ছয়.

আলী নদবী পশ্চিমা চিন্তা ও সভ্যতার মোকাবিলা ও প্রতিরোধ-প্রক্রিয়াকে আপোষ বা আত্মরক্ষার জায়গা থেকে নয়, বরং সমালোচনা ও আক্রমণের জায়গা থেকে দেখেছেন। তিনি পশ্চিমকে সমালোচনা করেছেন নানাভাবে। পশ্চিমা সভ্যতার অপরিণত এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার নানা দিক ও বিষয় চিহ্নিত করে তার উপর আক্রমণাত্মক হয়েছেন এবং সেসবকে উপস্থাপন করেছেন নিজের লেখায়, বক্তৃতায়। তিনি বলতে চেয়েছেন, প্রাচ্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি মানবজাতির জন্য সবচে’ নিরাপদ এবং সর্বাত্মক উপযোগী। পক্ষান্তরে ইউরোপের তথাকথিত আধুনিক চিন্তা ও বস্তুবাদী সভ্যতা মানবতার জন্য অনেকটাই ক্ষতিকর৷ তাঁর বিবেচনায়, ইউরোপ আমাদেরকে যা দিচ্ছে, আমাদের কাছে তাদেরকে দেওয়ার মতো আরও উন্নত কিছু আছে। পক্ষান্তরে আমাদের কাছে যা আছে, তা তাদের কাছে নেই। অতএব, আমরা আমাদের পক্ষে যা যা প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিক, তাই কেবল আমরা পশ্চিম থেকে গ্রহণ করবো। এরচেয়ে বেশি কিছু নেওয়া, প্রয়োজনের চেয়ে তাদেরকে অতিমূল্য দেওয়া, তাদের প্রতি অন্ধের মতো আনুগত্য প্রদর্শন করা, তাদের দাসত্বগ্রহণ করে বসা— আমাদের জন্য যেমন বেমানান, তেমন বিপজ্জনকও বটে। ইউরোপে জ্ঞানার্জনকারী প্রাচ্যদেশীয় মুসলিম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক বক্তব্যে তাদের কর্তব্যনির্দেশ করে তিনি বলেন—তোমরা পশ্চিমে এইজন্য আসোনি যে, তোমরা তাদের সংস্পর্শে থেকে মোমের ন্যায় গলে যাবে, নিজের স্বকীয়তা ও সভ্যতা খুইয়ে বসবে! বরং তোমরা এখানে এজন্য এসেছো যে, তোমরা শিক্ষালাভ করে এক নতুন বিশ্ব রচনা করবে। নদবীর দৃষ্টিতে, ওসব লোকদের কোনো মুল্য নেই, যারা পশ্চিমে এসে পশ্চিমকে নিজের ঘাড়ের ওপর সওয়ার করে বসেছে। তিনি বরং প্রাচ্যের জন্য এমন সাহসী এবং শিক্ষিত প্রতিভাবান মানুষের প্রয়োজন মনে করেন, যাদের ভেতর এমন উদ্দীপ্ত সাহসিকতা ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন চেতনা থাকবে যে, তারা পশ্চিমাদেরকে সহসাই বলতে পারবে, ‘তুমি এখানে এই ভুল করেছ, তোমার এই এই সমস্যা ও সংকট। সরাসরি তারা পশ্চিমা জীবনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারবে, এমনকি প্রয়োজন হলে সংঘাত বাধিয়ে দিতেও বিন্দুমাত্র কসুর করবে না।’[৯]

আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা আর যাই হোক, বিশ্বমানবতার পক্ষে পূর্ণরূপে প্রযোজ্য হতে পারে না। কারণ, এ সভ্যতার ভিত্তিমূলেই মানুষের সামগ্রিক জীবনের স্বাভাবিক দাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি যে জিনিশ, এ সভ্যতায় তা গোড়া থেকেই অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতির শিকার হয়েছে। এ সভ্যতার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি নেই। এমন একটা সভ্যতা কখনও বিশ্বমানবতার জন্য, বিশ্বসভ্যতার গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে স্বীকৃতরূপে সাব্যস্ত হতে পারে না। এটাকে ‘চুড়ান্ত সভ্যতা’ হিসেবে প্রতিপন্ন করার অধিকার থাকে না। বস্তুত, যে সভ্যতা আজ নিজেই নিজের আয়ু-অস্তিত্ব নিয়ে বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি, সেটা কীকরে মানুষকে জীবনের প্রাণশক্তির প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, মানবসভ্যতাকে পরিচালিত করতে পারে—পশ্চিমের তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা সম্পর্কে এমনতরো নানা প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন সভ্যতার বিদগ্ধ তাত্ত্বিক আলী নদবী।

