সীরাত রচনায় প্রাচ্যবাদী প্রয়াস

ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসে রাসূল সা. এর বিস্তারিত জীবনী ছাড়াও, স্বতন্ত্রভাবে সীরাতের উপর অসংখ্য অগণিত গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং নিরন্তর হয়ে চলছে। এক্ষেত্রে যেমন মুসলিম লেখকগণ আছেন, তেমনি আছেন অমুসলিম লেখকরাও। বিষয়টি নিয়ে এযাবৎ যত রচনা প্রকাশিত হয়েছে, তার সংখ্যা-সীমার পূর্ণাঙ্গ হদিস নেয়া মুশকিল।

নবিজির জীবন নিয়ে কিছু লেখা প্রতিটি নবিপ্রেমী মুসলিমের এক অন্তর্গত চিরন্তন বাসনা হয়ে থাকে। হৃদয়নিংড়ানো ভালোবাসার মাধুরি মিশিয়ে কিছু পুষ্পিত শব্দমালা নবিজির করকমলে নিবেদন করবে–মুসলিমমাত্রই একে নিজের ইহলৌকিক সৌভাগ্য ও পারলৌকিক সুপারিশ লাভের অসীলা হিসেবে ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি নিজেদের ইতিহাসে এমন সুন্দর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উদাহরণ পেশ করতে সক্ষম হয়নি। এটি মুসলিম জাতির স্বকীয় ঐতিহ্য এবং স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য; যা তার জন্য পরম গর্ব ও গৌরবের বিষয়। শিবলি নুমানি লিখেছেন: “কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের এই গর্বের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না যে, তারা স্বীয় পয়গম্বরের জীবনী ও ঘটনার এক একটি অক্ষর এমন ভক্তি ও গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করে রেখেছে যে, কোনো মনীষীর জীবনী আজ পর্যন্ত এমন পূর্ণাঙ্গ এবং সতর্কতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ হয় নি, আর না ভবিষ্যতে সম্ভব হবে। এর চেয়ে অধিক আর কি আশ্চর্যের বিষয় হতে পারে যে, রাসুলুল্লাহ এর কর্ম ও বাণীর পর্যালোচনা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে তাঁকে দর্শনকারী এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারীর মধ্য হতে প্রায় তেরো হাজার লোকের নাম ও জীবনী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।” এই আশ্চর্যের বিস্মিত অভিব্যক্তি শুনতে পাই ইসলামের কঠোর সমালোচক বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ স্প্রেংগারের ভাষায়–”এমন কোন সম্প্রদায় হয় নাই, এখনো নাই যারা তাদের (মুসলিমদের) মতো বারোটি শতাব্দী যাবৎ প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনী লিপিবদ্ধ করেছে। যদি মুসলিমগণের রচিত জীবনচরিতমূলক গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করা হয়, আমরা খুব সম্ভব অর্ধ মিলিয়ন কৃতি পুরুষের জীবনবৃত্তান্ত লাভ করব।”

মুসলিমগণ এই অসম্ভব কষ্টসাধ্য অনুসন্ধানী পরিশ্রম কেন করেছেন। করেছেন, যেন সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনার সমাবেশে সুরক্ষিত থাকে সরওয়ারে কায়েনাতের সীরাত ও জীবনচরিত। হাদীস ও সীরাত এর তথ্য-উপাত্ত সংকলন এবং অনুপুঙ্খ পর্যালোচনার ভেতর দিয়ে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নিরূপণের প্রয়োজনে যে অবিশ্বাস্য কর্মপদ্ধতির দৃষ্টান্ত মুসলিম শাস্ত্রবিশারদ এবং ঐতিহাসিকরা হাজির করেছেন, দুনিয়ার ইতিহাসে তা জীবনচরিত এবং ইতিহাসশাস্ত্রের জন্য অভূতপূর্ব কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

