Interview with Syed Ali Ashraf

প্রশ্ন: আপনি বলেছিলেন যে আপনার সাহিত্যকে সাহিত্যের মানদণ্ড দ্বারাই একমাত্র বিবেচনা করা উচিত। এর মাধ্যমে কি আপনি বলতে চান যে ইসলামী মানদন্ড দ্বারা আপনার সাহিত্য বিচার করা চলবে না?           

উত্তর: সাহিত্যকে সাহিত্যের মানদন্ড দ্বারাই বিচার করা উচিত। তার অর্থ এই নয় যে সাহিত্যিকের কোন জীবন দর্শন নেই বা কোনো জীবনাদর্শকে অনুসরণ করছেন না। কিন্তু সেই জীবনদর্শন শুধুই যদি বুদ্ধিগ্রাহ্য ধ্যান-ধারণাতেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সাহিত্যিক যদি শুধু অন্ধবিশ্বাসের মাপকাঠি দিয়ে সেই ধ্যান-ধারণার প্রচার করার চেষ্টা করেন অথচ নিজের ব্যক্তিগত জীবনে অনুভূতির দ্বারা জীবনের সর্বক্ষেত্রে সেই আদর্শকে উপলদ্ধি করতে সক্ষম না হন এবং সেই অনুভূতিলব্ধ সত্যকে প্রকাশ করার প্রয়াস না পান তাহলে সেই জীবনাদর্শ সাহিত্যে পরিণত হতে পারে না। সত্যিকারভাবেই সেই আদর্শ বা মতবাদ বা আইডিওলজি একটি উপলদ্ধিগত সত্য না হয়ে একটি বুদ্ধিগ্রাহ্য মতবাদে পরিণত হয় এবং সাহিত্যিক জবরদস্তি সেই মতবাদের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনের কর্মকাণ্ড এবং মানব চরিত্রকে বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হন। ফলত অনেকে মার্কসবাদী সাহিত্যিকের মতো ধনী ব্যক্তির চিত্র রচনা করতে গেলেই তাকে ক্রূর কুটির অথবা নিষ্ঠুর হিসেবে চিত্রিত করেন। কিন্তু সাহিত্যিক যখন একটি জীবনাদর্শে বিশ্বাস করেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই জীবানদর্শের প্রতিফলন দেখতে চান তখন প্রতিনিয়ত তার জীবনাদর্শ তার চরিত্রে রূপায়িত হতে থাকে। যতোটুকু তিনি প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে উপনীত হতে পারেন ততোটুকুই তার সাহিত্যে রূপায়িত হয়। সেই জন্যই দেখা যায় সমস্ত উন্নতমানের সাহিত্যিকদের জীবনাদর্শের মধ্যে পরিবর্তন,পরিবর্ধন এবং ক্রম পরিণতি রয়েছে। শেক্সপীয়ারের মধ্যেও তা দেখি, রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও তাই দেখি। এমনকি নজরুলের ভেতরও তাই দেখি। নজরুলের কথাই ধরা যাক সত্যিকারভাবে তিনি এক প্রেমিক কবি। তাঁর বিদ্রোহ প্রেমের অভাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। কিন্তু এই বিদ্রোহ তার কাব্যের মূলসূত্র নয়। নারী প্রেম ক্রমে ঐশী প্রেমে পরিণত হয়েছে। ‌’নতুন চাঁদ’ কাব্যগ্রন্থে তার সেই ভাবধারার বিস্তৃতি এবং গভীরতার সন্ধান পাই। আমার কবিতায় প্রথম দিকে মানবিক প্রেম এবং হতাশার সঙ্গে ঐশী প্রেমের সাক্ষাত পাওয়া যায়, যেমন ‌’বসন্ত’ কবিতায়। কিন্তু ক্রমে ক্রমে আত্মিকসাধনার ফলে যে নিত্য নব অভিজ্ঞতার সন্ধান পেয়েছি তার পরিণতি ‘‌‌হিজরত’ কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে। ইসলাম আমাকে তত্ত্ব দিয়েছে আর ‘রূহানী’ সাধনা আমাকে জীবনকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করেছে। এই সাধনায় অনেক দূরে অগ্রসর হয়েছিলাম বলেই বিলেত  যেয়ে তাদের ভালোটা চয়ন করতে পেরেছি, গ্রহণ করতে পেরেছি এবং ইসলামের মানদণ্ড যেহেতু আমার চিত্রে এবং চরিত্রের মধ্যে একাত্মতা লাভ করেছে, আমার দৃষ্টিতে পাশ্চাত্য সভ্যতায় যা কিছু মূল্যবান এবং ইসলামী জীবন পদ্ধতির জন্য গ্রহণযোগ্য তাই স্বীকার করে নিয়েছি। ‘হিজরত’ কবিতাটি কেমব্রিজে বসেই লিখিত হয়েছিল এবং যখন লিখিত হয়েছিল তখন আমি ইংরেজী সাহিত্যের উপরই থিসিস লিখছিলাম।

প্রশ্ন : দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার সাম্প্রতিক ধারার সাথে আপনি নিজেকে কতোটুকু সংযুক্ত বলে মনে করেন?                        

উত্তর: আমি কখনোই বাংলাদেশের প্রকৃতি এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম না। যখন করাচীতে ছিলাম তখন বহুবারই বাংলাদেশে আসতে হতো এবং বাংলাদেশরই প্রতিভু হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে বিভিন্ন অবস্থায় কাজ করতে হতো। যখন ১৯৭১ সালের মার্চে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হল তখন করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত বাঙ্গালী ছেলেদের সাহায্য করেছি এবং ১৯৭২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাংঙ্গালী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আমি ‘রূপবাংলা’ নাম দিয়ে একটা ফিচার প্রোগ্রাম তৈরি করি। তাতে অনেক গান এবং কবিতা রয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ জিনিসটি আল্লাহর কাছে একটি মোনাজাতের রূপ ধারণ করেছে। সেই ‘রূপবাংলা’ একটি বই আকারে শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। তখন সকলেই বুঝতে পারবে বাংলাদেশের সমাজকে কতোটা গভীরভাবে আমি জানি। নিজের সমাজকে যে না জানে সে কখনো সে ধরণের সাহিত্য রচনা করতে পারে না যে সাহিত্যে সত্যের সন্ধান থাকে। ১৯৭০ সালে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উপর ইংরেজিতে লেখা আমার একটি বই প্রকাশিত হয়। সেই ৭০ সাল পর্যন্ত যত কবি কাব্য রচনা করেছেন তাদের সমালোচনা তাতে রয়েছে। সুতরাং যতদিন পর্যন্ত করাচী ছিলাম সে পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সাহিত্য রচনা হয়েছিল তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তাছাড়া ১৯৪৭ থেকে নিয়ে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যতো নাটক রচিত হয়েছে তার একটি সমালোচনা ‘Bengali Drama’ এই নামে ‘Pakistani Drama’ এর অংশ হিসেবে ‘ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপেডিয়া অব ড্রামা’ (World Encyclopaedia of Drama ) বইয়ে ছাপা হয়েছে।             