তিনি তাঁর “মাগরিব সে সাফ সাফ বাতেঁ” কিতাবে লিখেন: পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি গড়ে উঠেছে নিছক বৈষয়িক তথা জ্ঞানগত উন্নতি, প্রাযুক্তিক অগ্রগতি তথা ধর্মহীন বস্তুবাদের উপর, যার আখের পতন ছাড়া আর কিছু নয়। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের একচেটিয়া উৎকর্ষ ও একচ্ছত্র আধিপত্যই তার পক্ষে সবচে’ বড় বিপজ্জনক মারণাস্ত্র হয়ে হাজির হবে। কারণ হিসেবে নদবী বলতে চান– ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা এক উদ্দেশ্যহীন পথে পা বাড়িয়েছে; যার কোনো গন্তব্য নেই৷ পশ্চিমারা পার্থিব জগতের চাকচিক্যের মাঝে হারিয়ে গেছে, জগতের সৃষ্টিকর্তাকে তারা খুঁজে পায়নি। তারা নানাপ্রকার জ্ঞান-গবেষণার স্তুপ করে ফেলেছে, কিন্তু, পরস্পরের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক, সমাজবদ্ধতা এবং জীবনের প্রাণৈশ্বর্য কিছুই অর্জন করতে পারে নি আর না সেই জ্ঞানস্তুপকে মানুষের প্রকৃত কল্যাণে নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়েছে। নদবীর স্পষ্ট উচ্চারণ–ধর্মহীন ও নৈতিক অনুশাসনহীন এসব বস্তুতান্ত্রিক বিদ্যাবুদ্ধি পরিনামে তাদের জীবনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তারা জীবনের আনুষাঙ্গিক অসংখ্য অজরুরী গবেষণা ও বিদ্যা-বিশ্লেষণ ইতোমধ্যে করে ফেললেও নিজেদের জীবনের বুনিয়াদি বিষয়াদি ও মৌলনীতি সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং সেসবের প্রতি সাংঘাতিক ধরনের উদাসীন হয়ে আছে।

এ সভ্যতার ধারকবাহকরা দ্বিতীয়ত যে জুলুম ও অনাচার নিজেদের উপর করেছে, তা হচ্ছে, ধর্মের নির্দেশনা ও অনুশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে গিয়ে তারা আত্মিক অনুভূতি, নৈতিক চেতনা এবং প্রবৃত্তিনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। ফলত একদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি এবং প্রকৃতিবিদ্যার অঙ্গনে আকাশছোঁয়া সাফল্য হাতিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে নীতি-নৈতিকতার দিক থেকে মনুষ্যত্বের পর্যায় থেকেও নিম্নস্তরে নেমে গেছে তারা।[১০]

আলী নদবী তাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অনেককানি সিদ্ধান্তের ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছেন যে, এশিয়ার দেশসমূহ; যেগুলো নির্বিচারে পাশ্চাত্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলছে, পাশ্চাত্যের চিন্তা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির হাতে নিজেদেরকে সোপর্দ করে দিয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ-পরিণতি খোদ পশ্চিমাদের চেয়েও ভয়ংকর হবে৷ কারণ, তাদের হাতে ধর্মের সেই নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার লাগাম নেই; যার দ্বারা তারা প্রবৃত্তির উন্মত্ত উত্তেজনাকে বশ করতে পারবে এবং নিজেদের নফসের চাহিদা ও খাহেশাতের মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে৷ এক্ষেত্রে আলী নদবী আল্লামা ইকবালকে উদ্ধৃত করে বলেন, ইকবালের দৃঢ় বিশ্বাস যে, পশ্চিমা সভ্যতা মুসলিম দেশসমূহকে কখনও মুক্তি দিতে সক্ষম নয়। তারা না মুসলমানদের সংকট-সমস্যাকে সমাধান করতে পারবে আর না মুসলমানদের জীবনে নতুন কোনো প্রাণশক্তির সঞ্চার করতে পারবে। [১১]

সাত.

