্থক্য । এই পার্থক্য অতিক্রম করে এই বুদ্ধিজীবিরা মুসলমান হতে পারে নাই । তবে একদিকে তারা যেমন ইসলামের ক্ষতি করেছে অন্যদিকে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের গোলামী করে একটা “না আল্লাহ না মুসলমান “(সেক্যুলার বাঙালি) স্লোগান ধারণ করে নিজেদের সত্যবাদী ও স্বৈরাচার বিরোধী সুশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে । এই চিন্তাও কোলকাতার বুদ্ধিজীবীদের থেকে ধার করা । তারা যেমন ধর্মকে গৌন করে সুশীল মুখ প্রদর্শন করে তেমনি তাদের দর্শনও ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিরোধী ।এই বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের লেখনীতে ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতি- সভ্যতার বিকাশ ঘটেনি । বরঞ্চ তারা ইসলাম ও ইসলামী চিন্তাধারার বিরোধিতা করেছে ।আমার একটা বিষয় ভেবে আসে না, তারপরও কিভাবে এই বুদ্ধিজীবিরা মুসলমানদের হৃদয় মধ্যমণি হয়ে আছে ।
তবে কি এ দেশের সাধারণ মুসলমানরাও লিঙ্গে আর পোষাকে মুসলমান । ইলম বা জ্ঞানে মুসলমান হতে পারে নাই । তাই তাদের বুদ্ধি জ্ঞান দিয়ে কে মুসলমান আর কে ব্রাহ্মণ্যবাদী গোলাম তা পরখ করতে পারে নাই ।

এই দেশের ভারাটে বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত দুই ভাবে লাভবান হয় ,
এক.
অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জন করে ।
দুই.
ইসলাম ও মুহাম্মদ স. এর প্রতি বিদ্বেষ ও তীব্র ঘৃণা প্রচার করে পৈশাচিক বিদ্বেষ মনোতৃপ্তি পায় ।


সরাসরি এই বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না বলেই যারা ইসলাম ও মুহাম্মদ স. এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে তাদের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বন্ধুত্ব, আনুগত্য ও সর্বোপরি সহায়তা করে এই দালাল শ্রেণী ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের নগ্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে থাকে । অন্য দিকে যারা ইসলাম প্রচার করে এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামী মতাদর্শ ধারণ করে, তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের ফ্যাসিস্ট টারমিনোলজি ব্যবহার করে জুলুম, নির্যাতন ও মানসিক পীড়ন করে তাদের দমিয়ে রাখে । ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে কোনঠাসা করে রাখে ।
মুসলমান, কুরআন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া এই ব্রাহ্মণ্যবাদী বুদ্ধিজীবীরা কখনোই ইসলামী ভ্রাতৃত্বের ঊর্ধে নয় ।
তেমনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতীয়দের সাথে পারষ্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে কিন্তু সেই সম্পর্ক ইসলাম ও মুহাম্মদ স. এর বিরুদ্ধে গিয়ে নয়।

হাজার বছরের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় হিন্দুদের সাথে মুসলমানের সম্পর্ক কতটা রক্তারক্তি ও সংঘাতময় । কতটা অবহেলা, অত্যাচার, জুলুম, অগ্নিসংযোগ- দাঙ্গা ও গণহত্যা ঘটিয়ে হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে সম্প্রীতির বন্ধন আটুট রেখেছে, সে কথা হাজার বছরের ইতিহাসে ক্ষোদিত রয়েছে ।
আজ থেকে হাজার বছর অথবা শত বছর পূর্বে ভারতের আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যেভাবে অত্যাচার, জুলুম ও হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে উল্লাস করেছে ঠিক আজও ভারত সেই মূর্খতা , নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতার অবস্থানে অনড় রয়েছে । শাস্ত্রের বিধিনিষেধ ,কুসংস্কার, বর্ণবৈষম্য ও আধুনিকতার নামে অবাধে যৌনচর্চা ও লিভ টুগেদার চালু করে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বর্বরতা ও নির্লজ্জতায় নামিয়ে এনেছে । জোর করে ধর্মবিশ্বাস মানুষের মগজ থেকে ঝেড়ে ফেলা যায় না ঠিক । কিন্তু আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের সাথে সাথে ধর্মীয় কুসংস্কার, চিন্তা -চেতনা ও সামাজিক রীতি- নীতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে । কিন্তু তার পরিবর্তে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ ধর্মকে শ্রেণী শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আধুনিক ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র শাসন করছে । শত শত বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানরা একদিকে যেমন সহ্য করেছে রাজা বাদশাদের অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা তেমনি সহ্য করেছে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ।

হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দৃষ্টিতে বাংলা ভাষা ছিল ম্লেচ্ছ জাতের ভাষা । শিক্ষা ধর্ম ও রাজদরবারের একমাত্র ভাষা ছিল সংস্কৃতি । বাংলা ভাষায় কথা বলা মানুষ ছিল অবহেলিত ও সোজা ভাষায় ঘৃণিত। তের শতকে এদেশে মুসলিম অভিযান এবং পরবর্তীতে সুলতানদের সহযোগিতায় পুরাণ ও রামায়ণ বাংলা ভাষায় অনুবাদ হওয়ার পর এই বিদ্বেষ বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় রূপান্তরিত হয়।

ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার “The Influence Urdu Hindi on Bengali Language and Literature” গ্রন্থে দেখিয়েছেন,
“যে মানব অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ ম্লেচ্ছ ভাষায় শোনে,
তার ঠাই হবে রৌরব নরকে ।”[১]


তাহলে চিন্তা করেন ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের অবহেলা ও লাঞ্ছনা কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল । কেবল মাত্র বেঁচে থাকার জন্য নিম্নবিত্তের হিন্দুরা মুসলমান হওয়ার তীব্র আকুতি জানায় । সেদিন ব্রাহ্মণ্যবাদের অমানবিক আচরণ, সামাজিক ভাবে অবহেলা লাঞ্ছনা ও ঘৃণা বিদ্বেষ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কেবল নূন্যতম মানুষের মর্যাদা পাওয়ার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল । কতটা নিষ্ঠুর আচরণে মানুষ নিজের ধর্ম ছেড়ে কেবল বেঁচে থাকার জন্য অন্য ধর্মে পাড়ি জমায় ভাবতে পারেন? আমার দৃষ্টিতে ভারত বর্ষে ইসলামের আগমন ঘটেছিল স্বয়ং ঈশ্বর হয়ে । কারণ সাধারণ মানুষ মুসলিম পোষাক ও পদবী গ্রহণ করে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা টুকু করেছিলেন । মুসলিম শাসনামল সম্পর্কে বিনয় ঘোষ বলেছেন “শাস্ত্রের বিধিনিষেধ কুসংস্কার বর্ণবিদ্বেষ অনাচার আর ব্যভিচারের খানা ডোবা জলা জঙ্গলে তার (হিন্দু সভ্যতার) গতি রুদ্ধ হয়ে গেল ,জাতি ও সভ্যতার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল,এই সময় ইসলাম তার নবীন উদ্যম নবীন আদর্শ ও বিজয়ী ধর্মের প্রেরণা নিয়ে এ দেশে এলো ।”[২]
নিম্নবর্ণের ম্লেচ্ছ জাতির সাধারণ মানুষেরা গৃহ পালিত জন্তু জানোয়ারের মতো জীবন যাপন করতো । ইসলামের আগমনে এই তথাকথিত নিম্মশ্রেণীর মানুষ গুলো ইসলাম গ্রহণ করে এবং সামাজিকভাবে এই প্রথম মানুষের মর্যাদা পেলো।
১৮৫৩ সালের ১০ জুন কার্ল মার্কসের ভারতের ব্রিটিশ শাসন ও ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ফলাফল প্রবন্ধের দিকে চোখ বুলালে ভারতীয় ধর্ম ,সংস্কৃতি ও দর্শন খুঁজে পাওয়া যায় । তিনি ভারতীয় মহাদেশে চলতে থাকা ধর্ম ও সংস্কৃতির নামে বর্বরতার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেন । মার্কসের ভাষায় “প্রকৃতি আর গতানুগতিকতার প্রতি আত্মসমর্পণের হীনম্মন্যতা থেকে সেকালের ভারত ও বাঙলার মানুষ সূর্যকে সূর্যদেব, সাপকে নাগদেব, বানরকে হনুমানদেব ও গরুকে শবলাদেবী রূপে পূজা দিয়ে নিজেদের মনুষ্যত্বকে এবং ন্যূনতম মানবিক চেতনাকে পদদলিত করেছিল”।[৩]
ধর্মীয় কুসংস্কার নিয়ে অন্য যায়গায় বলেছেন,
“এ ধর্ম যুগপৎ ইন্দ্রীয়াতিশয্য ও আত্মনিগ্রহী কৃচ্ছসাধনের ধর্ম লিঙ্গম আর জগন্নাথদের ধর্ম, সন্ন্যাসী ও বায়াদের( দেবদেসীর ) ধর্ম “।[৪] একজন সমাজ বিপ্লবী যার কলমে কুসংস্কার, অপসংস্কৃতি ও ধর্মের নামে অজ্ঞতা ও বর্বরতার চিত্র দেখলে বোঝা যায় সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল ।
মার্কস মানসিক দাসত্ব নিয়ে আরেক যায়গায় বলেছেন “চিরায়ত নিয়মের ক্রীতদাস হয়ে হারিয়ে ফেলেছিল মানব জীবনের সমস্ত কিছু মহিমা ও ঐতিহাসিক কর্মদ্যোতনা “।[৫]