সুতরাং যেমন বাহাত্তর সাল পর্যন্ত বাংলা কাব্যের সাথে আমার নিগূঢ় যোগ ছিল তেমনি বাংলা নাটকের সঙ্গেও আমার পূর্ণ পরিচিতি ছিল। তেহাত্তর সালে আমি করাচী ত্যাগ করি এবং বিলেতে এবং সৌদি আরবে অবস্থান কির। সুতরাং এ কথা সত্য, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কি সাহিত্য রচিত হয়েছে তা আমার জানা ছিল না। ঢাকায় ১৯৭৮ সালে ওয়াই. আই. সির তরফ থেকে যে কনফারেন্স হয়েছিল তাতে আমন্ত্রিত হয়ে আট বছর পর বাংলাদেশে পদার্পণ করি। তারপর ১৯৭৯ সালে মরহুম জিয়াউর রহমান দ্বারা আমন্ত্রিত হয়ে আবার আসি এবং ১৯৮১ সালের তৃতীয় বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের আয়োজন করি। তখনো নতুন সাহিত্যে এবং সাহিত্যিকদের সঙ্গে তেমন পরিচয় হয়নি। কিন্তু ১৯৮১ সাল থেকে প্রতিবছর আমার এখানে আসা-যাওয়া শুরু হয় এবং ১৯৮৪ সালে ‘হিজরত’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তখনই নানা পত্রপত্রিকার মারফত সাম্প্রতিক কবিতার সাথে আমার পরিচয় হয়। আর তুমি তো জানোই গত দুই বছরে প্রায় সমস্ত সাম্প্রতিক কবিদের কবিতার বই আমি পড়েছি। তাদের ভেতরে আমি দুটি ধারার সন্ধান পাই । একটি হচ্ছে আধুনিক কবিতার কাব্যভাষা এবং ছন্দ যা তিরিশ দশকের পরপরই বাংলা সাহিত্যে দেখি- ধর্ম সম্বন্ধে দুর্বলতা-ফলত অপরিপক্কতা এবং জীবনোপলদ্ধিতে খর্বতা। সুতরাং হতাশার এবং নিরাশ্রয়তার গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে বিভ্রান্ত পাওয়া এবং তারই ফলে দৈহিক কামনা বাসনাগত প্রেমকেই সর্বস্ব বলে ভাবা আর সেই সঙ্গে হয় মাকর্সবাদে নতুন আদর্শের সন্ধান পাওয়া নয়ত মনুষ্যত্বকে নতুনভাবে সন্ধান করা- এই ভাবধারার কাব্য। এই ধারাটির ভিতরে অভিনবত্ব কিছুই নেই- আধুনিক ইংরেজ কবিদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন দত্ত- এদের প্রভাবেরই ক্রমপরিণতি দেখি এসব কাব্যে। শামসুর রহমান থেকে নিয়ে আবিদ আজাদ পর্যন্ত সেই একই অস্থির জীবন-চেতনার ভাবপুষ্ট কল্পলোক এবং ভাষা ব্যবহারের রূপ বৈচিত্র্য যতটুকু সম্ভব ততটুকু দেখতে পাই। এই সঙ্গেগ লক্ষ্য করছি গদ্যছন্দে কবিতা রচনা। মনে হচ্ছে অনেকেই ছন্দের উপর দখলই হারিয়ে ফেলেছেন। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক ইংরেজী কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কথোপকথনের চালকে কবিতার ছন্দদোলার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করা – শেকসপীয়র যা করেছেন। বাংলাদেশের অনেক কবিরা তা করতে সক্ষম না হয়ে গদ্যরীতিতে কবিতা রচনা করতে শুরু করলেন। এ এদের দুর্বলতার লক্ষণ – সবলতার লক্ষণ নয়। নজরুল দুভাবে এ জিনিসটি আনার চেষ্টা করেছিলেন। এক হচ্ছে মুসলিম জীবনের ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে ভাব ভাষা উপেক্ষা চিত্র চয়ন করেছিলেন। এমনকি আরবী ফার্সী আয়াত এবং শব্দ সাবলীলভাবে ব্যবহার করেছিলেন। দ্বিতীয়ত সাধারণ মুসলিম ঘরোয়া জীবনের আচার ব্যবহার থেকে চিত্র আহরণ করে তাকে কাব্যে উত্তীর্ণ করেছিলেন। ফররুখ আহমদ নজরুলের এই দ্বিতীয় পদ্ধতি গ্রহণ করেননি কিন্তু প্রথম পদ্ধতিকে তিনি আরো সমৃদ্ধ করেছিলেন নতুন প্রতীক সৃষ্টি করে। ‘সিন্দাবাদ’ এবং ‘হাতেম তাঈ’ তিনি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল সেই যুগের মুসলিম মনোভাব এবং স্বপ্ন ও আশা। ফররুখ যে বাংলার মুসলিম সমাজ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন তা তার দুটি কাব্যগ্রন্থ থেকেই প্রমাণিত হয়।’ সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে দেখা যায় চল্লিশ দশকের মুসলিম মানসের সুষ্ঠু প্রকাশ। আর ‘হাতেম তাঈ’ কাব্যে ষাট দশকের দ্বন্দ্ব বিক্ষুদ্ধ বাঙ্গালী মুসলিম সমাজ সত্তাকে হাতেম তাঈয়ের কাহিনীর মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি পুথিচরিত্র এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের সাহায্য নিয়ে বর্তমানকে বিশ্লেষণ করে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছেন। আর আমার চেষ্টা ছিল সমাজের আশা-নিরাশা, দ্বন্দ্ব-কলহ, সত্য- মিথ্যার কোলাহলের বাহ্যিক সামাজিক প্রকাশের অন্তরালে যে অভ্যন্তরীণ রূহানী আকাঙ্ক্ষার এবং চেতনার সাথে স্বার্থময় নাফসের আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থলোলুপতার সংঘাত থাকে, যা চিরন্তন মানবিক সমসা – সে গূঢ়তত্ত্ব পেশ করা। এই দ্বন্দ্ব কখনো দার্শনিক কাব্যরূপ নিয়েছে, কখনো, বিসংগতি’র মত সমাজ চিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। সাম্প্রতিক বাংলা কাব্যে বাংঙ্গালী মুসলিম মানসের এই দ্বন্দ্ব সংঘাত ঐতিহ্যজাত চিত্র বা রূপকল্প বা প্রতীকের মাধ্যমে খুব কম কবিই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। অনেকেই ‘মডার্ন’ হতে চেষ্টা করেছেন, যৌনচর্চার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন এবং মর্ডান জীবনকে রূপায়িত করতে অগ্রসর হযেছেন। কিন্তু এই মর্ডান জীবনকে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে দেখার চেষ্টা করেননি। এ কথাও অনেকে ভুলে গেছেন যে এ সমাজ বিভিন্ন দ্বন্দ্বে বিক্ষুদ্ধ এবং হতাশা এবং স্বপ্নের দ্বন্দ্বে আহত। এই দ্বন্দ্বের ভিতরে যারা প্রবেশ করেননি তারা কখনো সত্যিকারভাবে বাংলার মুসলিম মানসকে রূপায়িত করতে পারবেন না। অনেকেই তাই দেখতে পাই মতবাদ দ্বারা নিপীড়িত এবং বন্দী। চিরন্তন মূল্যবোধ সাহিত্যিককে যে স্বাধীনতা দান করে এবং গভীর অনুভূতির ক্ষেত্রে বিচরণ করতে সাহায্য করে তার অভাব সেখানে পরিলক্ষিত হয়। আমি ‘বনি আদম’, ‘বিসংগতি’, ‘দজ্জাল’,’ শিরী ফরহাদ তত্ত্ব’, ‘আল্লাহর মাহাত্ম্য’, এজরা পাউন্ডের ‘সুদ’ এবং ‘প্রেম’, ই. ই. কামিংসের অনুসরণে লিখিত ‘কেউ এক এবং কেউনা’ কবিতাগুলিতে বাংঙ্গালী মুসলিম মানসের এই দ্বন্দ্ব বিক্ষোভ জ্বালা এবং বিশ্বাসের রাজ্যে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এবং সমাধানের সন্ধান করেছি। আমার নতুন বই ‘প্রশ্নোত্তর’-এ এই সমস্তের আরো যে সব নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি তার উত্তরের সন্ধান করেছি। সুতরাং আমি বলতে পারি যে বিশ্বাস বাংলা মুসলিম সমাজের আশ্রয়স্থল আমার সত্তা তার ভিতরে প্রবিষ্ট হয়েছে। সেই হিসেবে আমি বলতে পারি সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রতিক বিশ্বাসের পবিত্রতার সঙ্গে অপবিত্র অবরণের যে চরম দ্বন্দ্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি এবং যার ফলে সমাজ মন অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ অথচ সেই শান্তির প্রত্যাশী আমার কাব্যে তারই রূপ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশ্ন :  ‘কেন কবিতা লিখি’ লেখায় আপনি বিবিধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন – তাতে মনে হয় পৃথিবীর বিভিন্ন সাহিত্যের সাথে আপনার পরিচয় রয়েছে এবং তাদের প্রভাব আপনার রচনার উপর পড়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কোন কোন কবি-সাহিত্যিকের বিশেষ প্রভাব আপনি অনুভব করেছেন?             

উত্তর : কেমব্রিজে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স পড়তে যেয়ে বিশ্ব সাহিত্যের দরজা আমার সামনে খুলে গিয়েছিল। অবশ্য ইংরেজী সাহিত্যের সাথে আমার পরিচয় প্রথম থেকেই ছিল। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি ইংরেজীতেই অনার্স ও এম এ করেছি। বাংলা এবং ইংরেজী সাহিত্য ছাড়া তরজমার মারফতে ফরাসী এবং রাশিয়ান উপন্যাসের সাথে পরিচিত ছিলাম। কিন্তু সেগুলো আমার পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। কেমব্রিজে যেমনি ফরাসী ভাষা শিখে ফরাসী পড়তে হয়েছে তেমনি ট্র্যাজেডি কোর্সে দুনিযার বিভিন্ন ভাষায় লিখিত নানা ট্র্যাজিক ড্রামা পড়তে হয়েছে। তেমনি লিটারেরী ক্রিটিসিজম বা সাহিত্য সমালোচনা কোর্সে প্লেটো থেকে নিয়ে আধুনিককাল পর্যন্ত পাশ্চাত্যের সব ধরনের সমালোচনা রপ্ত করতে হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন সাহিত্যের প্রভাব নিজের অজান্তে নিজের উপর পড়েছে। তবে যে সমস্ত প্রভাব নিজে সচেতনতভাবে অনুভব করেছি তা হচ্ছে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরীজ এবং কীটস, ব্রাউনিং, ইয়েটস এবং টি. এস. এলিয়টের এবং তার পরবর্তী কবিদের মধ্যে বিশেষভাবে অডেনের এবং কিছুটা ভাষা ব্যবহার ও রচনাশৈলীর ক্ষেত্রে ডিলান টমাসের আর ফরাসী কবিদের মধ্যে বোদলেয়ার, ফার্সী কবিদের মধ্যে ফেরদৌসীর এবং হাফেজের। গ্রীক সাহিত্যের মধ্যে  ইস্কিলাস, এবং সফক্লিসের। জাপানী ‘নোহ’ নাটকের, নরওয়ের ইবসেনের এবং রাশিয়ান ঔপন্যাসিক টলস্টয় এবং দস্তয়েভস্কির।               

তবে এদের মধ্যে প্রতীক ব্যবহারের কৌশল আয়ত্ত করেছি প্রধানত ইয়েটস এবং এলিয়ট থেকে এবং ভাষায় পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সমন্বয় কৃত চিত্রকল্প রচনার পদ্ধতি শিখেছি কিছুটা ডিলান টমাস থেকে এবং কিছুটা অমিয় চক্রবর্তী থেকে। কোরআন শরীফ থেক বহু চিত্রকল্প আমার কাব্যে বিধৃত হয়েছে। বিশেষত আসফালা সাফেলীন এবং লাব্বায়েক কবিতায়। আর পুথি সাহিত্য থেকে এবং সেই সঙ্গে রুমির ‘মসনবী’ এবং নিজামীর ‘ইউসুফ জুলেখা’ এবং ‘লায়লা মজনু’র প্রভাব দেখা যাবে ‘বনি আদম’ কবিতা এবং ‘আফফালা সাফেলীন’-এ। টি. এস. এলিয়টের বিশেষ প্রভাব পড়েছিল ‘হিজরত’ কবিতার আঙ্গিকে এবং কিছুটা ভাব পরিবেশনে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে অন্তরের অন্তস্থলে কিভাবে এই বিভিন্ন ধারার সমম্বয় সাধিত হয়েছিল তা আমি বুঝাতে পারবো না। অনেক দিন পর এই কবিতাগুলো পড়তে যেয়ে আমি নিজেই মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই যে দুনিয়ার বিভিন্ন সভ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই সমস্ত চিত্ররুপ এবং প্রতীক কিভাবে আমার নিজস্ব ভাবধারার দ্বারা আপ্লুত হয়ে এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে কোথাও কোনো বিভেদ বা বিরোধ বা বৈপরীত্য দেখতে পাচ্ছি না। অথচ দৃষ্টিকোণ বিশ্বাস ভিত্তিক উপলব্ধির দ্বারা রঙিন হয়েছে। তবে বিশেষ করে বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে অডেনের কথাই বার বার মনে পড়ে। মনে হয় টি. এস. এলিয়টের কাছ থেকে ও অডেনের কাব্যে বাংলাদেশের বর্তমান কবিরাও অনেক খোরাক পাবেন যা তাদের চেতনাকে আরো সুস্পষ্ট, বলিষ্ঠ এবং গভীর করবে। যদিও অডেনের পরে আরও অনেক কবির অভ্যুদয় ঘটেছে কিন্তু আমাদের বর্তমান জীবনে যে কলুষ দ্বন্দ্ব এবং বেদনার সাক্ষাত হয় তা অডেনের লেখাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। আমার প্রকাশিতব্য নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘প্রশ্নোত্তরে’ সেই প্রভাব বেশির ভাগ দেখা যাবে বলে মনে হয়।

প্রশ্ন: আপনার নিজের কবিতায় যে প্রতীক ব্যবহার করেছেনে তার অর্থ আমরা কিভাবে জানতে পারবো এবং সেই প্রতীক কি কোন নতুন অনুভূতির দ্যোতনা দান করছে?             