মুসলিম উলামা ও পণ্ডিতবর্গের মধ্যে যারা সীরাত রচনার কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে ইবনে হিশাম, ইবনে ইসহাক, ইবনে সা’আদ, ইবনে হাযম, সুহায়লি, ইবনুল কায়্যিম, ইবনে কাসীর, আল কাসতালানি, আয যুরকানি প্রমূখ সমধিক প্রশিদ্ধ। আধুনিক সময়ের সীরাত রচয়িতার মধ্যে আব্বাস মাহমুদ আল আক্কাদ, ইউসুফ আস সালিহি আশশামি, আবূ যুহরা, মুহাম্মদ হুসায়ন হায়কাল, মুহাম্মদ জালালুদ্দিন মাসরুর, কাজী সুলায়মান মানসূরপুরি, আব্দুর রউফ দানাপুরি, আল্লামা শিবলি নুমানি, সায়্যিদ সুলায়মান নদভি, পীর করম শাহ, ইদরীস কান্দলভি, ড. হামীদুল্লাহ, নাঈম সিদ্দিকি, মাওলানা আকরাম খাঁ, অধ্যাপক আব্দুল খালেক, কবি গোলাম মোস্তফা, ড. আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদি, মানাযিরে আহসান গিলানি, সায়্যিদ আবুল আলা মওদুদি, সায়্যিদ আবুল হাসান আলি নদভি প্রমূখ বিখ্যাত।

মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমরাও সীরাত রচনার মহিমান্বিত সিলসিলায় নিজেদের শরীক করেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, ব্রাহ্ম্য সমাজের পণ্ডিতবর্গরা রাসূলের জীবনচরিত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাদি প্রণয়ন করেছেন। এক্ষেত্রে ইউরোপের খৃষ্টান-ইহুদি পণ্ডিতদের স্থান সর্বশীর্ষে। প্রাচ্যবিদ হিসেবে পরিচিত এই শ্রেণীটি মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে প্রায় হাজার বছরের সময়কাল ধরে এবং এখনও সীরাত এবং ইসলামের ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং করে চলছেন।

আজ থেকে এক শতাব্দিরও অধিককাল পূর্বে দামেশকের ‘আল মুকতাবিস’ নামক পত্রিকায় একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, এ পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় হযরত মুহাম্মদ সা. এর সম্পর্কে ১৩’শ পুস্তক লিখিত হয়েছে। তারপর থেকে এক শতাব্দীর ব্যবধানে এ যাবৎ যতসংখ্যক গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সেগুলি শামিল করা হলে এ সংখ্যা কতদূর গিয়ে দাঁড়াবে, তা ধারণা করাও দুঃসাধ্য।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি অধ্যাপক বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ D. S. Margoliouth লিখিত এবং ১৯০৫ সালে ‘হিরোজ অব দি নেশান্স’ সিরিজ কর্তৃক মুদ্রিত ইংরেজি গ্রন্থ ‘মুহাম্মদ’- এর ভূমিকায় আরবারি লিখেছেন, মুহাম্মদের জীবনীকারদের সিলসিলা শেষ হওয়া অসম্ভব, কিন্তু তাদের মধ্যে স্থান করা একটি বিরাট সম্মান!

খৃস্টান মিশনারিদের সেবার উদ্দেশ্যে অথবা তত্ত্বগত রুচি বা বিশ্ব ইতিহাসের জ্ঞানের পূর্ণতার নামে পাশ্চাত্যের অমুসলিম পণ্ডিত ও প্রাচ্যবিদরা রাসূল সা. এর সীরাত ও জীবনচরিত প্রণয়নের এ ধারা অব্যাহত ধারায় জারি রেখেছে। এক্ষেত্রে তাদের বিশেষ কৃতিত্ব হল, বিপুল অনুসন্ধান চালিয়ে তারা সীরাতের মৌলিক এবং প্রাচীন উত্সসমূহ সন্ধান করেছে এবং দুনিয়ার আনাচকানাচ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লিখিত পুরনো পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে, সেসবের সম্পাদনা করেছে এবং বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে। এ সম্পর্কে তারা এত বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডার সরবরাহ করেছে যে, নবি জীবনের উপর যে কেউ আজ লেখতে চায়, তবে তাদের রচনা থেকে নানাভাবে উপকৃত না হয়ে পারা যায় না।

সীরাতলেখক প্রাচ্যবিদদের এই তালিকা বেশ দীর্ঘ। মিলস, এলায়স স্প্রেংগার, ইগনাথ গোল্ডযিহার, আর্থার এন উলাস্টন, এডওয়ার্ড এ ফ্রীম্যান, ভেন বারশেম, আলফ্রেড উইলিয়াম, নওলডেক, উইলিয়াম মন্টোগোমারি ওয়াট, কার্ল ব্রোকেলম্যান, জুলিয়াস ওয়েল হাডসেম, এম সাভারি, ডি. এস. মার্গোলিয়থ, উইলিয়াম ম্যুর, ফাদার জেরুম ডান্ডিনি, রজার অব উইন্ডোবার, বসওয়ার্থ স্মিথ, হেনরি স্টোভ, জি ইউ লেইন্টনার, হেনরি ল্যামেনস প্রমুখ উল্লেখযোগ্য৷