আলী নদবীর পশ্চিমাদের চিন্তা ও আধুনিক সভ্যতার সমালোচনা করা এবং তাকে পরিহারযোগ্য বলার অর্থ এই নয় যে, তিনি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরোধিতা করছেন, বরং তিনি কেবল তাদের চিন্তা ও সভ্যতার অনৈতিক দিক ও মানবতার পক্ষে সংগতিহীন বিষয়ের ক্ষেত্রেই কেবল পশ্চিমাদেরকে সমালোচনা করেছেন এই প্রয়োজনে বিসর্জন দেয়ার প্রস্তাব করেছেন।

আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, প্রগতিশীল চিন্তাচর্চা ও কর্মতৎপরতার ময়দানে যেসব ইতিবাচক আদর্শ এবং উপকারী উদাহরণ পশ্চিমাদের ভাণ্ডারে আছে, তাকে তিনি যথোচিত উপায়ে আমলে নিয়ে কাজে লাগাতে বরং উদ্বুদ্ধ করেছেন। দীনের সর্বাত্মক অনুশাসন আর হৃদয়ে ঈমানি চেতনা লালন করার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপকারী ও প্রয়োজনীয় অংশের অনুশীলনের কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, মুসলিম উম্মাহের পুনরুত্থান এবং আধুনিক সময়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য ঐতিহ্যবাদী চিন্তাচেতনা এবং আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়-প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই।

তাই তিনি একদিকে যেমন বলেছেন—ইসলামি বিশ্বের উত্থানের কোনো পথ নেই, সেই দাওয়াত ও পয়গামকে ধারণ করা ছাড়া, যা তাদের নবি আল আমীন তাদের কাছে সোপর্দ করে গিয়েছেন। আর বস্তুগত কোনো শক্তি দ্বারা দাওয়াতের এ মহান দায়িত্ব পালন করা তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না। সম্ভব হবে শুধু ঈমানের শক্তি দ্বারা।’

তেমনি অপরদিকে বলছেন—ইসলামি বিশ্ব যদি নতুন করে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে ফিরে যেতে চায়, তাহলে তার অবশ্যকর্তব্য হবে, জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, বানিজ্য ও যুদ্ধবিদ্যায় পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং জীবনের যাবতীয় উপকরণ ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য নির্ভরতা পরিহার করা।[১২]

তাঁর এই সমন্বয়ধর্মী অবস্থান গ্রহণের পেছনে আছে ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তি। মুসলমানদের অতীত এমনই সুযোগ্য ও সার্বিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল যে, যার বিনিময়ে মুসলিম উম্মাহ বিশ্বনেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছিল। অতীতের সেই সামর্থ্য ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত বলেই বর্তমানের মুসলমানদের এই অধঃপতন ঘটেছে। মুসলিম জাতিকে অন্যের কাছে ধর্ণা দিতে হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মেনে নিতে হচ্ছে তাদের দাসত্ব। এই দাসত্ব থেকে বাঁচতে হলে মুসলমানদের ফের অর্জন করতে হবে অতীতের মতো যোগ্যতা আর এভাবেই মুসলিমরা পুনরুদ্ধার করতে পারবে নিজেদের হৃতগৌরব এবং পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে।

আট.

পাশ্চাত্য সভ্যতার মোকাবিলায় মুসলিম শাসন ও সভ্যতার পুনরুত্থানের জন্যে আলী নদবী যে বিষয়টির প্রতি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বারোপ করেছেন, তা হল একটি কার্যকরী স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন; যা একাধারে সময়োপযোগী হবে এবং হবে মুসলমানদের চেতনা-বিশ্বাসের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর ‘মা-যা খাসিরাল আলম বিইনহিতাতিল মুসলিমীন’ গ্রন্থে লিখেন: মুসলিম বিশ্বের জন্য আজ সময়ের অন্যতম প্রয়োজন হলো, শিক্ষাব্যবস্থার নতুন বিন্যাস করা, যা তার প্রাণ-প্রেরণা এবং দাওয়াত ও পয়গামের সঙ্গে পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। [১৩]

