লিপস্টিক ফেমিনিজম

লিপস্টিক কেবল ঠোঁট লাল করে তুলতে এবং কৃত্রিমভাবে সৌন্দর্য বাড়ানোর একটি প্রসাধনী মাত্র নয়। এর সাথে বরং জড়িয়ে রয়েছে নারীবাদের পুরো ইতিহাস। ষোড়শ শতাব্দীর রানী এলিজাবেথ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর নারীবাদী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের প্রত্যেকেই এটিকে নারীর মুক্তি, স্বাধিকার, স্বনির্ভরতা, ক্ষমতা, দ্রোহ, আধিপত্য এবং নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম পর্বে, যখন নারী অধিকার প্রশ্নে সংগ্রাম এবং রাজনীতির প্রাধান্য ছিল, লিপস্টিক স্রেফ একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, কিন্তু যখনই নারীবাদ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পরিহার করে স্বতন্ত্রতা, পোশাক, ফ্যাশন, সাজ-সজ্জা এবং যৌন আবেদনকে উইমেন ইমপেয়ারমেন্ট (নারী ক্ষমতায়ন) এর উপায়-উপকরণ ধার্য করল, সে থেকে তার নাম পড়ে গেল লিপস্টিক ফেমিনিজম।

লিপস্টিক ফেমিনিজম কী?

ষাট ও সত্তরের দশকে নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের শীর্ষস্থানীয় কিছু মহিলা নেতা যৌনতা এবং পর্নগ্রাফির বিরুদ্ধে ছিলেন। তারা যৌন হয়রানির চেয়ে সংযম ও শালীনতার উপর জোর দিতেন, এবং নারী স্বাতন্ত্র্যকে আশকারা দেওয়ার পরিবর্তে নারীর সম্মিলিত সামাজিক অধিকারের কথা বলতেন। তারা বিশ্বাস করতেন, নগ্নতা, বেহায়াপনা এবং যৌনতার মুক্ত প্রকাশ পুরুষের আধিপত্য এবং ঐতিহ্যবাদী পাওয়ার স্ট্রাকচারকে আরও শক্তিশালী করে এবং নারীদের বিরুদ্ধে শোষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনাকে বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু ১৯৯০ এর দশকে, তরুণ নারীবাদীরা এই ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করে এবং নারীর স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতায়নের পক্ষে যৌন আকর্ষণকে ব্যবহার করতে শুরু করে।

তরুণ ফেমিনিস্ট নারীদের অবস্থান হচ্ছে, পোশাক, ফ্যাশন এবং যৌন স্বাধীনতার অভিব্যক্তি নারীদের আরও ক্ষমতায়িত, আত্মবিশ্বাসী এবং পদস্থ করে তোলে। তাদের ধারণায় সংক্ষিপ্ত স্কার্ট পরা, নিজের পছন্দের যৌন ক্রিয়াকলাপ এখতিয়ার করা এবং যৌন বিকৃতির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের শক্তি ও ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে নারীবাদী আন্দোলনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অবশ্য কিছু নারীবাদী নারী একটা সীমায় থাকেন। যদিও তারা মনে করেন, মেক-আপ, ড্রেসিং, ফ্যাশন, যৌন আকাঙ্ক্ষার স্বাধীন সম্পাদন এবং মেয়েলি মূল্যবোধের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। তরুণ নারীবাদী নেতৃত্ব বিশ্বাস করে যে, নারীদের নারীত্ব এবং যৌনতা সম্পর্কিত আপত্তির প্রতিক্রিয়া হিসেবে, নারীর স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে আরও মেলে ধরা এবং বিরুদ্ধবাদীদের চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন। স্বামী, ভাই, পিতা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো মুরব্বীর, নারীকে কোনধরণের পোশাক পরতে হবে, কোনধরনের যৌন আচরণ করতে হবে এবং কীভাবে সে নিজের এক্সপ্রেশন করবে–তা বলার অধিকার নেই।