উত্তর: প্রতীকের ইংরেজী কথা হচ্ছে Symbol. প্রতীক দুই ধরনের হয় : ঐতিহ্য সংশ্লিষ্ট এবং বুদ্ধিজাত। ঐতিহ্য সংশ্লিষ্ট প্রতীক যখন কোনো কবি ব্যবহার করেন তখন ঐতিহ্যবোধ থেকে তিনি ভাবধারা আহরণ করেন এবং তার নিজস্ব জীবন উপলদ্ধি ঐতিহ্যগত ভাবধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে অথবা ঐতিহ্যগত ভাবধারা থেকে কোনো আদর্শ বা উপলব্ধি বা জীবনবোধকে টেনে এনে তিনি তার নিজস্ব উপলব্ধির রসে তাকে রসায়িত করেন। টি. এস. এলিয়ট যেমন করেছেন তার ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ কাব্যে। খৃস্টান ভাবধারা, আর্থুরীয়ান রোম্যানস্ এবং বিভিন্ন মধ্যযুগীয় এবং গ্রীক উপকথা থেকে উপমা এবং প্রতীক আহরণ করে তার নিজস্ব জীবন উপলদ্ধির রসে রসায়িত করেছেন। ইয়েটস্ সেই দিক থেকে আইরিশ উপকথা থেকে প্রতীক সংগ্রহ করেছেন নিজের ভাবধারা প্রকাশের জন্য। আবার সম্পূর্ণ নিজস্ব বুদ্ধিজাত প্রতীকের সৃষ্টি করেছেন, যে প্রতীকের অর্থ বুঝতে হলে তিনি এ সম্বন্ধে কি বলেছেন তা আমাদের জানা দরকার। ‘রাজহংস’ টাওয়ার’ ‘ঘুরন্ত সিড়ি’ ‘সোনার পাখি’ ইত্যাদি বহু প্রতীক তিনি সৃষ্টি করেছেন যার অর্থ সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং বুদ্ধিজাত।             

আমি যে প্রতীক ব্যবহার করেছি তার মধ্যে এ দুটি দিকই রয়েছে। ‘বিসংগতি’ কাব্যগ্রন্থের ‘ইতিহাস’ কবিতাটিই ধরা যাক। যে ভাবধারা এই কবিতায় প্রকাশ করা হয়েছে তা হচ্ছে মানুষের সৃষ্টি থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যে ইতিবৃত্ত রয়েছে তার একটি বিশেষ ব্যাখ্যা। এ কবিতায় অনেকগুলো প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও এ প্রতীকগুলি ইসলামি, হিন্দু, গ্রীক, চীনদেশীয় ঐতিহ্য থেকে এবং প্রকৃতি থেকে আহরিত, এদের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ নিজস্ব। এই নিজস্ব ব্যাখ্যার পিছনে রয়েছে মানুষের ইতিহাস সম্বন্ধে ধারণা, যে ধারণা কোরআন এবং হাদীসের ভিত্তিতে রূপ লাভ করেছে। যেহেতু কবিতাটি ছোট হওয়া সত্ত্বেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং বৈচিত্র্যময় প্রতীকে ভরপুর-সম্পূর্ণ কবিতাটি সামনে থাকা প্রয়োজন-তাই তুলে ধরছি- ইতিহাসচিরন্তনীর বাঁধন ছিন্ন হল,আদমের হাত ভাঙে নিষিদ্ধ ফল।জুলেখা, ইউসুফে দ্বন্দ্ব রোপিত হল,চক্রবৃত্তে সময়ের যাতাকল।বিসর্জনের দামামা তাইতো বাজে,শুভ্রশঙ্খ আত্মপূজায় রত,নিত্যনব্য বাসন্তিকার সাজেপ্রাচীন সর্প পরিবর্তন-রত।।আদি ও অন্ত অনন্তে শুধু মেলে,চক্রবৃত্ত এখানে সরল গতি,ক্রমবর্ধনে তারকাসূর্য জ্বলে,মানবাত্মায় চন্দ্রমা পরিণতি।।চন্দ্রমা মুখে সম্পূর্ণের ছায়া,আমিনা হস্তে ছিন্ন অ্যাপোলো-বক্ষ,কায়খসরুর প্রাসাদের মৃতকায়াআবাহন-গীতে কম্পিত ভীত কক্ষ।।পূর্ণতা আনে ধ্বংসের সংবাদ,স্ফিংকসের ড্রাগনবক্ষ জাগে,গোলাপে-সূর্যে চক্রক্ষান্তি সাধ,সর্বরূপের মিলিত সূর্য জ্বলে।এককালে সময়ের অতীতে মানুষের অবস্থান ছিল, তখন তার কোন ইতিহাস ছিল না -ইতিহাস রচনা শুরু হয়েছে মানুষের চিরন্তনত্ব থেকে উৎক্ষিপ্ত হয়ে সময়ের গণ্ডির ভিতরে প্রবেশ করার পর এবং মূলে রয়েছে আদম [আ:] এর আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করার ঘটনা। নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করার পর আমাদের প্রথম পিতামাতার প্রকৃতির মধ্যে এমন বস্তুর আবির্ভার ঘটল যা তাদেরকে জান্নাতে বাস করার অনুপযুক্ত করে দিল। এই বিশেষ চারিত্রিক অবস্থা মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূল বলে দেখান হয়েছে। দুটি প্রতীকের মারফৎ এই অবস্থার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে – জুলেখা এবং ইউসুফ। জুলেখা হচ্ছে মানুষের অন্তর্নিহিত জীবাত্মার প্রতীক যা মানুষের দুনিয়ার লোভ লালসা, জাগতিক শক্তির লোভ এবং দুনিয়ার প্রতি মহব্বাতের দিকে মানুষকে আকর্ষণ করে। ইউসুফ (আঃ) কে জুলেখা ভোগ করতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি সেই ফাঁদে পতিত হননি। ইউসুফ (আ:) তাই ঈমানের এবং রূহানী শক্তির প্রতীক যা মানুষকে সত্যের দিকে, ন্যায়ের দিকে, স্বার্থলেশহীনতার দিকে পরিচালিত করে এবং মানবসত্তাকে কামনা বাসনার সঙ্গে, দুনিয়ায় নানাবিধ লোভ লালসার সঙ্গে দ্বন্দ্বে সাহায্য করে। আমি বলতে চেয়েছি যে দুনিয়ার সমস্ত ক্রিয়াকর্ম, দ্বন্দ্ব সংঘাত, রাষ্ট্রের উত্থানপতন – সব কিছুর মূলে রয়েছে মানুষের মধ্যে এই ভাল – মন্দের দ্বন্দ্ব, সত্যাসত্যর দ্বন্দ্ব, পার্থিব লোভ লালসার সঙ্গে সেই ঐশী প্রেমের দ্বন্দ্ব যে প্রেম মানুষকে, কামনা- বাসনাকে রূহানী শক্তির অধীন করে দেয়। ইতিহাসের মূলে রয়েছে সেই কর্মকাণ্ড যার ভিত্তিমূলে রয়েছে মানবাত্মায় এই দুই শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব – পার্থিব জাগতিক ভালবাসা এবং রুহানীর ঐশী প্রেমের শক্তি।               

দ্বিতীয় স্তবকে এই দ্বন্দ্বের আর একটি রূপ সভ্যতার ইতিহাসে যেভাবে পরিলক্ষিত হয় তাকে প্রতীকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সৃষ্টিতে এবং তাই প্রকৃতিতে জন্মবৃদ্ধি মৃত্যুর চক্রবৃত্ত দেখি। বাহ্যিকভাবে সমাজের, সভ্যতার, এমনকি কৃষ্টির ভিতরেই এই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অথচ এই পরিবর্তন মূলত বাহ্যিক। যে বিশিষ্ট চিরন্তন মূল্যবোধের বিকাশ এবং পরিমার্জনের মাধ্যমে সভ্যতা এবং কৃষ্টির সত্তার অন্তর্নিহিত অস্তিত্ব বাহ্যিক জগতের বিচিত্র অবস্থার মধ্যে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে, সেই মূল্যবোধ হচ্ছে আল্লাহর গুণাবলীর মানবাত্মায় প্রতিফলন – তাই তা চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়। তাকেই আমি প্রাচীন সর্পের খোলস বদলানোর রূপে দেখিয়েছি। সেই সত্তা ‘প্রাচীন’ এবং প্রকৃতিও ‘প্রাচীন’ খোলস বদলানো দেখে অনেকেই ভাবে বিবর্তন হল, পরিবর্তন হল। প্রকৃতপক্ষে মানবসত্তার রূপ এবং তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব এবং তার সত্যিকারের মাহাত্ম্য অপরিবর্তনীয়। প্রতিটি সভ্যতার প্রকৃত সত্তা হচ্ছে বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সেই চিরন্তনকে সন্ধান করা।           

মানবসভ্যতার এই ইতিহাসের পরিসমাপ্তি তখনই হতে পারে যখন আল্লাহ অনন্তের মধ্যে সমস্ত সীমিত বস্তুকে মিটিয়ে দেবেন। সূরা আররাহমানে এই তত্ত্বের ইঙ্গিত দিয়ে বলা হচ্ছে যে এমন এক সময় আসবে যখন সমস্ত সীমিত বস্তুর সীমিত অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে – একমাত্র আল্লাহর অপূর্ব মুখাবয়বের অস্তিত্বই জাগ্রত থাকবে। সে দিকে ইঙ্গিত করেই বলা হচ্ছে যে এই অনন্তরে আদি ও অন্তের গণ্ডির মধ্যে এনে সৃষ্টির ক্রমবিকাশের একটি ধারা স্থির করে দেওয়া হয়েছে – তাই তারকা সূর্যের বিকাশের মধ্যে আল্লাহর ক্ষমতার যে বিকাশ হল তার বহু পরে মানবাত্মাকে সৃষ্টির ভিতর প্রকাশ করে আল্লাহর ক্ষমতার পরম বিকাশের ব্যবস্থা করা হল। ‘চন্দ্রমা পরিণতি’ একটি নতুন প্রতীক – হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা সাহাবারা চন্দ্রের মত উজ্জ্বল, শান্তরূপে দেখেছেন। তাই তার প্রকাশ হচ্ছে মানবাত্মার ‘চন্দ্রমা পরিণতি’ আর পরিণতি শব্দ ব্যবহার দ্বারা পূর্ণ পরিণত অবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ মানবতার প্রতীক।পরবর্তী স্তবকে পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্য কৃষ্টি থেকে রূপকল্প আহরণ করে ইসলামের রসে রসায়িত নতুন প্রতীক সৃজন করা হয়েছে। ‘আমিনা’ রাসুলের মাতা কিন্তু তিনি যেন এক শক্তিমন্ত নতুন সভ্যতার এবং ভাবাদর্শের প্রতীক – এ্যাপোলো গ্রীকসভ্যতার তথা পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতীক। আমিনা হস্তে এ্যাপোলোর বন্ধ বিদীর্ণ হওয়া অর্থ ইসলামের হস্তে পাশ্চাত্য সভ্যতার গৌরবের এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিপূজাভিত্তিক মুল্যবোধ এবং সমাজব্যবস্থার সমাপ্তি। তেমনি অগ্নিপূজক পারসিক সভ্যতার ধ্বংসেরও পরের দুটি লাইনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই রূপকল্প আমাদের ঐতিহ্যগত মৌলুদ শরীফে বর্ণনা দেওয়া হয় – যে রাসূলের জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের বিরাট পূজামণ্ডপের অগ্নিকুণ্ড নিভে গিয়েছিল।মানুষের ইতিহাসে আমাদের রাসূলের অভ্যুদয় পূর্ণতার সঙ্গে সঙ্গে কেরামতের খবর দিয়েছে। ‘স্ফিংসের ড্রাগন বক্ষ’ এই রূপকল্প সম্পূর্ণ নিজের তৈরি – প্রাচীন মিশরীয় এবং চৈনিক বিধর্মের প্রতীককে এক করে বলতে চেয়েছি যে আবার সেই বিধর্মের অভ্যুত্থান এবং প্রচার এবং দৌরাত্ম্যের ভয়াবহ ইংগিত পাচ্ছি। গোলাপ এবং সূর্য প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং শক্তির প্রতীক – তারাও যেন এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সময়ের গতিকে শেষ করে দিয়ে চিরন্তনে মিলতে চায় যে চিরন্তনে ‌একমাত্র আল্লাহর সত্তাই জাগ্রত –  তার সেই সত্তার প্রতীক হিসেবে ‌’সর্বরূপে মিলিত সূর্য’ রূপকল্প সৃষ্টি করা হল।