মুসলিম বিশ্ব যদি নতুন করে এবং অন্য জাতির দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে চায়, সর্বোপরি আবার বিশ্বনেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্ব লাভ করতে চায়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে শুধু স্বকীয়তা ও স্বনির্ভরতাই নয়, বরং তাকে আজ শিক্ষানেতৃত্ব অর্জন করতে হবে। এক্ষেত্রে তার প্রস্তাব হল–“কুরআন সুন্নাহর অপরিবর্তনীয় বিধান এবং কল্যাণপূর্ণ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে। মুসলিম বিশ্বকে অবশ্যই ইসলামের প্রাণ প্রেরণার উপর ভিত্তি করে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে। মোটকথা ইসলামি বিশ্বকে প্রথমে এবং সবকিছুর আগে পাশ্চাত্যের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে, যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে, তা থেকে তাদের যুবকদের উদ্ধার করতে হবে।” [১৪]

এখানে সৈয়দ কুতুব শহীদ রহ. (১৯০৬-১৯৬৬) এর মন্তব্যটির উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না। নদবীকে তিনি জরুরী ও দিকনির্দেশক হিসেবেই দেখেছেন। আলী নদবীর চিন্তাভাবনার প্রসংশা করে তিনি বলেন, পাঠক হয়তো আশা করেন নি যে, একজন আলিম, যিনি ইসলামের রুহানি ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে পূর্ণ আস্থাবান এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে ইসলামের প্রত্যাবর্তনের জোরালো প্রবক্তা, তিনি নেতৃত্বের যোগ্যতা সম্পর্কেও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করবেন এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি, ও সমরশক্তি অর্জনের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করবেন। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা অর্জনেরও আহ্বান জানাবেন এবং আহ্বান জানাবেন পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের। কিন্তু পরম পরিতোষের বিষয় যে, এসকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর চিন্তা থেকে বাদ পড়েনি। [১৫]

বর্তমান জামানায় অপরাপর মুসলিম চিন্তকমনীষীদের চেয়ে বিশেষত আলী নদবীর চিন্তাচর্চার প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবণ করা যায় সাইয়েদ কুতুবের উপরোক্ত মুল্যায়নটিতে। বস্তুত, আলী নদবী কর্তৃক প্রস্তাবিত এমন সমন্বয়বাদী, ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করা ব্যতিরেকে আধুনিক সময়ের বাস্তবতায় মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক উত্তরণ ও সংকট মোকাবিলার অন্য কোনো পথ নেই।

একটি নতুন, স্বতন্ত্র, সমন্বয়ধর্মী কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেছেন আলী নদবী। তাই প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলেও তিনি এর অপূর্ণাঙ্গতা ও অপ্রাসঙ্গিকতার কথা অকপটে ব্যক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছেন মাদারিসে আরাবিয়্যাহর গতানুগতিক ধারার নেসাব ও পাঠ্যক্রম প্রসঙ্গ।

বর্তমান সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষাপটে মাদারিসে আরাবিয়্যার বিভিন্নক্ষেত্রে অচলাবস্থা ও দুর্বলতাসহ উপযুক্ত সংস্কারসাধন এবং কর্তব্যবিষয়ে সচেতন করে তিনি বলেছেন—স্রেফ নেসাবি কিতাব তথা পাঠ্যপুস্তক পড়ে নেয়া, আর মাসআলা বলে দেয়া—মাদারিসে আরাবিয়্যার পক্ষে এতটুকু যথেষ্ট নয়। আমি এখানে তাদের খাটো করছি না। এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আমার পরিপূর্ণ সম্মান রয়েছে। এমনকি আমি তার প্রচারক এবং পৃষ্ঠপোষকও বটে। কিন্তু, এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, বর্তমান সময়ের চৈন্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ফেতনাসমূহকে বোঝা, সেসব সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করা এবং সেসগুলির কার্যকর ও শক্তিশালী ভাষা, হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিমায় মোকাবিলার সাহিত্য গড়ে তোলা এ সময়ের মৌলিক দাবি। আমাদের মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং উস্তাদরা ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রে যেন পারদর্শী হয় এবং ইসলামবিরোধী লেখক-গবেষকদের রচিত বইপত্রের উৎস থেকে উপাদান সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ হয়ে নিজেরা এমন সাহিত্য সৃষ্টি করবে, যা আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হবে।[১৬]

নয়.