লিপস্টিক ফেমিনিজমের আইডিওলজি, জোরা নেল হুরস্টন (Zora Neale Hurston),এমা গোল্ডম্যান (Emma Goldman) এবং হেলেন গারলে ব্রাউন (Helen Gurley Brow) এর মতো কিছু ফার্স্ট ভিউ ফেমিনিজম পন্ডিতদের মতাদর্শ থেকে ধার করা। এমা গোল্ডম্যান প্রেম এবং যৌন স্বাধীনতা, গর্ভপাত, গর্ভনিরোধক উপকরণ ব্যবহারে স্বাধীনতা এবং সমকামিতার পক্ষে ওকালতি করেন সেই সময়, যখন মানুষ এই ধারণাগুলো সম্পর্কে অবগত ছিল না। তার ধারণা ছিল, বিয়ে-শাদির বন্ধন এবং পুরানো ঐতিহ্য আর রীতিনীতি থেকে মুক্ত হলেই নারীদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত হবে।

হেলেন ব্রাউনের বই, সেক্স এণ্ড দ্য সিঙ্গেল গার্ল, (Sex and Single Girl) ১৯৬২ খৃষ্টাব্দে ২৮ টি দেশে প্রকাশিত হয় এবং জনপ্রিয়তার রেকর্ড ভেঙে দেয়। পরবর্তী সময়ে এটির উপর চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়। বইটি এই ধারণা প্রচার করেছিল যে, তরুণ নারীরা বিয়ে ছাড়াই যৌনতা উপভোগ করতে পারে এবং নারীদেরও পুরুষদের মতো চাকরি এবং ক্যারিয়ার দ্বারা উপকৃত হওয়া উচিত। একটি বিখ্যাত ইংরেজি গান রয়েছে, ‘ভাল মেয়েরা স্বর্গে যায় এবং খারাপ মেয়েরা সর্বত্র যায়।’ ‘Good girls go to Heaven and bad go everywhere.’ হেলেন ব্রাউন তার অফিসে কার্যতভাবে উক্ত বিষয়কে প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন।

যদিও বেটি ফ্রিডেন (Betty Fridan) এবং গ্লোরিয়া স্টেইনেম (Gloria Steinem) এর সে সময় ব্রাউনের ধারণার সাথে বৈপরীত্য ছিল, কিন্তু আজকের নারীবাদীরা ব্রাউনকে তাদের আইডল হিসেবে বিবেচনা করে। লিপস্টিক ফেমিনিজম এবং পর্ন সংস্কৃতি ব্রাউন এর দর্শনের প্রতিফলন ঘটায়– “পুরুষদের সেভাবে ব্যবহার করো, যেভাবে তারা সর্বদা আমাদের ব্যবহার করেছে।” ফ্রিডেন এবং স্টেইনমের অপরাধ শুধু এই ছিল যে, তারা নারীদের এই উৎসাহ দিয়েছিল যে, “সেইসব পুরুষদের কাছে নিজকে সপে দিও না, যারা তোমাদের শোষণ করে।” কিন্তু ব্রাউন নারীদের শিখিয়েছে যে, “যখনই পুরুষরা যৌনক্রিয়ার ফরমায়েশ করে, তৎক্ষণাৎ হ্যাঁ বলো এবং তারপরে তাদের পকেট খালি করে দাও, পুরুষরা সর্বদা পুরুষই এবং তাদের দুর্বলতাগুলোর সুযোগ নেওয়ার সুযোগকে কখনও হাতছাড়া হতে দিবে না।”

ব্রাউন তার ম্যাগাজিনে পুরুষদের নিয়ন্ত্রণের পঞ্চাশটি উপায়ের কথাও উল্লেখ করেছিলেন এবং এগুলোর অনুসরণ করে কীভাবে নিজের ইচ্ছাকে আদায় করে নেওয়া যায়–ব্রাউন এই গাইডেন্সও দিয়েছিল।

ব্রাউন প্লেবয় স্টাইলের ‘কসমোপলিটান’ ম্যাগাজিনের চিপ এডিটর ছিলেন এবং চাকরিজীবী নারী এবং যৌন-স্বাধীনতার পক্ষে ওকালতি করতেন। ব্রাউনের দাবি ছিল, নারী প্রেম, যৌনতা এবং অর্থের কাঙ্গাল হয়। ব্রাউন ফ্যাশন এবং গ্ল্যামারকে এত বেশি প্রমোট করেছিল যে, তার ম্যাগাজিনের নামে ফ্যাশনেবল মেয়েদের ‘কসমো গার্ল’ (Cosmo Girl) নাম দেওয়া হয়! বেচারী হেলেন ব্রাউন তাঁর আজীবন প্রয়াসের ফসল নিজের চোখ দিয়ে দেখে যেতে পারেন নি বটে, কিন্তু তার মৃত্যুর পরে এই প্রয়াস তার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ছড়িয়ে গিয়ে রীতিমতো Sexual revolution তথা ‘যৌন বিপ্লব’ আকারে আত্মপ্রকাশ করে!