কয়েকটি গ্রন্থের লেখক এবং তাদের গ্রন্থনাম প্রকাশকালসহ এখানে উল্লেখ করছি। স্প্রেংগার লিখেছেন Life of Mohamed, যা ১৮৫১ সালে প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। ম্যুর লিখেছেন Life of mahomet, যা ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হয় লন্ডন থেকে। মিলসের History of Mohamedanism লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮১৭ সালে। ডব্লিউ সি. টেইলর History of mohamedanism লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৩৪ সালে। বেডওয়েলের Muhamedis Imposture লন্ডন থেকে ছাপা হয় ১৬১৫ সালে। ১৬৪২ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর Mohamet Unmasked। জে. হিগংসের An apology for the life of Mohamet প্রকাশিত হয় ১৮২৯ সালে। ওয়াশিংটন ইরভিং এর Life of Mohamet লন্ডন থেকে ছাপা হয় ১৮৫০ সালে। বেভারেন্ড জি. একহোসট এর Impostore instanced in the life of Mohamet লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সালে। বসওয়ার্থ স্মিথের Mohamed and mohamedanism লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৭৪ সালে। টিপি হগস-এর Note of Mohamedanism লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালে। ডব্লিউ এইচ স্টবার্টের Islam and Its Founder লন্ডন থেকে ছাপা হয় ১৮৭৮ সালে। ডি এস মারগোলিয়থের এর Mohamad লন্ডন থেকে ছাপা হয় ১৯০৬ সালে। মন্টোগোমারি ওয়াটের Mohamad at Mecca ও Mohamad at Medina। কার্ল ব্রোকেলম্যান লিখেছেন History of Islamic people’s। বলাবাহুল্য, এ ফিরিস্তি এত দীর্ঘ যে, সহজে শেষ হবার নয়।

প্রাচ্যবিদদের এধরনের শ্রমসাধ্য প্রয়াস এবং পাণ্ডিত্যসূলভ গবেষণাকর্ম সাধারনত প্রশংসিত হলেও, ইসলামি অঙ্গনে এমন একটি ধারণা রয়েছে যে, নবি সা. এর সীরাত ও ইসলাম উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের জ্ঞানগত সততা, নিরপেক্ষতা এবং উদারচেতনা ধরে রাখতে সক্ষম হয় নি। এ কাজে বরং রাজনীতি এবং ধর্মীয় কুসংস্কার কার্যকর ছিল তাদের মন ও মননে, যা নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাদের রচিত গ্রন্থ ও গবেষণায়। প্রকাশটা কখনও হয়েছে নগ্নভাবে; যা একান্তই উল্লেখের অযোগ্য এবং যা স্পষ্ট ভ্রান্ত। কখনও বা হয়েছে প্রচ্ছন্নরূপে; যা এতটাই সুক্ষ্ম ও চাতুর্যপূর্ণ যে, সাধারণ চোখে ধরা দেয় না, কিন্তু মনের যা মতলব, তা ঠিকই উগরে দেয়া হয়।

যেমন, আর্থার এন উলাস্টন Half hours with Muhammad গ্রন্থে লিখেন –আরবের পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদেশে হাজার হাজার মানুষ বশ্যতা স্বীকার করতো। তার আনুগত্য প্রদর্শনে তারা সদাপ্রস্তুত থাকতো। কোটি কোটি অনুসারীর অন্তরে তার স্মরণ সদাজাগ্রত।

এডওয়ার্ড এ ফ্রীম্যান তার The History and Conquest of the Saracens গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৩১, ১৮৭৭) লিখেছেন, হযরত মুহাম্মদ সা. হলেন সংবিধান রচনাকারী ‘আরবীয়’ এক মহান ব্যক্তি। তৎকালে বিশ্বব্যাপী বিপ্লব ঘটান এবং পরবর্তী সমস্ত যুগে প্রভাব বিস্তার করা তাঁর ভাগ্যে লিখে দেওয়া হয়েছিল।