প্রশ্ন : এই কবিতায় অতি সংক্ষেপে তাই অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছেন। যে সব কথা বললেন তা বুদ্ধিগ্রাহ্য বক্তব্য – এ কবিতায় অনুভূতির প্রত্যয় কোথায়? এ কবিতার প্রতীক যদি কেউ বোঝে তাহলে তার মনে কি এমন কোন অনুভূতি জাগ্রত হবে যে অনুভূতি জীবনের একটি সত্য তার মনে প্রতিভাত করবে এবং সে হৃদয় – কন্দরে নিহিত সত্যকে সত্য বলে উপলদ্ধি করতে সক্ষম হবে? এবং মানব ইতিহাসের সার্বক্ষণিক প্রতিমূর্তিকে গ্রহণ করে নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হবে?                 

উত্তর : তাহলে বুদ্ধিগ্রাহ্য দর্শন কিভাবে অনুভূতির স্তরে উত্তীর্ণ হল তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি। এই ব্যাখ্যা দ্বারা আমার ব্যক্তিগত মাহাত্ম্য প্রচার করছি না – আমি তোমাকে কবিতা বুঝবার এবং ছন্দ ও রূপকল্পের সমন্বয়ে যে কল্পলোকের উদ্ভব হয় তাকে উপলদ্ধি করবার বিশেষ পদ্ধতি কি তা-ও  বোঝাতে চেষ্টা করব। সারা জীবন তো এইসবই শিক্ষা দিয়েছি। তা-ই বলছি এ কবিতাটি আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও এর ব্যাপ্তি ও গভীরতা এবং বুদ্ধি, অনুভূতি এবং বিশ্বাসের সঙ্গে ঐতিহাসিক সভ্যতার গাঢ় মিশ্রণ রয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে বুদ্ধিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়ে এর দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করেছি আশা করছি। এখন অনুভূতির মুখ যেহেতু মহানবীর তাই প্রকৃতিতে যে সৃষ্টির বিকাশ- সেই সৃষ্টির পরিণত বিকাশ যেহেতু মানুষের এবং সেই মানুষের চরম পরিণত ঠিকানা আমাদের মহানবীতে তাই ইতিহাসের পরিণত প্রকাশ তাঁর আবির্ভাবে ।পরের স্তবক পাঠে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে পারি সেই পরিণতির গভীরতা এবং বিস্তৃতি এবং নিজেকে এই নতুন সভ্যতার ঐতিহ্যের মধ্যে জীবিত এবং প্রতিপালিত দেখে এই ঐতিহ্যকে নিজের ঐতিহ্য বলেই মনে করি এবং এই ইতিহাসের সঙ্গে নিজের সত্তার এক বিরাটরূপকে প্রকাশ করে এবং নিজেকে তার মধ্যে মগ্ন, নির্বিষ্টচিত্ত ব্যক্তি হিসেবে বিকশিত হতে দেখি ।কিন্তু তার পরের স্তবক এনে দিল বনি আদমের পূর্ণতার এবং ধ্বংসের সংবাদ। মুসলিম সভ্যতা গ্রেকোরোমক সভ্যতা এবং ইরানী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব যেন ছিনিয়ে নিল। যে রূপকল্প দেওয়া হয়েছে তা আমাদের মনে একটি তীব্রশক্তির বৈপ্লবিক আচার ব্যবহারকে স্মরণ করিয়ে দেয় – আমিনা শুধু নবীর মাতাই নন, তিনি এই নতুন সভ্যতার প্রতীক – ‘ছিনিয়ে’ শব্দের মাধ্যমে সেই অপরিহার্য জয়ের মাধ্যমে সেই সভ্যতার বিকাশ দেখি।এই অবস্থার পরিবর্তন হল শেষ স্তবকে। আমাদের নবীর আগমনে মনে যেমন সম্পূর্ণতার আস্বাদ পাই, তেমনি মানুষের ইতিহাসের সমাপ্তির খবর পাই। স্ফিংকস এবং ড্রাগন প্রতীকের মাধ্যমে একদিকে রহস্যের অন্যদিকে ধর্মহীনতার অন্যদিকে শুধুমাত্র বুদ্ধিজাত সভ্যতার ইংগিত দেওয়া হচ্ছে ।সুতরাং রূহানী সান্ত্বনার বদলে অবচেতন মনে শঙ্কা, কঠিন ক্রুরতার অভ্যুদয়ে নতুন ধরনের অসহায়তার ভীতি মনে জাগে । সেই সঙ্গে মনে হয় যে প্রকৃতিকে ভালোবাসি তারও সমাপ্তি ঘোষিত হচ্ছে । তারও যেন প্রয়োজন নেই এবং তারাই যেন এই ক্রুর কঠিন সভ্যতার চক্রপিষ্ট অবস্থা থেকে মুক্তিকামী । ‘গোলাপে’ ‘সূর্যে ‘ তাই এই অবস্থা থেকে মুক্তি হওয়ার আগ্রহ । গোলাপ এবং সূর্য প্রকৃতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তারা সৌন্দর্যের এবং শক্তিরও প্রতীক ।