ইসলাম বিশ্বজনীন দীন। ইসলামের দাওয়াত ও প্রচার যদি করতে হয়, তবে তাকে হতে হবে বিশ্বজনীন, সর্বমানবিক। ইসলামপন্থী দাঈ ও চিন্তকদের কর্ম-পরিসর, চিন্তা-চেতনা এবং ভাবধারাকে আবর্তিত হতে হবে পুরো জগতকে ঘিরে। অথচ ইসলাম নিয়ে তৎপর বহু মুসলিমের চিন্তাধারা ও কর্মসীমা সংকুচিত হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। তারা পুরো বিশ্বকে না ভেবে স্বদেশ ও নিজস্ব পরিমণ্ডলকে নিজেদের চিন্তার সীমান্ত বানিয়ে নিয়েছে এবং সেই সীমানাকে চূড়ান্ত করে নিজেদের কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে; যা ইসলামের সার্বজনীনতা ও বিশ্ববাদী ধারণার সাথে কোনক্রমেই যায় না।

এক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি চিন্তাবিদগণের মধ্যে আলী নদবী ছিলেন অন্যতম ব্যতিক্রমী একজন। ইসলামের বিশ্বজনীনতাকে আলী নদবী তাঁর চিন্তা ও কর্মে, চেতনা ও তৎপরতায় পূর্ণরূপে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর কাছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ছিল নিজের উঠান। তিনি যেমন এশিয়াতে ইসলামের দাওয়াত ও দীনের খেদমতে নিরন্তর নিয়োজিত ছিলেন, তেমনি ইসলামের বিরুদ্ধে আধুনিক পশ্চিমের উদ্ভাবিত বিভিন্ন চিন্তা ও মতাদর্শের মোক্ষম জবাব দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন সেসবের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিরোধ। নিজের জ্ঞান ও চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে উপস্থাপন করেছেন পশ্চিমের আধুনিক সভ্যতার সংকট এবং ইসলামের সাথে এর সংঘাতকে। হাজির করেছেন ইসলামি সভ্যতার অবশ্যম্ভাবী বিজয় ও উত্থানের সম্ভাবনাকে। তাঁর মতো এমন কর্মবীর মানুষ অত্যন্ত বিরল, অথচ সময়ের প্রেক্ষিতে যাদের উপস্থিতি ছিল সবচে’ বেশি প্রয়োজন। কাজেই সমকালীন ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুসলিম মনীষীদেরকে ইসলামের প্রচার ও ইসলামবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়াতে হলে আলী নদবীর চিন্তা ও কর্মের সত্যিকার মুল্যায়ন এবং তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার উপযুক্ত বাস্তবায়নে অধিকতরো মনোযোগী হতে হবে ।

তথ্যসুত্র :
৯. নদবী, আবুল হাসান আলি রহ., মাগরিব সে সাফ সাফ বাতেঁ, ১৯৮১- ৫৬ ।
১০. প্রাগুক্ত
১১. নদবী, আবুল হাসান আলী, নুকুশে ইকবাল, ১৯৮৫-৭৯।
১২. নদবী, আবুল হাসান আলী রহ. (২০১৩-১৮) মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো? অনু. মেসবাহ, আবু তাহের। দারুল কলম প্রকাশনা, আশরাফাবাদ ঢাকা।
১৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫১৭।
১৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫১৮।
১৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৯।
১৬. নদবী, আবুল হাসান আলী রহ., কারওয়ানে জিন্দেগী, উর্দু সংস্করণ।

লেখক পরিচিতি:
কাজী একরাম।
উচ্চতর দাওয়াহ ও গবেষণা কেন্দ্র।
মা’হাদুল ফিকরি ওয়াদদিরাসাতিল ইসলামিয়্যাহ, ঢাকা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.