উদাহরণ দুটোয় খেয়াল করুন, আসলে কেবল এরাই নয়, অধিকাংশ প্রাচ্যবিদ বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ সা. কে ‘আরবের পয়গম্বর’ বা ‘আরবীয় নবি’ ইত্যাদি অভিধা দিয়ে নিজেদের রচনায় অভিহিত করেছেন। আপাত দৃষ্টিতে এতে তেমন কোনো বিপত্তিবোধ হয় না। হয়তো কারও মনে হতে পারে, ভৌগোলিক বিচারে এমনটা বলা হয়েছে। বাস্তবতা আসলে ততটুকু নয়। এটা বরং তাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের গোপন দুরভিসন্ধিত্বের বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্য দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে, মুহাম্মদ নবী, তা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু তা একান্তই আরবের জন্য। আরববাসী ছাড়া বাকি দুনিয়ার জন্য তাঁর রিসালাত ও নবুওত বিস্তৃত নয়, স্বীকৃত নয়৷

সুবিদিত যে, জন্মস্থান হিসেবে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো এলাকার সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু তাই বলে নিছক ভৌগোলিক বিচারের অজুহাতে মুহাম্মদ সা. ‘আরবীয় নবি’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করার কোন অবকাশ নেই।

কারণ, কুরআন মুহাম্মদ সা. কে শুধু রাসূল বলে ক্ষান্ত দেয়নি, বরং ‘রাহমাতুল লিল আলামীন’ উপাধি প্রদান করে সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য প্রেরিত হিসেবে ঘোষণা করেছে। কুরআন বলেছে, তাঁর রিসালাত ও নবুওত বিবব্যাপী এবং চিরস্থায়ী। তাঁর রিসালাতের উদাহরণ ঠিক পুবাকাশে উদয় হওয়া আলো ঝলমল সূর্যের ন্যায়, যা তার উদয়স্থলে স্থির এবং থিতু হয়ে থাকে না, বরং সর্বপ্লাবী আলো নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পৃথিবীর বুকে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আধুনিক সময়ের শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও অনেকটা অসতেচনভাবে ‘আরবীয় নবি’ কিংবা ‘মুহাম্মদে আরাবি’ ইত্যাদি বলতে-লিখতে দেখা যায়। বলতে পারি, এটা আসলে প্রাচ্যবিদদেরই প্রভাব।

আরেকটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন, জন. জে. পল স্টাডি ইন মোহাম্মেডানিজম এ লিখেন, ‘দুনিয়ার আজব হল, এক দরিদ্র ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। তিনি অখ্যাত এবং দরিদ্র ছিলেন। তিনি তরতর করে সফলতার সিঁড়ি বেয়ে সবার শীর্ষে পৌঁছে যান। তিনি হন পয়গম্বর, ধর্মীয় নেতা এবং বাদশাহ। তিনি এমন এক ধর্মের বুনিয়াদ রাখেন, যা আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে এবং চিরদিন থাকবে।’

এখানে জন. জে. পল মুহাম্মদ সা. কে ইসলাম ধর্মের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন। তার এ আখ্যা আদৌ যথাবৎ হয়নি। অন্যান্য নবি-রাসূলের ন্যায় মুহাম্মদ সা.-ও ছিলেন একজন রাসূল। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি লাভ করে গোমরাহির অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতাকে হেদায়েতের আলোক বিতরণ করেন তিনি। সে হিসেবে তিনি যেমন একজন আল্লাহর ওহিপ্রাপ্ত রাসূল, তেমনি আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে খোদ ইসলামের অনুসারীও বটে। নিজ থেকে নতুন কোনো ধর্ম, মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা বা পত্তনকারী তিনি নন।

নবি সা. হচ্ছেন ইসলামের মৌলসত্তা; যার মাধ্যম হয়ে কুরআন এবং সুন্নাহর অবয়বে ইসলাম আমাদের কাছে এসেছে। প্রাচ্যবিদরা একারণে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ নবি সা. পবিত্র সত্তার উপর করার চেষ্টা করেছে; যাতে করে দীনের আসল বুনিয়াদের উপর সংশয় ও সন্দেহের আবরণ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। যেহেতু মানুষ যেকোনো ধর্মগুরুর ব্যক্তিত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর অনুসরণ করে থাকে, তাই প্রাচ্যবিদরা নবি সা. কে নিজেদের যাবতীয় ঘৃণ্য আক্রমণের শিকার বানিয়েছে পুরোদমে। এমনকি তাঁর নামটি পর্যন্ত তাদের কদর্যতা থেকে রেহাই পায়নি!