লিপস্টিক নারীবাদের মর্ডান সমর্থক:

আজকের পাশ্চাত্যে ফিওনঘুয়ালা সুইইনি (Fionnghuala Sweeney), ক্যাথি ডেভিস (Kathy Davis) এবং তাদের ধারার অগণিত নারীবাদী স্কলার আছেন, যারা ঐতিহ্যবাদী সমাজের স্টেরিওটাইপস থেকে নারীকে স্বাধীন করতে এবং ক্ষমতাশালী করার জন্যে যৌন স্বাধীনতা এবং লিপস্টিক নারীবাদের ওকালতি করেন। তাদের মধ্যে মেরি টিল সোয়ান এর স্টাইল ও ভাবনা সবার থেকে আলাদা।

মেরি টিল সোয়ান একজন আমেরিকান নারীবাদী ঔপন্যাসিক। আত্মহত্যা সম্পর্কে তিনি ভাবেন, “আত্মহত্যা করতে দোষ কী? এটি একটি রিসেট বাটন, আপনি জীবনের রঙ-রস থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়লে যে কোনও সময় এ বাটন চাপ দিয়ে আপনি চিরন্তন শান্তি পেতে পারেন।” তার চিন্তা-ভাবনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, তাঁর দুজন শিষ্য খেলাচ্ছলে এই বাটন টিপে এই নশ্বর জগৎ ছেড়ে চিরকালীন শান্তি পেয়ে গিয়েছিলেন!

একটি ব্লগে, টিল সোয়ান ‘লিপস্টিক ফেমিনিজম’ এর বিশদ বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন– “আমাদের অবশ্যই নিজেদের যৌন আকর্ষণ সম্পর্কে আমাদের অধিকার স্বীকার করতে হবে। নারীদের সচেতন হওয়া উচিত যে, পুরুষরা এই আকর্ষণের জন্য আকৃষ্ট এবং উন্মত্ত, তাই এ ক্ষমতায় আরও নৈপুণ্য নিয়ে এসে তাদেরকে আরও বেশি প্রভাবিত করা চাই। নারীদের যৌন আকর্ষণ বৃদ্ধিকরণের প্রতিটি কলাকব্জা– লিপস্টিক, মেক-আপ, শর্ট স্কার্ট বা হাই হিল জুতা, তথা যা-ই হোক, অবলম্বন করা উচিৎ। পুরুষদের সাথে লড়াই করে যদি ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়া না যায়, তবে তাদের যৌন দাস বানিয়ে ক্ষমতা ঠিকই দখল করা যায়। সেকেন্ড ভিউর নারীবাদী নেতারা খামোখাই প্রতিবাদ করে পুরুষদের তাদের শত্রু করে তোলে। তাদের দ্বারা নারীবাদের সাথে সংযুক্ত কলঙ্কের দাগ এখন একটি সুন্দর উপায়ে ধুয়ে ফেলার সুযোগ রয়েছে। যখন যৌন আকর্ষণের মাধ্যমে পুরুষদের বশীকরণ করা সম্ভব হয়, তবে কেন তাদের সাথে লড়াই করবেন?”