তবুও এই ধ্বংসও যেন ধ্বংস নয় -এ যেন বিধি রূপের অবসানে আল্লাহর মহান রূপের বিকাশ-যেমন সূরা আর রহমানে আল্লাহ বলেছেন -সমস্ত কিছু ধ্বংসীভূত হবে -বাকী থাকবে শুধু আল্লাহর পরম উজ্জ্বল চেহারা । এবং এখানেই মনে সান্ত্বনা জন্মে ।এই কবিতাটিকে তাই আমি সার্থক কবিতা বলেই স্থান দেব । একদিকে যেমন এর বিস্তৃতি রয়েছে তেমনি রয়েছে গভীরতা । যেমন একদিকে সমগ্র জীবন দর্শনের দার্শনিক তত্ত্ব এর মূলে রয়েছে তেমনি এ কবিতা পাঠকের হৃদয়ে অনুভূতি জাগ্রত করে অনুভূতিলব্ধ সত্য আয়ত্ত করতে অনুপ্রাণিত করে । তাছাড়া অযথা ছবি নেই ,অহেতুক এবং অতিরিক্ত কথন নেই এবং কোন মতবাদ প্রচার করার প্রয়াসও নেই । এখন তুমিই বুঝবে যে কথা বললাম তা কতদূর সত্য । হয়ত কবিতা রচনা করার সময় সচেতনভাবে এত কথা ভাবিনি । কিন্তু এখন ব্যাখ্যা করতে যেয়ে দেখছি এ কবিতা আরও গুরুতর ভাব উদ্রিক্ত করে ।প্রথম স্তবক পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানব জীবনের গূঢ় সত্যকে পাঠক গ্রহণ করে । আদম ,জুলেখা, ইউসুফ সত্যব্যক্তি ছিলেন কিনা এখানে সেটা বড় কথা নয় -বড় কথা হচ্ছে মানবাত্মায় যে অনন্তের আকাঙ্ক্ষা, চিরন্তনকে পাবার ব্যাকুলতা তার নিজের কারণেই যে সে ব্যকুলতা জন্মলাভ করেছে তা-ই পাঠকের মনে হবে -চিরকাল মানুষ ভুল করেই সত্য ভ্রষ্ট হয় -সেই সত্যই সে যাতাকলের কঠিন পীড়নের মধ্যে অনুভব করে । এ যেন কি কঠিন নিয়ম যার মধ্যে আমরা এখন বন্দী এবং মুক্তিকামী । অথচ মুক্তি নেই । এখানে সুন্দরের সঙ্গে সত্যের যেন সংঘর্ষ, কামনাবাসনার সঙ্গে ন্যায়ের এবং সত্যের, স্বার্থপরতার সঙ্গে স্বার্থলেশহীনতার যে দ্বন্দ্ব তারই চক্রান্তের মধ্যে আমরা বন্দী । জুলেখার কামনার প্রতি আকর্ষণ হয় ,তার জন্য দুঃখ হয় অথচ ইউসুফের কামনার উর্ধ্বে উঠার এবং তার মনিবের প্রতি সত্য ভ্রষ্ট না হওয়ার গৌরবকেও গ্রহণ করি -নিজেকে সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে পাই ।এর পরের স্তবক পাঠ করলে পাঠকের মনে একটি স্বস্তির ধৈর্যের এবং অস্বস্তির আভাস উদ্রিক্ত হবে । যেহেতু একমাত্র স্রষ্টাই সমস্ত- আদি ও অন্তহীন এবং আমাদের আদিও রয়েছে, অন্ত কোথায় জানি না সুতরাং এই পৃথিবীর বুকে আমাদের এই অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের গতিপথেই চলতে হবে -এটাই হচ্ছে এর সরল গতি ,আমাদের অন্ত আদিতে যেয়ে মিলবে তা ভাবতেই পারি না । কিন্তু এই ইতিবৃত্তের মধ্যে সান্ত্বনা এই যে এমন একজনের আবির্ভাব হয়েছে যিনি হচ্ছেন মানুষের এবং মানবসমাজের পূর্ণ পরিণত অবস্থার প্রতীক । ইতিহাসের বিবর্তন তার আবির্ভাবের কথা স্মরণ করে এক নতুন গর্ব এবং গৌরবের অংশ অন্তরে উপভোগ করি । প্রকৃতির প্রতীক হচ্ছে তারকাসূর্য এবং চন্দ্রমোহন ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব । এই সম্ভাবনাই প্রতীকি কবিতাকে নতুন নতুন মাধুর্য দান করে ।প্রশ্ন: আপনার দৃষ্টি আপনার কাব্য রচনার জন্য একটি দিকের প্রতি আকর্ষণ করতে চাই । কবি সৈয়দ আলী আহসান সাহেব আপনার কবিতা সংগ্রহ ‘সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা’র ভূমিকায় বলেছেন আপনি বাংলা কাব্যে ‘মনোলোগ'[Monologue] রচনা করে কাব্য ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন অবদান রেখেছেন অথচ এ ধরণের কবিতা আর রচনা না করার ফলে এই আঙ্গিকে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি বলে দুঃখ করেছেন । এ সম্বন্ধে আপনার কি বক্তব্য?উত্তর: ইংরেজি সাহিত্যে ব্রাউনিং ড্রামাটিক ‘মনোলোগ ‘ রচনা করেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বি এ অনার্সের ছাত্র ছিলাম তখন ব্রাউনিং আমার বিশেষ প্রিয় কবি ছিলেন । নিশ্চয়ই তারই প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই আঙ্গিকে কাব্য রচনা করি ‘জন্মদিন’ সেদিক থেকে সার্থক কবিতা বলেই মনে করি । এখনো পড়ার পর তাকে সার্থক বলেই মনে হয় । কিন্তু এম. এ পড়ার সময় টি. এস. এলিয়ট এতটা প্রভাব বিস্তার করেন এবং তারপর তাসাউফের পথে দ্রুতপদচারণা আমাকে এমন এক রাজ্যে নিয়ে গেল যে গীতিকাব্য এবং দার্শনিক এবং আত্মিক অভিজ্ঞতা মূলক কাব্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলো। হয়তো সেজন্য জন্মদিনের মত নাটকধর্মী লেখার প্রতি আকর্ষণ অনেকটা কমে গেল।কমে গেলেও দূর হয়নি । তার প্রমাণ হচ্ছে” বিদায় বেলায় “কবিতাটি । এটাও একটি নাট্যধর্মী মনোলোগ । কয়েকমাস আগেই লিখেছি এবং তা “কলমে” ছাপাও হয়েছে ।আর একটি বড় কাব্য রচনা করেছি,তার মধ্যে মনোলোগ ,ডায়ালোগ, গীতিকবিতা ,কাহিনীকাব্য – সবগুলোর মিশ্রণ থাকবে -এর নাম হচ্ছে লায়লা মজনু । মনোলোগ মধুসূদন রচনা করে গেছেন- ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য ‘।সার্থক মনোলোগ -‘দশরথের প্রতি কৈকেয়ী ‘একটি সার্থক ড্রামাটিক মনোলোগ । মধুসূদনের পর আমিই আবার তাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষুদ্র চেষ্টা করেছি । রবীন্দ্রনাথের ‘কর্ণ -কুন্তী সংবাদ’ পড়লেই বোঝা যায়- ইচ্ছে এবং চেষ্টা থাকলে তিনি সত্যি সত্যিই বিরাট মহাকাব্য এবং কাব্যনাট্য  [poetic drama] রচনা করতে পারতেন ।কিন্তু তিনি চলে গেলেন গীতিকবিতার লালিত্যের আওতায় । তাই বলতে পারি মধুসূদনের পর কেউ এই নাট্যধর্মী মনোলোগ রচনা করেননি । সে হিসেবে ভাইজানের মন্তব্য গভীরভাবে প্রণিধানযোগ্য ।সত্যি কথা বলতে গেলে প্রতিটি কবিই নাট্যকারের স্বভাবধর্মী, প্রত্যেক কবিই তার অনুভূতিলব্ধ সত্যকে প্রকাশ করেন কখনও ‘আমি’র মাধ্যমে কখনও অন্য কোন চরিত্র বা ঘটনার বা কাহিনীর মাধ্যমে । সেই ‘আমি’ কে ও কবি দেখেছেন দূর থেকে ।

প্রশ্ন:  কবিতায় আঙ্গিক অনুসরণ কিংবা আঙ্গিগক রচনার তাগিদটাকে আপনি কিভাবে দেখেছেন ?বাংলা কবিতার আঙ্গিকের বিশেষ স্বাতন্ত্র্য বা বৈশিষ্ট্য গুলো কি ?উত্তর: এ – প্রশ্ন দুটির জবাব দিতে হলে সর্বপ্রথম অনুরোধ করব , কাব্যের আঙ্গিকের উপর যে প্রবন্ধ লিখেছিলাম- যা বাংলা একাডেমী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তা যেন সবাই পড়েন । সেখানে আমি দেখিয়েছি যে আঙ্গিক নির্ভর করে সাহিত্যের ঐতিহ্যের উপর ,লেখকের জীবন-উপলব্ধির উপর এবং সাহিত্য পরিবেশনের ব্যবস্থার উপর । মহাকাব্যের যে ক্ল্যাসিক্যাল রূপ দেখতে পাই তা গড়ে উঠেছিল লেখকের কাহিনীকাব্য রচনার বিশিষ্ট ক্ষমতার মাধ্যমে । ‘ইলিয়ড’লেখার পূর্বে পাশ্চাত্যে মহাকাব্য কেউ রচনা করেছিল কি-না তা কেউ জানে না । মনে হয় লেখকই এই কাহিনী কাব্য রচনার একটি বিশিষ্ট ধারার প্রবর্তন করেন । তার বহুদিন পর ত্ররিস্টেটল মহাকাব্যের আঙ্গিক সম্বন্ধে আলোচনার সময় হোমারের ইলিয়াডকে আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছেন । সংস্কৃত মহাকাব্য রচনার দুটো ধারা দেখি -মহাভারত মনে হয় শুধু ব্যাসের সৃষ্টি নয় ,অন্য লেখকের দান রয়েছে । এক কাহিনীর ভিতর অন্য কাহিনী সংযোজিত করে দেওয়া হয়েছে । রামায়ণ বাল্মীকির সৃষ্টি । তার মধ্যে ব্যাপকতার সঙ্গে সংহতি রয়েছে । মহাকাব্যের আঙ্গিক কি হবে এই কাব্য রচনার পরে সমালোচকরা সে সম্বন্ধে নির্দেশ দিয়েছেন । এই বিশেষ নির্দেশনা থেকেই উদ্ভূত হয়েছে ‘ক্লাসিকাল ‘ধ্যানধারণা ।সনেট রচনার বেলায়ও সমালোচকদের ধ্যানধারণার ভিত্তির উপর এ কাব্য- আঙ্গিক উদ্ভূত হয়নি । পেত্রার্ক সনেট রচনা করেছেন এবং তার ফলে একটি বিশেষ আঙ্গিকের উদ্ভব হয়েছে । সেই আঙ্গিককে কিছুটা পরিবর্তন করলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগের ইংরেজ কবিরা -যার মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছেন শেক্সপীয়র । এই পরিবর্তন সাধনের মূল কারণ হচ্ছে ভাবাবেগ প্রকাশের ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা । বাংলা কাব্যের আঙ্গিকের মূলে রয়েছে গীত রচনার উদ্যম, আকাঙ্ক্ষা এবং কাহিনী বলার প্রয়াস । তার ফলে বৌদ্ধ গান দোহার উৎপত্তি; বৈষ্ণবকাব্যের রূপরেখা এবং অন্যদিকে লৌকিক কাহিনী কাব্য এবং কাহিনী গীতিকা এবং হিন্দু কবিদের লিখিত মঙ্গলকাব্য ,মহাভারত এবং রামায়ণ এবং মুসলমানদের লিখিত কাহিনী কাব্য । এই সমস্ত কাব্যের আঙ্গিক সম্বন্ধে আলোচনা এখানে অবান্তর । এসবের উল্লেখ করছি এই জিনিসটি বোঝানোর জন্য যে উনিশ শতাব্দীতে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যের আঙ্গিকে আমূল পরিবর্তন এলো । তার অর্থ পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে নতুন ভাবধারার নির্ঝরিণী নতুন পথের সন্ধান দিল । নতুন ভাবধারা বলতে নতুন ভাবে মানবজীবনকে, প্রকৃতিকে এবং মানুষে মানুষে সম্পর্ককে আমরা দেখতে শিখলাম আর সেই সঙ্গে সঙ্গে নতুন আঙ্গিকের সন্ধান পেলাম । মাইকেল শুধু মহাকাব্যের আঙ্গিককেই বদলে দিলেন না ,কাব্যরচনার মূল হাতিয়ার -পয়ার ছন্দকে অমিত্রাক্ষর ছন্দে পরিণত করে দিলেন । অথচ সংস্কৃত মহাকাব্যের উদ্বোধনী অংশকে মিল্টনের পদ্ধতিতে পরিবর্তিত করলেন যদিও হিন্দু দেবী ‘অমৃতভাষিনী'[সরস্বতী]র সাহায্য প্রার্থনা করে কিছুটা রামায়ণের এবং মঙ্গলকাব্যের ঐতিহ্য বজায় রাখলেন । মুসলমান কবিরা যেমন কায়কোবাদ মুসলিম কাব্যকাহিনীর ঐতিহ্য কিছুটা বজায় রেখে হামদ-না’তকে সংক্ষিপ্ত করে প্রারম্ভিকা দিলেন । কিন্তু মাইকেলের রচনার পর পুরনো হামদ না’ত লেখার তরিকা এবং পীরের স্তুতি রচনার ধারায় আমূল পরিবর্তন এলো । তাছাড়া পাশ্চাত্য কাব্য নাট্য ধারার প্রভাবে -বিশেষত শেক্সপীয়রের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে মাইকেল চাইলেন সেই ধরণের কবিতা রচনা করতে -তাই বীরাঙ্গনা কাব্য রচনা করতে চাইলেন -দশরথের প্রতি কৈকেয়ী ইত্যাদি নাট্যধর্মী monologue -এর সম্পূর্ণ নতুন ধারা বাংলা সাহিত্য প্রবিষ্ট হল ।আমি সেই ধারাকেই পুনরুজ্জীবিত করার আকাঙ্ক্ষায় dramatic monologue  রচনা করলাম ইংরেজ কবি ব্রাউনিংকে অনুসরণ করে । এ ধারা নতুনভাবে কাব্য নাট্য রচনা করতে সাহায্য করবে এই আমার আশা । কয়েকমাস পূর্বে কলম পত্রিকায় আমার এই ধরণের একটি কবিতা ছাপা হয়েছে ।আমার নিজের ক্ষেত্রে এই নাট্যধর্মী অথচ গীতিময় ধারাকে অনুসরণ করেই ‘বসন্ত ‘ কবিতাটি রচনা করি । এখানে কবি ‘আমি’কে বাদ দিয়ে একটি অবজেকটিভ চরিত্রের সম্বন্ধে তার মনোভাব যেন প্রকাশ করতে চেয়েছেন । বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে ‘আমি’র চর্চা অতিরিক্ত প্রশ্রয় পায় । অথচ রবীন্দ্রনাথ কথা ও কাহিনীতে যেমন সংক্ষিপ্ত ছোটগল্পের মত ক্ষুদ্রায়তনে একটি বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ভাবের দ্যোতনা দিলেন এবং কর্ণকুন্তি সংবাদ ইত্যাদি ক্ষুদ্র নাট্যসংলাপের মাধ্যমে কাব্য নাট্যের যে ধারা প্রচলিত করলেন বর্তমান বাংলা সাহিত্যে তার বেশি প্রভাব দেখি না । এদিকে আমি তরুণ কবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই ।প্রশ্ন:  আপনার কবিতায় শব্দ ব্যবহারের কোন স্বাতন্ত্র্য কিংবা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সচেতন প্রয়াস আছে কি ?উত্তর:  আছে । প্রথম প্রয়াস হচ্ছে স্বল্প কথনের মাধ্যমে ‘বহু’ র আভাস বাঙময় করা । তাই আবেগের গভীরতা প্রকাশ করার চেষ্টা রয়েছে ,উচ্ছলতা নেই । এরই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে অন্তরের আবেগ বাহ্যিক চিত্রকল্পের মধ্যে আরোপ করা । চিত্র শুধু ইন্দ্রীয়গ্রাহ্যই থাকে না , মানসিক অবস্থার দিকে পাঠকের মনকে টেনে নেয় । “বিসংগতি ” কবিতাটিই ধরা যাক ।                     