কখনও কখনও নিজেদের কাজের স্ট্র্যাটেজি হিসেবে রাসুল সা. এর চারিত্রিক সৌন্দর্য ও নৈতিক বৈশিষ্ট্যকে অত্যন্ত চমৎকার ভাষায়, উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় উপস্থাপন করে থাকে এই প্রাচ্যবিদরা। কিন্তু যখন ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ আসে, তখন তা উপস্থাপিত হয় ভিন্নরূপে। ভুলভাল তথ্যের আলোকে জ্ঞানের ছদ্মাবরণে নবিজীবনের ঘটনাবলি সম্পর্কে এমন এক ভাষ্য তৈরি করে, ইসলামের প্রকৃত জ্ঞানের বিচারে যারা রিক্তহস্ত, তা তাদেরকে একধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করে। বলাবাহুল্য, প্রাচ্যবিদদের জ্ঞানগরিমার প্রতি পূর্বমুগ্ধতার কারণে অনেকসময় পাঠকের পক্ষে এজাতীয় ধূর্ত প্রাচ্যবিদদের বয়ানের চাতুর্যতাকে ধরতে পারাটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। পরিণামে, যা হবার তাই হয়।

ড. মোহর আলি “Sirat Al-Nabi and Orientalist” গ্রন্থে এ শ্রেণীর প্রতিনিধি স্থানীয় তিনজন প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম ম্যূর, ডি. এস. মারগোলিয়থ ও ডব্লিউ মন্টগোমারির সীরাত সংক্রান্ত রচনাবলির জ্ঞানগত পর্যালোচনা করে সবিস্তারে তুলে ধরেছেন প্রাচ্যবিদদের রচনাসমূহের নিহিত উদ্দেশ্য ও প্রকৃত অভিমূখ। এভাবে আল্লামা শিবলি নুমানি রহ. ‘সীরাতুন্নবী’তে এবং মুহাম্মদ হুসাইন হায়কাল ‘হায়াতু মুহাম্মদ সা.’ এর ভূমিকায় জ্ঞানগর্ভ সমালোচনা করেছেন প্রাচ্যবিদদের। সুস্পষ্টরূপে হাজির করেছেন তাদের রচনার অনুসৃত নীতিমালার ত্রুটিবিচ্যুতি। একইসাথে সীরাত রচনার আদর্শ নমুনা এবং প্রকৃত নীতিপদ্ধতি সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন।

প্রাচ্যবিদ ও অমুসলিম পণ্ডিতরা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় ইসলাম ও মুহাম্মদ সা. এর জীবনচরিত নিয়ে অসংখ্য বই লিখে চলছেন। আরবি ভাষা না জানার ফলে কিংবা মুসলিম লেখকদের রচনার মাধ্যমে ইসলাম সম্বন্ধে জানার সুযোগ না পাওয়ায় মানুষ এদের বইগুলি পড়ে এবং ইসলাম সম্পর্কে নানাবিধ ধারণা ও তথ্য লাভ করে থাকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রাচ্যবিদদের কলমে উপস্থাপিত ইসলামটি সত্যিকারের ইসলাম নয়। ইসলাম, পয়গম্বরে ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস, শিক্ষা এবং মুসলিম জীবনাচার সম্পর্কে তাদের ‘কলম’ এমন এক বয়ান হাজির করে, ইসলাম বিশেষত নবি মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে যা স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক ধারণা এবং বৈরী মনোভাব তৈরি করে পাঠকের মনে। এর ফলে একদিকে অমুসলিমরা যেমন ইসলামের প্রকৃত পরিচয় লাভ করা থেকে বঞ্চিত হয়, অপরদিক আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমদের মধ্যেও তৈরি হয় ইসলাম নিয়ে নানারকম সংশয় এবং সংকট।