টিল সোয়ান আরও লিখেছেন: যৌন ও প্রেমবৃত্তির প্রকাশ্য অভিব্যক্তির ফলে যে নেতিবাচক খ্যাতি লাভ হয়, একে ‘বাজে’ বা ‘বদনাম’ মনে না করা উচিত। এবং এটি কুখ্যাতি হলেও, কিছু আসে যায় না, এটি আমাদের শক্তি এবং পরিচয়। যদি এই ‘বাজেপনা’ আমাদের স্বাধীকার বৃদ্ধি করে, তবে আমরা এটিকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে রাজি। কোনো উপকার লাভ না করে নিজের উপর এন্টি সেক্সিস্ট লেবেল লাগানোর চেয়ে ‘বাজে ফেমিনিস্ট’(Ugly feminist) লেবেল লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করাই বরং ভাল।’
এই লেবেলের একটি অতিরিক্ত সুবিধা হলো, এটি পুরুষদের কাছে আমাদের গোপন বার্তাটি পৌঁছে দেয় যে, তারা যদি নারী সৌন্দর্যে প্রভাবিত হয়ে এবং আপন আকাঙ্ক্ষার হাতে বশীভূত হয়ে আমাদের দাসত্বে আসতে চায়, তবে আমরা এতে রাজি আছি এবং আমরা কখনই তাদের তা করতে বাধা দেব না!’

নারীবাদী মহিলাদের জন্য টিল সোয়ানের তৃতীয় ফরমান হলো: “আমাদের নিজেদের মেয়েলি এবং যৌন অনুভূতি দমন করার দরকার নেই। আমাদের আবেগকে আমাদের স্বাধীনতা এবং শক্তি বাড়িয়ে তোলে– এমন প্রতিটি বিষয়য়ের সাথে সংযুক্ত করার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিৎ। কীভাবে একজন নারী নাম ও খ্যাতির অধিকারী হয়ে উঠবেন তা নিয়ে আমাদের মধ্যে মোটেই দ্বিধা থাকা উচিৎ নয়। আমাদের অভ্যন্তরে যৌন বৈশিষ্ট্যাবলির উপাদান এবং শক্তি ইতিমধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের কেবলমাত্র এই শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে এটিকে আরও পরিমার্জন ও সুনিপুণ করে ব্যবহার করতে হবে। আমাদের দু’টি পথ রয়েছে, একটি হলো সংযম ও নিয়ন্ত্রণ করে এই শক্তিকে দমন করা। ফার্স্ট ভিউয়ের নারীবাদী নেতারা প্রথম পথ অবলম্বন করে সেই শক্তিকে উপেক্ষা এবং অপচয় করেছে। তারা প্রতিবাদ এবং রাজনীতির ধারা অনুসরণ করেছিল কিন্তু এটি অত্যন্ত অপ্রীতিকর এবং ক্লান্তিকর পথ। দ্বিতীয় উপায় হলো যৌন শক্তি ও আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য যে সমস্ত উপায়-উপকরণ আছে, সে-সবকে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সাথে ব্যবহার করা। এই পথটি সহজ, উপভোগযোগ্য এবং কর্তৃত্বশীল।

হাইহিল জুতোর নারীবাদ:

টিল সোয়ান এবং এই জাতীয় অন্যান্য নারীবাদী বিশেষজ্ঞরা যে নারীবাদের ওকালতি করেন, তা লিপস্টিক নারীবাদের চেয়েও বেশি রেডিক্যাল এবং উগ্রবাদী। এটি সাধারণত স্টিলেটো ফেমিনিজম (Stiletto Feminism) নামে পরিচিত। এই নারীবাদ তরুণীদের বিশ্বাস করায় যে, হাই হিল জুতা তাদের স্বকীয়তা বাড়িয়ে তাদের স্বাধিকার এবং ক্ষমতায়নে সহায়তা করে। যদিও তার ডিজাইনে না হাঁটার সুবিধাকে সামনে রাখা হয়েছে আর না পায়ের স্বাচ্ছন্দ্য এবং সুরক্ষাকে বিবেচনা করা হয়েছে। এর আবিষ্কারের উদ্দেশ্য কেবলই পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এই জুতা পরলে নারীর চাল-চলন খুব অনন্য এবং আকর্ষণীয় দেখায়। পুরুষরা যত বেশি এ জাতীয় নারীদের দিকে তাকাবে, এই জুতার সেল ততই বৃদ্ধি পাবে। আদতে এই জুতা কোনো নারীর ক্ষমতায়নের উপকরণ হতে পারে কি না সন্দেহ, তবে পুঁজিবাদীর জন্য অর্থোপার্জনের হাতিয়ার এটা নিঃসন্দেহ। এর দ্বারা বাহ্যত নারীর শরীরকে তিন ইঞ্চি উঁচুতে দেখা গেলেও বাস্তবে এটি তার নারীপ্রকৃতি এবং পরিচয়কে নিচু করে উপস্থাপন করাই উদ্দেশ্য।

