নাস্তিকরা দাবি করেছে যে কুরআনে একেক আয়াতে মানুষকে একেক উপাদান থেকে সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে । কখনো পানি, কখনো মাটি, কখনো নুতফাহ বা বীর্য থেকে । তাহলে মানুষ আসলে কিসের তৈরি? এখানে কিছু আলোচনা প্রণিধানযোগ্য । এক ব্যক্তি যে সাঁতার জানে না সে সমুদ্রের তলদেশ থেকে মূল্যবান পাথর নিয়ে আসবেন বলে জনসমক্ষে প্রচার করছেন । কিন্তু তার এই জ্ঞান নেই যে, সে যখনই সমুদ্রে নামবে সে মৃত্যুবরণ করবে । তাই তার প্রথম কাজই সাঁতার শেখা এবং সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা । এরপর সমুদ্রে নেমে মূল্যবান পাথর উত্তোলনের চেষ্টা করা । সে পাথর পাবে কিনা সেটা নিশ্চিত না তবে তার কর্মের মাঝেই ফলাফল আশা করা যায় । একজন নাস্তিক(অবিশ্বাসী) ঐ সাঁতার না জানা ব্যক্তির মতো; একজনের যেমন সাঁতারের জ্ঞান নেই তেমনি আরেকজন কুরআনের জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ । তাই সমুদ্রে যতো বড় মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে নামুক না কেন মৃত্যু অনিবার্য । তেমনি নাস্তিকও কুরআনের মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে একসময় অবিশ্বাসী হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

কুরআনের আয়াতের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা পাওয়ার প্রধান কারণ অধিবিদ্যা(metaphysics), রসায়নশাস্ত্র ,জীববিদ্যা এবং জীবতাত্বিক সৃষ্টির বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য করতে অজ্ঞতা বা অক্ষমতা । যেমন সূরা আম্বিয়া আয়াত ৩০ বলা হয়েছে,”We made from water every living thing “(প্রত্যেকটি প্রাণীকে আমি পানি থেকে সৃষ্টি করেছি)আবার সূরা আন নূরের ৪৫ আয়াতে বলা হয়েছে ,”And God has created every animal from water”(এবং আল্লাহ প্রত্যেক বিচরণশীল প্রাণীকে এক ধরনের পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন)সূরা ফুরকানের ৫৪ আয়াতে বলা হয়েছে,”It is he who has created man from water. “(আর তিনিই পানি থেকে একটি মানুষ সৃষ্টি করেছেন)উপরের আয়াত গুলোতে দেখা যাচ্ছে মানবজাতি সহ সকল প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে । এটা একটি জীবতাত্বিক বাস্তবতা । কোন প্রাণীই এই বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারে না । কারণ সকল প্রাণীর শরীর পানির উপর নির্ভরশীল ।

সূরা মারইয়ামের ৬৭ আয়াতে বলা হয়েছে,”But does not man call to mind that we created him before out of nothing. “(মানুষের কি স্মরণ হয় না, আমিই ইতিপূর্বে তাকে সৃষ্টি করেছি অথচ সে তখন কিছুই ছিল না )।আবার সূরা আত তূরের ৩৫ আয়াতে বলা হয়েছে,”Were they created of nothing,Or were they themselves the creators. “(কোন কিছু ছাড়াই কি তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে ? নাকি তারা নিজেরাই সৃষ্টিকর্তা) ?এই দুটি আয়াতে অধিবিদ্যার (metaphysics) পরিভাষায় সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । প্রথম আয়াতে আল্লাহ মানবজাতি ও সকল সৃষ্টিকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করার কথা বলেছেন । আবার দ্বিতীয় আয়াতে অবিশ্বাসীদের মূর্খতাকে তুলে ধরে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন । তোমরা যদি আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করো তাহলে তোমরা কি বিশ্বাস করো যে,শূন্য থেকেই তোমরা অস্তিত্বে এসেছ ?এই দুই আয়াতের মধ্যে কোন স্ববিরোধিতা নেই। রয়েছে সত্তার প্রকৃতি জ্ঞান চিন্তা ও দুরদর্শিতার অভাব ।

মানবজাতির সৃষ্টির উপাদান নিয়ে সূরা আল হিজরের ২৬ আয়াতে বলা হয়েছে,”We created man from sounding clay,from mud moulded into shape.”(আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি শুকনো ঠনঠনে ঝলসানো কাদামাটি থেকে) ।আবার সূরা হুদের ৬১ আয়াতে বলা হয়েছে,”It is he who has hath produced youfrom the earth .”(তিনিই তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন) ।আবার সূরা আর রমের ২০ আয়াতে বলা হয়েছে,”Among His sings is this ,that he created you from dust.”(আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটিও রয়েছে যে ,তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে) ।আমরা জানি মাটিতে কার্বন, হাইড্রোজেন ও নাইট্রোজেন উপাদান রয়েছে । উদ্ভিদ সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় মাটি থেকে যেভাবে এই উপাদান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে । মানুষ উদ্ভিদ বা অন্য প্রাণীর মাংস খেয়ে উপরোক্ত উপাদান শরীরে ধারণ করে । ধুলো বালি পানি এক করে মেশালে কাদামাটি হয় আর এই মাটিই সকল প্রাণীর উৎস ।