পশ্চিমা দুনিয়ায় ইসলাম কীভাবে হাজির আছে এবং পশ্চিমের মানুষজন ইসলামকে কোন্ দৃষ্টিতে দেখে, তার একটা বয়ান পাওয়া যায় ইউরোপীয় চিন্তাবিদ নওমুসলিম মুহম্মদ আসাদের বক্তব্যে। তিনি লিখেন, প্রাচ্যবিদদের (প্রাচীন ও আধুনিক কালের) সমূহ প্রচেষ্টা এবং ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারাবাহিক প্রচারিত ধারণা ও বয়ানগুলি সাধারণ পাশ্চাত্য মনকে বিষিয়ে তুলেছে। তাদের এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত অন্যান্য মুসলিম চিন্তাবিদদের রচনাগুলি পশ্চিমে ইসলামের দাওয়াহ ও প্রচার এবং ইসলামকে বোঝাপড়ার পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রাচ্যবিদদের লেখার প্রভাবে সাধারণ ইউরোপীয় এবং আমেরিকানরা কোনভাবেই ইসলামের দিকে মনোযোগ দিতে সম্মত হয় না। তারা ইসলামকে, ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষাকে কোনও বিচারে গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানযোগ্য বলে মনে করে না। এমনকি খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের সাথে তুলনাযোগ্যও মনে করে না।’

বস্তুত, প্রাচ্যবিদদের লেখাজোখা ও চিন্তাধারার যে বিষাক্ত প্রভাব ইসলামি বিশ্বে এবং মুসলিম শিক্ষিত সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে, এর মুকাবিলা করতে হলে আমাদের দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুসংহত এবং সুসংগঠিত প্রতিরোধ। এর জন্য জরুরি হচ্ছে স্বচ্ছ ও সুযোগ্য চিন্তার অধিকারী মুসলিম গবেষক ও লেখকের একটি জামাত, যারা প্রাচ্যবিদদের সূত্র ও রেফারেন্সের সত্যতা সম্পর্কে গবেষণা করবেন এবং এক্ষেত্রে এমন ইলমি বিশ্লেষণ এবং গবেষণাধর্মী শৈলী আর যুক্তিপদ্ধতি অবলম্বন করবেন, যা প্রাচ্যবিদদের তুলনায় উন্নত। পাশাপাশি তাদের জ্ঞানগত ত্রুটি, প্রতারণা এবং নাশকতার মুখোশ উন্মোচন করে স্পষ্ট এবং সঠিক গাইডলাইন হাজির করবেন মুসলমানদের সামনে। এমন না করা হলে আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমরা প্রাচ্যবিদদের বিষাক্ত চিন্তাধারার প্রভাব এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম হবে না।

প্রাচ্যবিদ ও পশ্চিমা পণ্ডিত ও গবেষকদের সমস্ত চিন্তাধারা এবং ইসলাম সম্পর্কে তাদের মতামত ইসলামের সঠিক শিক্ষার নিরীখে যাচাই করে গ্রহণ করা; এটাই হল এসময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা এবং অগ্রগণ্য কর্তব্য। এ চাহিদায় অমনোযোগ এবং এ কর্তব্যে অবহেলা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে আদৌ ভালো পরিণতি বয়ে আনবে না।

তথ্য সহায়তায়:

  • ইসলামী বিশ্বকোষ।
  • সীরাত বিশ্বকোষ, অষ্টম খণ্ড। এটি মূলত ড. মোহর আলি কর্তৃক রচিত ইংরেজি Sirar-al-nabi and Orientalist এর বাংলা অনূবাদ। যা ইসলামিক ফাউণ্ডেশন থেকে সীরাত বিশ্বকোষের একটি স্বতন্ত্র খণ্ডরূপে প্রকাশিত হয়েছে।
  • খুতবাতে মাদরাস, সায়্যিদ সুলায়মান নদভি।
    আব্দুল মান্নান তালিব কর্তৃক অনূদিত: পয়গামে মুহাম্মাদী।
  • পাশ্চাত্য মনীষীদের দৃষ্টিতে রাসূলে আকরাম, মূল, প্রফেসর শরীফ বাকা, লাহোর, অনুবাদ, মুফতি শহীদুস সালাম কাসেমি, মদিনা পাবলিকেশন্স, ২০০৬।

লেখক পরিচিতি:

কাজী একরাম।
ইসলামি গবেষণা বিভাগ।
মা’হাদুল ফিকরি ওয়াদদিরাসাতিল ইসলামিয়্যা, ঢাকা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.