হাই হিল জুতোর নারীবাদের যুক্তিধারা মেক-আপ এবং ফ্যাশনের বাইরে নারী-দেহের সৌন্দর্যকে বিভিন্ন পেশায় ব্যবহার করার পক্ষেও ওকালতি করে। এই পেশাগুলির মধ্যে স্ট্রিপটিজ ডান্সার (striptease dancer), পোল ডান্সার (Pole dancer), ফ্ল্যাশিং (flashhing), লেসবিয়ান প্রদর্শনী (lesbian exhibitionism) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এভাবে, সমকামিতা, পর্নোগ্রাফি, যৌন অবজ্ঞা, (Sexual Objectification) বিডিএমএস, পতিতাবৃত্তি (Prostitution) এবং ধর্ষণের সংস্কৃতিকেও (Raunch Culture) এতে সমর্থন করা হয়।

লিপস্টিক ফেমিনিজম এবং হাই হিল জুতার নারীবাদের একটি বিশেষ দিক হলো, যে শব্দ এবং বাক্যগুচ্ছ একসময় আক্রমণাত্মক, অবমাননাকর, অপমানকর, নিন্দামূলক ও আপত্তিজনক বলে মনে করা হতো, সেগুলোকে অতিমাত্রায় নিজেদের পরিভাষায় এই নারীবাদীরা ব্যবহার করে থাকে, যেমন বেশ্যা (Slut) ইত্যাদি। টরন্টোতে, উদাহরণস্বরূপ, একজন মহিলার (যিনি অভিযোগের মুখোমুখি ছিলেন) একটি বক্তব্যের জবাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন, “সম্মানিত মহিলাদের পতিতাদের মতো পোশাক পরিধান করা উচিত নয়, যাতে তাদের উপর কোনপ্রকার অভিযোগ না বর্তায়।” এর বিরুদ্ধে নারীবাদী আন্দোলন ক্ষুব্ধ হয়ে ৩ এপ্রিল, ২০১১-এ টরন্টোতে একটি পদচারণার আয়োজন করে, যাকে পতিতাদের ওয়াক (Slut walk) নাম দেওয়া হয়। তার সাথে সংহতি জানিয়ে বার্লিন, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, হলিউড এবং বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরগুলোতে একই নামের পদচারণা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ওয়াকটির নামের বিরূদ্ধে নারীবাদী অঙ্গনের ভেতরে এবং বাইরে তীব্র সমালোচনা হয়।

লিপস্টিক ফেমিনিজমের বিপজ্জনক বিষয়টি কেবল এই নয় যে, এটি কসমেটিকস, ফ্যাশন, যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং ক্রিয়াকলাপকে উইমেন ইমপেয়ারমেন্টের জন্যে ব্যবহার করে, বরং আসল বিপদটি এর দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতির মধ্যে নিহিত, যা ঔপনিবেশিকতা এবং ভোগবাদের সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দিতে চায়। এটি কেবল সেক্সি পোশাক এবং মেকাপ করিয়ে নারীর স্বতন্ত্রতা এবং যৌনতাকে উৎসাহিত করে না, বরং এটি সাংস্কৃতিক অভিরুচি, সৌন্দর্য, কমনীয়তা এবং নান্দনিক মূল্যমানকে অতিক্রম করতে চেষ্টা করে। এটি তরুণীদের এই বিশ্বাস করাতে চায় যে, ঐতিহ্যবাদী সংস্কৃতির সৌন্দর্যের স্কেল তোমার স্বতন্ত্রতা প্রকাশের পক্ষে বাধা। কোনো আইন, শাসন এবং সংস্কৃতির অধীনে যৌন ক্রিয়াকলাপকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা নিপীড়ন এবং শোষণ। সুতরাং এই নিপীড়ন কে ভেঙে দেওয়া জরুরী এবং যৌনতাকে প্রকাশ করা হবে ব্যক্তির ইচ্ছা এবং বাসনা অনুযায়ী।

লিপস্টিক ফেমিনিজম এবং পুঁজিবাদের জোটবদ্ধতা:

মর্ডানিজম এবং লিবারেলিজম প্রথম যুগে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের এমনভাবে পুর্নগঠন করেছিল, যা মানুষকে আরও বেশি স্বাধীন ও সক্ষম করে তোলে। যেমন, শিক্ষাব্যবস্থা, আইনী ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি। রাষ্ট্রের এই ব্যবস্থাসমূহের কারণে, মানুষ তার জীবনের প্রয়োজনাদি পর্যাপ্ত পরিমাণে কামাই করতে এবং জীবনযাত্রার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে মান বাড়াতে সক্ষম হয় বটে, কিন্তু ঐতিহ্যবাদী কাঠামো দুর্বল হওয়ার সাথে সাথে ঐতিহ্য, সভ্যতা, মূল্যবোধ– সবকিছুকে দখল করে নেয় আধুনিকতা। এই আধুনিকতা থেকে উদ্ভূত লিঙ্গবাদী আন্দোলন নারীদের সেই সমাজ থেকে আলাদা করে দেয়, যেখানে লৈঙ্গিক ভূমিকাগুলো ঐতিহ্যবাদী সংস্কৃতি এবং রীতি-নীতি দ্বারা নির্ধারিত হতো। সে জায়গায় এখন নারীদের এই চেতনা দেওয়া হয় যে, তাদের স্বাতন্ত্র্য এবং ব্যক্তিক মনোভাবই সিদ্ধান্ত দিবে যে, তারা কতটা সফল। অন্য কথায়, নারীদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সিভিল সোসাইটির বিভিন্ন ক্ষেত্রে লিঙ্গ পরিচয়ের প্রস্তাব দেয়া হয় এবং যৌন ক্ষমতা দিয়ে চিরায়ত সমাজ এবং সংস্কৃতির সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে বলা হয় তাদের।

লিপস্টিক ফেমিনিজম স্পষ্টতই নব্য লিবারাল ভোগবাদিতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে গ্ল্যামারাস স্বতন্ত্রতার অর্জনকে নারীর ক্ষমতায়ন এবং সাফল্যের চাবিকাঠি হিসাবে দেখা হয়। এখন সমস্ত ফোকাস ভোক্তা সংস্কৃতি দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং সমর্থিত পৃথক প্রকল্পগুলির প্রতি নিবদ্ধ। নারী মুক্তি এখন একটি স্বতন্ত্র প্রকল্প; যার উপলব্ধি নারীদেরকে তাদের জীবনে দেওয়া হয় এবং এই ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে নারীবাদী রাজনীতির পুরানো এজেন্ডা অকেজো হয়ে পড়েছে। অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্রোবি এই পরিস্থিতির মুল্যায়ন তার ‘Aftermath of Feminism’ বইয়ে খুব চমৎকারভাবে করেছেন। তার মতে, নারীবাদ এখন নারীদের সামাজিক অধিকারের আন্দোলন হিসেবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। পপুলার কালচার সীমাহীন সম্ভাবনা এবং স্বাধীনতার একটি সুন্দর মরীচিকা এবং মায়া বিলায়, কিন্তু বাস্তবে এটি নারীদের উপর পুরানো বিধিনিষেধকে নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করে এবং তাদেরকে পূর্বের চেয়ে আরও বশীভূত করে তোলে। তরুণবয়সী নারীরা গ্ল্যামার দ্বারা এতটাই মুগ্ধ হয়েছে যে তারা পপুলার কালচারের প্রভাবগুলি বুঝতে সক্ষম হয় না এবং তাদের চারপাশে বেষ্টনকারী হাতকড়ার উপলব্ধি থেকে তারা নিদারুণ অন্ধ।