ঝাঁ ঝাঁ দুপুরের মাঠে ভরামন আউষের সোনা             

আউষের সোনা অর্থ ধান যা স্বর্ণের মত মূল্যবান কিন্তু এখানে ‘মত ‘ শব্দটি ব্যবহার না করার ফলে চাষীদের জন্য, সবার জন্যই যে অসম্ভব মূল্যবান বস্তু তারই ইঙ্গিত পাই । কিন্তু তার পূর্বে ‘ভরামন’ শব্দটি তৈরি করা হয়েছে বিশেষণরূপে । যার অর্থ যে ‘সোনা’ দেখলেই মন ভরে যায় । নতুন শব্দ তৈরি করে সংক্ষেপে ধানের বাহ্যিক সোনালী রূপের থেকে দৃষ্টিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আভ্যন্তরীণ অনুভূতির দিকে । ঝাঁ ঝাঁ কেও বিশেষণরূপে ব্যবহার করে তীব্র রৌদ্রপীড়িত মাঠ দেখে দেহমন ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠার বর্ণনা করা হলো । তার পরপরই বলা হচ্ছে:                 

 ভাঙ্গামন জোড়া                   

তীক্ষ্ম চিল ;           

চিলতো তীক্ষ্ম নয় ,চিলের আওয়াজটিই তীক্ষ্ম । চিলের সত্তা যেন তার তীক্ষ্ম আওয়াজের মাধ্যমে ভাঙ্গামন জুড়ে বসল । তারপর বলা হচ্ছে:
                      বিরহ সমৃদ্ধি ঘন কুহু,কুহু,কুহু           

অর্থাৎ কোকিলের ডাক মনে যে প্রিয়ার বিরহের অনুভূতি জাগ্রত করে এবং গভীরতা দান করে । বাহ্যিক প্রকৃতির বর্ণনা তাই বাহ্যিক রূপের দিকেই শুধু মনকে আকর্ষণ করে না এই রূপ দেখার বা শোনার ফলে মনে যে অনুভূতি উদ্রিক্ত হয়েছে তার দিকে কবিতা পাঠকের চেতনাকে এবং অনুভূতিকে পরিচালিত করছে । একদিকে যেমন বাহ্যিক প্রকৃতির রূপও ফুটেছে অন্যদিকে সেই চিত্র পাঠকের মনকে অনুভূতির রাজ্যে উত্তীর্ণ করছে ।যেমন-           

নিতল দীঘির পদ্মে বৃন্ত কাঁপে           

হৃদয়ের ;প্রচ্ছন্ন খালের নীচে রহস্যবিলাসী           

ভয় ;ধাণ্যতৃপ্ত মাঠের মান্দুরা ।অন্তরীক্ষ ভরা           

নদীর চাঞ্চল্যকলা ।ছায়াঢাকা পুকুরের চোখ         

প্রকৃতির সঙ্গে কবিসত্ত্বার সম্পূর্ণ একাত্মতার রূপ এখানে ফুটে উঠেছে । পদ্মের বৃন্ত শুধু কাঁপছে না ,কবির হৃদয়ও কম্পিত হচ্ছে রহস্যময় অস্তিত্বের অনুভূতিতে । ভয়কে রহস্যবিলাসী আখ্যায় বিভূষিত করার অর্থ কবিমন যে রহস্যের সন্ধান পেয়ে ভীতি এবং রোমাঞ্চের কম্পন অনুভব করেছেন তার উৎপত্তি অর্পিত করছেন মানসিক ভীতির উপর যা প্রচ্ছন্নতার অন্ধকার হৃদয়ে উদ্রিক্ত হয় ।ধানক্ষেতের [পূর্ব উল্লেখিত সোনাধান) সোনালী বিস্তৃতি কবিমনে যে তৃপ্তির আস্বাদন জাগিয়েছে সে তৃপ্তি যেন প্রাকৃতিক এই অবস্থার মধ্যে নিহিত রয়েছে ।  তাই মাঠের মধ্যে বায়ুর সঞ্চালনে যে মন্দুরা ধ্বনিত হচ্ছে তার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি সেই তৃপ্তিকে প্রকাশ করছে । সেই কবি সত্ত্বার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পূর্ণ একাত্মতার রূপই আরো সুস্পষ্ট হল পরের চিত্রে- ‘অন্তরীক্ষ’ ভরা শব্দের মাধ্যমে । অর্থাৎ কবির অন্তরের অন্তরীক্ষ এবং নদী এক হয়ে গেছে । ফলে নদীর ‘চাঞ্চল্য কলা’ সেই অন্তরেরই আনন্দানুভূতির চাঞ্চল্য । চাঞ্চল্যের সঙ্গে ‘কলা ‘ যুক্ত হওয়াতে নদীর এই রূপের মাধ্যমে যে আনন্দময় শিশুসুলভ নৃত্যের সরল ঠিকানা রয়েছে কবির মনে সেই একই আনন্দের স্ফূরণ প্রকাশিত হচ্ছে । এই একাত্মতা প্রকাশের প্রচেষ্টায় বহু নতুন সংযুক্ত শব্দে উদ্ভাবনা করেছি । যেমন রূপবাংলা কবিতাটিতে- ‘আলোচুপ’ ‘মেঘানিল’ ‘পাটশাড়িসুর’ ‘সন্ধ্যামুখর’ ‘ধানখুশি’ ‘গানখুশি’ ।             

এ ছাড়া বাংলা কবিতায় ভাব প্রকাশের উৎসমূল আরো সমৃদ্ধশালী করার জন্য নজরুল মুসলিম তহজিব- তমদ্দুন , ইতিহাস এবং মুসলিম সমাজ জীবন থেকে চিত্র, প্রেক্ষা, উৎপ্রেক্ষা, উপকথা  এবং কাহিনীর সন্ধান করেছেন । আমি সেই ধারাকে নতুনভাবে জীবিত করার চেষ্টা করেছি ।আমার রূবাইয়াতে জহীনি বইটিতে শুধু যে ফার্সি রূবাই’কে নতুভাবে বাংলাসাহিত্যে স্থান দিতে চেষ্টা করেছি তাই নয় আরবী -ফার্সী -উর্দু-হিন্দী থেকে নানা শব্দ, উৎপ্রেক্ষা, উপমা এবং চিত্রবাংলার চিত্র এবং ভাবধারার সংগে মিলিত করে রূহানী প্রেম পথের বিচিত্র অবস্থা রূপায়িত করেছি । যারাই এই কাব্য পড়েছে তারা সবাই একবাক্যে বলেছে যে আরবী,ফার্সী ,হিন্দী শব্দের ব্যবহারের অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হয়েছে । কোথাও তাদের মনে হয়নি যে জবরদস্তি কিছু করেছি । নজরুল যেমন এদিক দিয়ে সার্থকতা অর্জন করেছিলেন ,আমিও মনে করি এই ভাষাভাবকে সার্থকভাবে প্রকাশ করে আমিও তৃপ্ত । বাংলা ভাষাকে এভাবে সমৃদ্ধ করার ব্যপারে আরো কবি এগিয়ে আসুক তাই আমি চাই ।আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রচেষ্টা তাই প্রশংসনীয় ।

প্রশ্ন:  আপনার কবিতায় দেখা যাচ্ছে যে আঙ্গিকের দিক থেকে আপনি ত্রিশ বা ত্রিশ- উত্তর আধুনিক ধারাটাকে অনুসরণ করেছেন অপরদিকে বিষয়ের ক্ষেত্রে সনাতন কিংবা ধর্মীয় বিষয় সমূহকে গুরুত্ব দিয়েছেন । আপনি কি মনে করেন এতে আধুনিকতার মানদণ্ড ক্ষুণ্ণ হয়েছে বা একজন পাঠক আধুনিক রুচি ও প্রত্যাশা নিয়ে আপনার কবিতা পাঠে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন বা মোহিত হতে পারেন ?               