আবার সূরা আল আলাকের ১ ও ২ আয়াতে বলা হয়েছে,”Proclaim !(or Read !) in the name of thy Lord and cherisher Who created-১Created man out of a clot of congealed blood.”২(পড়ো তোমার প্রভুর নামে ,যিনি সৃষ্টি করেছেন । সৃষ্টি করেছেন জমাট বাঁধা রক্ত পিণ্ড থেকে )।আবার সূরা আল কিয়ামাহ আয়াত ৩৭ বলা হয়েছে,”Was he not a drop of sperm emitted(in lowly form) .”(সে কি সামান্য পানির মতো এক ফোঁটা বীর্য ছিল না যে (মায়ের জরায়ুতে ) নিক্ষিপ্ত হয়)।এই আয়াত গুলোতে সৃষ্টির জীবতাত্বিক দিক উল্লেখ করা হয়েছে । এখানে এক আয়াতের সঙ্গে অন্য আয়াতের কোন অসঙ্গতি নেই ।

এজন্যই কুরআন মুখস্থ বা তোতা পাখির মতো না পড়ে বুঝে উপলব্ধি করে পড়ার কথা বলা হয়েছে । কুরআনে বার বার সচেতন জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে । আবার কোথাও বলা হয়েছে যারা জানে আর যারা জানে না তারা সমান নয় । কুরআন পড়তে গিয়ে আমি বুঝলাম যে,এটা এমন এক অসাধারণ গ্রন্থ যা আপনি খেলাচ্ছলে পড়তে পারবেন না; এটার এমন এক আকর্ষণীয় ও সম্মোহনী শক্তি রয়েছে যা আপনাকে কাছে টেনে নেবে ।তাই সর্বোচ্চ মনোযোগী হয়ে কুরআনের কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করুন ।এটা শুধু একটা গ্রন্থ নয় বরং যুক্তি পাল্টা- যুক্তি ও বাস্তবতার সমন্বয়ে আপনার অন্তরে বিপ্লব ঘটাবে ।কুরআন পড়তে গিয়ে আপনি এক অসম যুদ্ধে পড়ে যাবেন । এই গ্রন্থের প্রণেতা আপনাকে আপনার চেয়ে বেশি জানেন ।কুরআনের প্রতিটি পাতায় আপনি নিজেকে খুঁজে পাবেন । আপনার মনে হবে এই গ্রন্থ প্রণেতা আমার কষ্ট বোঝেন ,আমার অন্তরের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষোভ জানেন আর তা প্রশমিত করার সব উপায় উপকরণ এই গ্রন্থে তিনি দিয়ে দিয়েছেন ।তাই যেটুকু পড়ব সেটুকু বুঝে উপলব্ধি করে পড়ব।  । অন্ধ অনুকরণ বা ভালোবাসার শেষ পরিণতি বিপজ্জনক গিরিখাত । লক্ষ্য ঠিক করা যেমন যায় না তেমনি সেখানে ফলাফলও মেলে না । আমি অবিশ্বাসীদের বলি তোমাদের অবিশ্বাসও এক ধরনের বিশ্বাস । তবে সে বিশ্বাস অজ্ঞতা বা অক্ষমতার । তাই নাস্তিকের সাথে কোন ফ্যাসাদে না জড়িয়ে যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে কথা বলুন ।

“অন্ধ আয়নার সম্মুখে দাঁড়ালে সে কি নিজেকে দেখতে পায়?অথবা মৃত বা অচেতন শরীর কি তাপ অনুভব করতে পারে?তাহলে কুরআনের আরবি ভাষা উপলব্ধি না করে নিজেকে সে কিভাবে দেখবে ?কিভাবে অন্ধ অনুকরণ থেকে উপলব্ধিতে ফিরে আসবে ?কিভাবে স্রষ্টার সাথে কথা বলবে ?”আমরা নামাজ পড়ি ।কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি নামাজে ব্যবহৃত সূরা ,তাকবীর, তাশাহুদ দুরুদ শরীফ ও দোয়া মাসূরার মর্মবাণী বা এর বাংলা তর্জমা কি ? আপনি যখন মর্মার্থ উপলব্ধি করবেন তখন নামাজে একাগ্রতা আসবে । আপনি স্রষ্টার সাথে বাক্যালাপে মগ্ন হয়ে যাবেন । অন্ধ আয়নায় সামনে নিজেকে দেখতে পায় না । তাই কুরআন উপলব্ধি ছাড়া কিভাবে কুরআনের আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা বুঝতে পারা সম্ভব ! যে হৃদয় উপলব্ধি করতে পারে না সে কিভাবে তার (কুরআন) উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে । অন্ধ অনুকরণ যেমন কাম্য নয় তেমনি না পড়ে না উপলব্ধি করে নিজেকে বিজ্ঞানমনস্ক  (নাস্তিক) দাবি করাও কাম্য নয় । আজই হাতে নিন কুরআন ।তারপর কুরআনের কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করুন । তারপর চিন্তা চলতে থাক হেরা গুহার ধ্যান থেকে মিরাজের মহিমান্বিত রজনী পর্যন্ত ।

আবদুল কাদের জিলানী

সম্পাদক 

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.