লিপস্টিক ফেমিনিজম, সমস্ত বড় শিল্পের সাথে একত্রিত হয়ে, কেবলমাত্র মূলধন বৃদ্ধির জন্য কাজ করে এবং প্রকৃত স্রষ্টা এবং শ্রমিকদের পেটে লাথি মারছে। সমস্ত পুঁজিপতি এবং বড় ব্যবসায়ী মহাজনরা পুরো বছরজুড়ে লোকদের লুট করে এবং যখনই কোনো বিশেষ দিন আসার সাথে সাথে এরা উপযুক্ত স্লোগান এবং চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রয়ের ঘোষণা নিয়ে হাজির হয়। তারা কেন কেবল নারী মার্চ, নারী দিবস এবং এই জাতীয় অন্যান্য অনুষ্ঠানে ব্র্যান্ডের সাথে নারীবাদী স্লোগানগুলিকে উপস্থাপনের ধারণাটি মনে রাখেন? এই স্লোগান, টোকেনিজম, হ্যাশট্যাগ, পুরস্কার, উপহার, সেলিব্রশন কেন কেবল সেই দিনগুলিতে সক্রিয়? এর কারণ, যুবতী নারীদের নির্দিষ্ট দিন এবং ইভেন্টগুলোকে স্মরণ করিয়ে, বিনোদন সরবরাহ করে এবং বিচিত্র স্লোগান পাড়িয়ে তাদের জমাকৃত পণ্যের সংগ্রহ সাপ্লাই করা। আজকের নারীবাদ নিজেকে এই লোকদের থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষনা করে না, যা পরিষ্কারভাবে বোঝায় যে, এই সব মুনাফা ভাগ করে নেওয়ার সম্মিলিত ষড়যন্ত্র।

এই প্রক্রিয়াটিতে কেবল শিল্প ইন্ডাস্ট্রি নয়, প্রকাশনা সংস্থাগুলিও সমানভাবে জড়িত। সেখানে বড় বড় দার্শনিক ও লেখকদের রচনা তেমন জনপ্রিয়তা পায় না৷ যতটা বিখ্যাত ফিল্ম ও গানের ব্যক্তিত্বদের কয়েকটি খুচরো বাক্য, গ্ল্যামারাস ছবি এবং বিবৃতি সংবলিত লেখাগুলো পেয়ে থাকে। এই জনপ্রিয়তাকে বিজ্ঞাপন হিসাবে ব্যবহার করে ব্রান্ডগুলির মার্কেটিং করা হয়। অর্থাৎ, এখন জ্ঞান ও তথ্যের প্রচার মানুষের গবেষণা এবং জ্ঞানগত কৌতূহলের তৃষ্ণা নিবারণের পরিবর্তে পণ্য বিক্রয় করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। মজার বিষয় হলো, বিপণন প্রচারণায় নারীবাদের যে ধারণাগুলোকে বিজ্ঞাপনের ভাষায় পরিবেশন করা হয়, নারীদের কল্যাণ, সাফল্য এবং অধিকারের সাথে এর কোনও সম্পর্ক নেই, হ্যাঁ, লিপস্টিক নারীবাদের প্রতিনিধিত্ব করে অবশ্যই।

নারীবাদ পণ্য বিক্রয়ে, গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে, মিথ্যা প্রণোদনা দেওয়ার জন্যে একটি বাজওয়ার্ড (buzzword) হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যথাযথ মূল্যবোধ ও নীতিবোধ ছাড়াই বিজ্ঞাপন প্রচার বা ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বিচিত্র শব্দ এবং পরিভাষার ব্যবহারই পুঁজিবাদ। এটি ভোক্তাদের উপর আক্রমণ এবং একধরণের গণহত্যা, যাতে লোকেরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও, চিন্তা-ভাবনা এবং বিচার-বিবেচনা না করে পণ্য খরিদ করার অপরাধ করে, এবং যখন তারা বুঝতে পারে, তখন তারা আফসোস করে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো পেঙ্গুইন (Penguine), এটি একটি বিশ্বব্যাপী বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা, যা লন্ডনে নারীদের ফ্যাশনেবল পোশাক বিক্রি করার জন্য একটি দোকানে অংশীদার হয় এবং গার্ল আপ (Girl Up) নামে একটি বইয়ের প্রচারণা চালায়।