উত্তর:  সনাতন বা ধর্মীয় বিষয় বললে মনে হয় ধর্মসম্বন্ধীয় কোন বিষয় । আমি কবিতা লিখেছি মানবাত্মা আধুনিক জীবনের বৈচিত্র্য এবং ইমান-বেঈমানের দ্বন্দ্বের ভিতরে পর্যুদস্ত এবং বিপন্ন হয়ে যে মুক্তির সন্ধান করছে সেই দ্বন্দ্ব এবং মুক্তির স্বরূপ উদ্ভাবন করার জন্য । মানবাত্মায় ভালমন্দের দ্বন্দ্ব চিরন্তন এবং ন্যায়, সত্য, সুন্দর, মঙ্গলময়তা, দয়া ,দাক্ষিণ্য, বীরত্ব, আত্মত্যাগ, স্বার্থলেশহীনতা -এই মূল্যবোধ সনাতন এবং চিরন্তন এবং এ গুলোর ঐতিহ্য এবং মর্যাদা স্বতঃসিদ্ধ ব্যপার । এই সনাতন এবং চিরন্তনের মানদণ্ড আধুনিকতার দোহাই দিয়ে যারা বিপন্ন করে বা পরিত্যাগ করে তারা আত্মিক অমঙ্গল ডেকে আনে- সেই অমঙ্গলও আমি বহুক্ষেত্রে রূপায়িত করেছি ।

বর্তমান বিশ্বে এই অমঙ্গলের ভয়াবহতা অপরিসীম ।সুতরাং কোন পাঠক যদি সত্যিকারের জীবনোপলব্ধি চায় তাহলে আধুনিকতার বাহ্যিক Superficial দিক নিয়ে তাকে সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ নয় ।T. S. Eliot- এর মতে ‘ওইস্টল্যান্ড’কে আধুনিক কবিতার প্রকৃত প্রকাশ বলে কবিরা গ্রহণ করেছেন।কিন্তু আধুনিক এই কবিতায় জীবনোপলব্ধির যে মানদণ্ড রয়েছে তা হচ্ছে সেই সনাতন চিরন্তন মূল্যবোধ যা মূলত তিনি খ্রিস্টান ধর্ম থেকে পেয়েছেন । সেজন্য কোন আধুনিক রুচিসম্মত পাঠক হোঁচট খায় না । ‘ওইস্টল্যান্ড ‘ থেকেও অনেক মহৎ কাব্য হচ্ছে ‘ফোর কোয়ার্টারস’ যার জীবনোপলব্ধি সম্পূর্ণভাবেই ধার্মিক । অথচ কাব্যের আঙ্গিক এবং প্রকাশভংগি সম্পূর্ণভাবেই আধুনিক ।

কাব্যে আধুনিকতা অর্থ- বর্তমান জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে সনাতন চিরন্তন মানবতার উপলব্ধিকে প্রকাশ করতে হলে এবং পাঠকের অনুভূতিকে সেই সনাতন চিরন্তন মূল্যবোধের মানদণ্ডকে মানিয়ে নিতে হলে এমনভাবে তাকে প্রকাশ করতে হবে যার ফলে জীবনের সেই ধর্মভিত্তিক মানদণ্ড সম্বন্ধে যে ব্যক্তি সন্দিহান তারও মনে নতুন অনুভূতির অভ্যুদয় হবে । এই জন্যই নতুন আঙ্গিকের ,নতুন রূপকের ,নতুন প্রতীকের প্রয়োজন পড়ে ।

T. S. Eliot তাঁর কাব্যে সার্থকতা অর্জন করেছেন এমন সমস্ত প্রতীক ব্যবহার করে যার ধার্মিক ঐতিহ্যগত অর্থ রয়েছে অথচ তার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে বর্তমান জীবন উপলব্ধির বিচিত্র রস ।এদিক দিয়ে আমার কবিতায় T.S. Eliot – এর প্রভাব দেখতে পাবে । ‘বনি আদম ‘দেখলেই দেখা যাবে এর ভিতরে বিভিন্ন culture থেকে আহরিত অর্থবোধক প্রতীক রয়েছে । এমনকি এক জায়গায় বদলেয়ারের কবিতার প্রভাবও দেখা যায় । অথচ কবিতাটি পড়লে মনে হয় এই সমস্ত culture- এর এবং বর্তমান জগতে বিভিন্ন বৈষম্য- দ্বন্দ্বের ভিতরে মানব সমাজের যে একই রূপ নিহিত রয়েছে তাই যেন প্রকাশ করার চেষ্টা হয়েছে । সুতরাং এই কবিতা পড়ে কারো হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। যেমন ধর ‘দজ্জাল’ কবিতাটির রূপকল্প এবং প্রতীক নেয়া হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতি থেকে কিন্তু কবিতাটি বর্ণনা করছে বর্তমান বিশ্বের সর্বনাশ এবং সংঘাত ।তবে এ কথা সত্য,  আমি সম্পূর্ণভাবে সূফী সাধকের উপলব্ধিকে কিছু কাব্যে ব্যক্ত করেছি । বিশেষ করে ‘হিজরত’ কবিতাটিতে এবং ‘রূবাইয়াত এ জাহিনী ‘ বইটিতে । এগুলো উপলব্ধি করতে হলে সেই ধরণের সচেতনতা দরকার যা হয়ত অনেকের পক্ষে সম্ভব নয় ।

প্রশ্ন:  সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় বিশ্বাস সচেতনতার দিক থেকে যে শূন্যতা লক্ষ্য করা যায় অর্থাৎ নজরুল- ফররুখ ভাবধারার অভাবটাকে আপনি কিভাবে দেখেন ?বিশেষ করে আপনার নিজের কবিতা রচনার আদর্শের মানদণ্ডে?               

উত্তর: সাম্প্রতিক বলতে যদি গত ত্রিশ বছরের কথা বলো তাহলে দুটো ধারা বিশেষভাবে লক্ষণীয় । একটি হচ্ছে বিশ্বাসহীন, ধর্মহীন । সুতরাং নিজস্ব কৃষ্টির মূল মানদণ্ড সম্বন্ধে আস্থাহীন নতুন মানবতাসন্ধানী এক ধরণের কবিতা আর দ্বিতীয়টি ধর্মের মূলগত যে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি সেই উপলব্ধি ভিত্তিক মানবতার চিরন্তন মানদণ্ডকে নতুনভাবে সাহিত্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা । অমিয় চক্রবর্তী যেমন অত্যাধুনিক হয়েও বিশ্বাস সচেতন আমিও তেমনি আধুনিক বিভ্রম এবং বিভ্রান্তিকে জানার জন্যই ধর্মের আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে একান্তভাবে প্রয়োজনীয় মনে করি । আমার কবিতায় তুমি তারই স্বাক্ষর দেখতে পাবে ।

প্রশ্ন: আপনার ধর্মভিত্তিক কয়েকটি কবিতায় কিছু ধর্মীয় শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার রয়েছে যেগুলোকে বাংলা কাব্য ভাষা বলে মনে হয় না , মনে হয় শুধু মাত্র ধর্মীয় আবেগ থেকেই এইসব আয়াত কিংবা শব্দ গুলোকে ব্যবহার করেছেন যা কাব্যস্বাদ গ্রহণ করতে বাধা দেয়,এরকম অভিযোগ হলে আপনি কি বলবেন ।           

উত্তর:  তুমি যেকথা বলছ একথা ‘রূবাইয়াত  এ জহিনী ‘ যারা পড়ে তারা কেউ বলে না । সেখানে ভাষা ,ভাব ,অনুভূতি, ছন্দ এবং ব্যঞ্জনার সমন্বয় সাধন রয়েছে । অথচ আরবী,ফারসী, হিন্দী, সংস্কৃত ইত্যাদি বহু শব্দের প্রয়োগ রয়েছে । তেমনি ‘ আসফালা সাফেলীন’ কবিতায় বহু শব্দ, রূপকল্প ,প্রতীক কুরআন শরীফ থেকে নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে । কিন্তু যেহেতু সম্পূর্ণ কবিতাই একটি প্রার্থনা এবং যেহেতু ছন্দের তীব্রগতি সঞ্চালনের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে সেই সমস্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তাই সেই শব্দ গুলো কখনো কাউকে হোঁচট খাওয়ায় না । তাছাড়া ঐ শব্দ ছাড়া ঐ মনোভাব ব্যক্ত করা অসম্ভব । যেমন রবীন্দ্রনাথ ‘শিশুতীর্থ’ কবিতায় হিন্দু ভক্তি, পূজা অর্চনার রূপকল্প ব্যবহার করেছেন এবং সেই সমস্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন যা হিন্দু সমাজে ব্যবহৃত হয়-যখন তারা আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারণা প্রকাশ করতে চেষ্টা করে । তেমনি আমি আধ্যাত্মিক একটি মনোভাব প্রকাশের জন্য সেই সমস্ত শব্দই ব্যবহার করেছি, যা মুসলমান সমাজে প্রচলিত । সুতরাং কোন মুসলমানের পক্ষে এই শব্দ ব্যবহারকে অযাচিত বা অবাঞ্ছিত মনে করা অসম্ভব । বরঞ্চ এই শব্দ গুলো ব্যবহার না করলে সেই অনুভূতি জাগ্রত হবে না যে অনুভূতি প্রকাশ করার জন্যই এ কবিতা লেখা । আমি সেই একই কথা বলব হিজরত কবিতায় ব্যবহৃত আরবী, ফারসী শব্দ সম্বন্ধে ।

প্রশ্ন: কবিতা রচনার আঙ্গিকগত শিল্পমান বা বিষয়গত মানদণ্ড সম্পর্কে আপনার পঞ্চাশ দশকীয় আর আজকের নব্বই দশকীয় বিশ্বাসের কোন বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা আছে কি ?         

উত্তর: ভিন্নতা রয়েছে । পঞ্চাশ দশকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি মূলত এরিস্টটলিয়ান ছিল । আর সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কোলরিজের ধ্যান- ধারণা ।সত্তর দশক থেকে প্লেটো, ব্লেইক ,এর্কহার্ড- এদের ধ্যান-ধারণা নতুন করে পড়তে শুরু করি এবং সাহিত্যের সঙ্গে ধর্মের কি নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে তাও নতুনভাবে ভাবতে শুরু করি । তারই ফলে নতুন তত্ত্বের অভ্যুদয় হয় ,আমার ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি লেকচারে প্রকাশিত হয়েছে এবং ইংরেজী দুটি বইয়ে ছাপা হয়েছে । মূল তফাৎ হচ্ছে এই ,পূর্বে সাহিত্য ছিল একটি আনন্দদায়িনী স্বনির্ভর সত্তা । আর এখন সাহিত্য হয়েছে মহৎ চিরন্তন সত্যের ব্যক্তিগত উপলব্ধির সীমাবদ্ধ বিকাশ ।

প্রশ্ন: কথাশিল্পী আবু রুশদ আপনার কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে জানিয়েছেন, আপনি ব্যক্তিগত প্রেম থেকে বঞ্চিত নন । এই ব্যক্তিগত প্রেমের স্বরূপ কি ? এই প্রেমানুভূতি বা প্রেমঅভিজ্ঞতা কবিতা রচনার জন্য বাড়তি কোন যোগ্যতা কি ?যা কবিতার শিল্পমান কিংবা বিষয় সৌন্দর্যের সঞ্চার ঘটায় ?         