মানুষ তার কর্মপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেছিল । ব্রাহ্মণ্যবাদী পীড়নে তাদের ব্যক্তি সত্ত্বার অপঘাত ঘটেছিল । কেবল মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার শেষ আকুতি তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল ।সেদিন ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচারে সমাজের অবহেলিত মানুষ গুলো বেঁচে থাকার শেষ ভরসা হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল । যে ব্রাহ্মণ্যবাদ নিজের ধর্মের মানুষের সাথে অমানুষিক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ ঘটাতে দ্বিধাবোদ করেনি সেই তারা মুসলমানদের সাথে যে জিঘাংসা ও ষড়যন্ত্রের নগ্ন খেলায় মেতে উঠেছে সেটা কি অযৌক্তিক ! ১৯৪৭ হিন্দু- মুসলমান দ্বিজাতিতত্ত্বে জাতিগত ভাবে পৃথক হয়েছে কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্রের নোংরা খেলা থেমে থাকেনি ।
মহাত্মা ইকবালের চিন্তা ও প্যান ইসলামী ভাবনায় ভারতীয় মুসলমানরা নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।
কিন্তু ক্ষমতা দুর্নীতি আর ভাইয়ে -ভাইয়ে বিদ্বেষে সেই স্বপ্ন মাত্র কয়েক বছরেই ভেঙ্গে পড়ে । পশ্চিম পাকিস্তানীদের ক্ষমতা চর্চা ,দুর্বলদের পীড়ন ও বৈষম্যের কারণেই ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তাদের হাজার বছরের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ ঘটে ।
এই ধারাবাহিকতায় বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা ইসলাম ও ইসলামী সভ্যতা বিরোধী হয়ে ওঠে ।
তারা ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের পুতুলে পরিণত হয়।
বিশ্ব বুদ্ধি ও চিন্তার জগৎ থেকে স্রেফ কোলকাতা কেন্দ্রীক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা শুরু করে । বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের পতনের ফলে বাঙালি আম মুসলমানরা ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস অধ্যয়ন করতে পারেনি । যার দরুণ তারা হিন্দুয়ানী সংস্কৃত পাঠের ন্যায় না বুঝে কুরআন ও ইসলামী মতাদর্শ চর্চা করেছে ।
আর এ জন্যই বাঙালি মুসলমানের মনে ইসলামী চেতনা কার্যকর ও স্থায়ী হয়নি ।

তথ্য নির্দেশ:
১ ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ -The Influence Urdu Hindi on Bengali Language and Literature
২ বিনয় ঘোষ -বাংলার নবজাগৃতি
৩ মার্কস এঙ্গেলস চার খণ্ডের প্রথম খণ্ড (দ্বিতীয় অংশ)
৪ প্রাগুক্ত
৫ প্রাগুক্ত

লেখক পরিচিতি:
আবদুল কাদের জিলানী
সম্পাদক

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.