কৌশলটি ছিল, ফ্যাশনেবল পোশাক কেনার জন্য দোকানে আসা প্রতিটি তরুণীকে এই বইয়ের অফার দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে সেলিব্রিটিদের সুন্দর ছবিসহ লিপস্টিক ফেমিনিজম সম্পর্কিত নিবন্ধাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তরুণীরা যখনই এই বইয়ের পাতা উল্টাবে, সাথে সাথে তারা এই বিষয়টি দেখে অবাক হয়ে যাবে যে, এখানকার সমস্ত নিবন্ধ তাদের প্রিয় তারকারা লিখেছেন এবং তারা তৎক্ষণাৎ বইটি কিনে ফেলবে! দোকানের মালিক তরুণীদের এই ধারণাও দিয়েছিলেন যে, তার পোশাকের ডিজাইন এবং ব্র্যান্ডগুলো নারীবাদ দ্বারা অনুমোদিত, তাই এসবের বিক্রয় আকাশ ছোঁয়া। আপনি যদি নিয়মিতভাবে পাশ্চাত্যে প্রকাশিত বড় সংবাদপত্র বা ম্যাগাজিনগুলো পড়েন, তবে সেসবে পুঁজিবাদ এবং নারীবাদের জোটের অগণিত উদাহরণ আপনার চোখে পড়বে।

লিপস্টিক ফেমিনিজমের স্ববিরোধী বক্তব্য:

এমন একটি সময় ছিল যখন দৃঢ়তা, ইচ্ছাশক্তি, সাহসিকতা, প্রচেষ্টা, নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব, জ্ঞান, চেতনা, ধার্মিকতা, বন্দেগি, মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, সৎ প্রেরণা এবং লজ্জা, বিনয় ইত্যাদি গুণাবলিকে পৌরুষত্বের প্রতীক সাব্যস্ত করা হতো এবং অপরদিকে নারীত্ব ছিল মাতৃত্ব, ভদ্রতা, নম্রতা, পবিত্রতা, সতীত্ব, সম্মান, মর্যাদাবোধ, গুণী চরিত্র, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা, সতীত্ব রক্ষা, দানশীলতা এবং শীতল চোখের বৈশিষ্ট্যের আধার। কিন্তু, আজকের লিপস্টিক নারীবাদ নারীর দেহ এবং যৌনতা থেকে উদ্ভূত আকর্ষণ এবং যৌনপনাকে ক্ষমতায়ন এবং শক্তি হিসাবে বিবেচনা করে। লিপস্টিক ফেমিনিজমের পণ্ডিতদের বক্তব্য হচ্ছে, নারীদের এই অধিকার রয়েছে যে, তারা তাদের চাহিদানুসারে যৌনতৃপ্তি সম্ভোগের জন্য যেধরনের পছন্দ এবং আচরণ অবলম্বন করতে চায়, করতে পারবে। এবং আকর্ষণীয় দেখানোর জন্য যত ইচ্ছা, ছোট পোশাক পরতে পারবে। তাতে তাদের যৌন অঙ্গগুলোর ঝলক এবং আকর্ষণ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয় হোক!

বস্তুত, এটি কেবল ফ্যাশন, পছন্দ এবং বাসনাকে অবলম্বন করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে নি। বরং অবমাননাকর শব্দ এবং বাক্য, যা গালি এবং অভদ্রতার প্রতীক ছিল এবং যেগুলোকে পরস্পরে ঝগড়া করার সময়ও প্রতিপক্ষের জন্যে ব্যবহার করতে দ্বিধা জাগতো, এখন সেগুলোকে নিজের জন্য ব্যবহার করে হাতিয়ার এবং শক্তির উত্স হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এখন যুবতী নারীকে শিখানো হচ্ছে যে, ভাল মেয়ে (good girl), শালীন নারী (cultured women), পবিত্র ও ধার্মিক মা, (the abnegated mother) সচ্চরিত্র বোন (virtuous sister) ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ পুরুষদের পক্ষ থেকে আরোপিত এবং এর দ্বারা নারীদেরকে পুরুষদের বশীভূত করে তোলা হয়। সুতরাং, যদি কোনো নারীর ক্ষমতাশালী হতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই এই কথাগুলির ব্যবহার বর্জন করতে হবে। কিন্তু কেউ যদি চিন্তা করে দেখে তবে এতে চরম স্ববিরোধী বক্তব্যের প্রমাণ পাবে। একদিকে যেমন খারাপ নাম এবং উপাধি দিয়ে তারা নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয়, অন্যদিকে পুরুষদের উপর এই অভিযোগ ওঠায় যে, পুরুষরা নারীদের সম্মান করে না এবং যৌন কুসংস্কারের কারণে তাদেরকে খারাপ নামে ডাকা হয়।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.