উত্তর: কোন কোন লেখক যা কিছু লেখেন না কেন তার সবই তখনই সত্যিকারের সাহিত্য হয় যখন তার মূলে থাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা । শেক্সপীয়রের নাটক রচনার মূলেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজ করেছে । কিন্তু কিভাবে যে করেছে তা কেউ বুঝতে পারে না । তার কারণ শেক্সপিয়রের জীবনী সম্পর্কে আমরা প্রায় অজ্ঞ । এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনেক সময় দেখার মধ্যে,শোনার মধ্যে এবং জীবনের বিচিত্র গতি -প্রকৃতির মধ্যে বন্ধু- বান্ধব, আত্মীয়- স্বজন, এবং দেশ-বিদেশের বিচিত্র ঘটনার মধ্যে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না থাকলেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত থাকার ফলেই কবি কাব্য রচনা করতে পারেন । আমার কবিতা রচনায় এই বিশেষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনেকটা নাটকীয় ভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি । সেই জন্য Dramatic monologue – এর আশ্রয় নিয়েছি । এর অতিরিক্ত আমি কিছু বলতে চাই না । আর একটি কথা বোঝা দরকার । মানবিক প্রেম এবং ঐশীপ্রেম এ দুয়ের প্রকাশ আমার কাব্যে রয়েছে এবং মানবিক প্রেম থেকে ঐশী প্রেমের পথে যে যাত্রা এবং যে নতুন রূপ তা ‘রূবাইয়াত এ জহিনী’-তে ভালভাবেই প্রকাশ করেছি ।


প্রশ্ন: সাম্প্রতিক কবিতা পাঠ করে নিজের কবিতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি ? আপনি কি মনে করেন আপনার কবিতা গুলো সাম্প্রতিক কবিতাধারারই অগ্রবর্তী?                 

উত্তর: সাম্প্রতিক শব্দ দ্বারা যদি ইংরেজী Contemporary শব্দটি বোঝায় তাহলে যা কিছু এক সময়ে লিখিত হয়েছে তার সব গুলোই সাম্প্রতিক । এজন্যে ইংরেজীতে কখনো ‘Contemporary ‘ শব্দ দ্বারা কাব্যরচনার ধারা নির্ণয় করা হয় না । ইংরেজীতে বর্তমান শতাব্দীর প্রথমদিকে ‘Victorian ‘ এবং তারই নব্বই দশকের কবিতার স্থলে নতুন যে কাব্যধারা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হলো তাকে আখ্যা দেয়া হলো ‘Modern’ । আমরা ত্রিশ থেকে চল্লিশ দশকে সেই আধুনিকতাকে অনুসরণ, অনুকরণ করতে চেষ্টা করেছি । ত্রিশ দশকের শেষাশেষি ফরাসী কাব্য সাহিত্যের Symbolism এবং Surrealism বা পরাবাস্তববাদের প্রভাব পরিলিক্ষত হয় । কিন্তু এসবই ছিল সাময়িক । বর্তমান বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কাব্য সাহিত্যে এ সমস্ত ধারা আনার অনেক চেষ্টা চলছে । কিন্তু এগুলো টিকবে না যেমন ইংরেজী সাহিত্যেও তা টেকেনি । তার কারণ এর মূলে জীবনের সত্যিকার কোন অভিজ্ঞতা নেই যে অভিজ্ঞতাকে চিরন্তন সত্যের একটি ঝিলিক বলে মেনে নিতে পারি । আসলে সত্যের উদঘাটন করবে কে ?একমাত্র মানবের অন্তরাত্মায় সত্যের প্রতিফলন তখনই সম্ভব যখন আত্মার চোখ উন্মুক্ত হয় এবং চোখ উন্মুক্ত তখনই হয় যখন চির সত্য যা হচ্ছেন আল্লাহ- তার সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় হয় । সুতরাং এই ধরণের সাম্প্রতিক কবিতার গতিভঙ্গিকে আমি বিশেষ উচ্চস্থান দিতে রাজি নই । বরঞ্চ অমিয় চক্রবর্তী যেভাবে বিশ্বাসের গভীরতার মধ্যে আত্মসমর্পণ করেও ভাষা ,ছন্দ, রূপকল্প এবং প্রতীকের মাধ্যমে যে কল্পলোক সৃজন করতে সক্ষম হয়েছিলেন আমি তাকেই বলব আধুনিকতা । তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার ছন্দ, রূপকল্প এবং প্রতীকের সত্যিকার উদ্যোক্তা । আজ পর্যন্ত তার চেয়ে বেশি আধুনিক কোন কবি হতে পারেননি । আমি সেই ধারাই অনুসরণ করে চলেছি । তবে অমিয় চক্রবর্তী অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু সমাজ থেকে আহরিত রূপকল্পের চর্চা করেছেন  আর আমি মুসলিম সূফী ভাবধারার ভিতরে নিমজ্জিত হয়ে তার মাধ্যমে বিভিন্ন নতুন রূপকল্প বাংলাকাব্যে আমদানি করতে চেয়েছি । তার সঙ্গে সঙ্গে টি. এস. এলিএট- এর এবং ইয়েটস-এর মিশ্রিত প্রভাব আমার কাব্যে পড়েছে । আর তার সঙ্গে রয়েছে রুমীর এবং ফরিদউদ্দীন আত্তারের গভীর জীবন জিজ্ঞাসা এবং চিরন্তনের অন্বেষা,ছন্দ ,অনুপ্রাস ,যমকশব্দের ধ্বনিগত সম্পদকে নতুন করে ব্যবহার করার যে চেষ্টা রবীন্দ্রনাথ থেকে বাংলাসাহিত্যে শুরু হলো পাশ্চাত্য কবিদের প্রভাবে সেই চেষ্টা আরও দূর অগ্রসর হয়ে যায় । আমার কবিতায় সেই প্রচেষ্টা রয়েছে তাই যে কোন পাঠক পুরনো কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে আমার নতুন কবিতায় অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নতুন ধরনের গতি ও আকুতির ,রূপকল্পের ,ছন্দ ও ব্যঞ্জনার সন্ধান পাবে । তবে আমি মনে করি , বাংলা ভাষায় আদি থেকে যে মূল ছন্দের ধারা চলে এসেছে সেই দুয়ের আর তিনের চালকে অস্বীকার করা বা ভুলে যাওয়া আমাদের ভবিষ্যত কাব্য রচনার জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর ।

প্রশ্ন:  আধুনিক কবিতার সরাসরি ছন্দ নেই । যেটা আছে সেটা খুবই কৌশলী ছন্দ । আপনি কি মনে করেন কবিতায় আঙ্গিক বৈচিত্র্যের মেরুকরণে কবিতায় আবার সরাসরি ছন্দের প্রসার ঘটবে কিংবা ঘটবে না বা বর্তমান ধারারই বিকাশ বা সংরক্ষণ হবে ?              উত্তর: একথা ভুল যে আধুনিক কবিতায় কোন ছন্দ নেই । গদ্য কবিতায় গদ্যছন্দ কিন্তু গদ্যকবিতাই বা গদ্য ছন্দই আমাদের আধুনিকতার নমুনা নয় । যা মূলধারা তা হচ্ছে আমাদের বিশিষ্ট ছন্দের ভিতরে কথোপকথনের ঝঙ্কার ফুটিয়ে তোলা । মাইকেল যা চেষ্টা করেছিলেন সেটাই হচ্ছে সত্যিকার কৃতিত্বের লক্ষণ । যারা ছন্দকে ছেড়ে দিয়ে ছন্দহীন কবিতা লিখতে চেষ্টা করেন তাদের অনেকেরই ছন্দ সম্বন্ধে কোন জ্ঞানই নেই । তাছাড়া অনেকেই তাদেরই কবিতা পড়তে দিয়ে আমি শুনেছি তারা ঠিকমত পড়তে পর্যন্ত জানে না । ফলে ভাষার ভিতরে স্বাভাবিকভাবে যে ছন্দ নিহিত রয়েছে তা পর্যন্ত তারা ব্যবহার করতে সক্ষম নয় । এই দুর্বলতাকে নিয়ে যারা মাতামাতি করেন তারা ভুল করছেন । তাদের জিনিস টিকবে না । বাংলা ভাষার ছন্দের ঋজু-বন্ধনের মধ্যে স্বাভাবিক কথোপকথনের Phoanetic চালকে যিনি সার্থকভাবে ব্যবহার করতে পারবেন তিনিই বাংলা সাহিত্যে নতুন রসের অবতারণা করবেন । এই রসই গদ্য ছন্দকে উড়িয়ে দেবে এবং সাহিত্যে নতুন রসের অস্বাদন দেবে ,যে অস্বাদন ইংরেজী আধুনিক কাব্যে ইয়েটস দিতে সক্ষম হয়েছিলেন । পরে এলিয়ট নতুন পদ্ধতিতে সেই ছন্দ রচনায় সার্থকতা অর্জন করেন ।

প্রশ্ন:  কবিদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন শরীফে যে কথা বলে তাদের সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন , এই সতর্কতা অনুসরণ করতে গিয়ে একজন কবি হিসেবে এবং একজন মানুষ,  বিশেষ করে ধার্মিক মানুষ হিসেবে কোন দ্বন্দ্ব বা সমস্যায় পড়ছেন কি ? অর্থাৎ এই আয়াত দ্বারা কবির স্বাধীনতা সম্পর্কে আল্লাহর কোন বিশেষ নমনীয়তা বা বিশেষ ক্ষমাশীলতার ইঙ্গিত পান কি ,যাতে একজন কবির উদাসীনতা ও উদ্ভ্রান্ততাকে মেনে নেয়া হয়েছে?     

উত্তর: আল্লাহ কুরআন শরীফে কবিতা এবং কুরআন শরীফের মধ্যে তফাৎ দেখানোর জন্যে বলেছেন যে ,কবি যদি তার কাব্যকে চিরন্তন মহৎ সত্য বলে দাবি করে তাহলে সে মিথ্যাবাদী । তার কারণ ব্যক্তিগত উপলব্ধি অন্ধের হাতী দেখার মত । সম্পূর্ণ উপলব্ধি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় । কুরআন শরীফ ব্যক্তিগত কোন সৃষ্ট পদার্থ নয় । কারণ কুরআনে সম্পূর্ণতার সুষ্ঠু প্রকাশ রয়েছে।এজন্যেই কুরআনের জ্ঞানকেই আল্লাহ একমাত্র সত্য জ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন । অন্যান্য সমস্ত জ্ঞানকে ‘যান্নি ‘অর্থাৎ সম্ভাব্য জ্ঞান বলে পরিচয় দিয়েছেন । কবিদের আহরিত জ্ঞান এবং কাব্যের মারফত পাঠক যে জ্ঞান পায় তাও সম্ভাব্য জ্ঞান ।সত্যের পূর্ণ স্বরূপ সেখানে নেই । এই সত্য প্রকাশ করার জন্য কবিদের সম্পর্কে আল্লাহ যা বলেছেন সেখানে নমনীয়তা বা ক্ষমাশীলতার কথা আসে না ।এ হচ্ছে জ্ঞান সম্পর্কে আমাদের সত্য ধারণা দান করে ।

তথ্য সূত্র:  সকাল (সৈয়দ আলী আশরাফ বিশেষ সংখ্যা)

সম্পাদক -ইশারফ হোসেন

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.