Humayun Ahmed

ছোট বেলায় হুমায়ূন আহমেদের সাথে প্রথম দেখা হয় শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরি চত্ত্বরে । সাদা প্যান্টের সঙ্গে চকচকে ফতুয়া । দূর থেকে তাকিয়ে মনে মনে কত কিছু ভেবেছি । লেখকরা যেন কেমন হয় । তারা কিভাবে হাঁটে, কেমন করে কথা বলে,কিভাবে তাদের ভাবনারা ভাবে, নানা ধরনের চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেয়েছে । তবে কফিন বন্দী হওয়ার আগে শেষ বার ২০১০ সালের তেরোই নভেম্বর তাকে দেখেছিলাম । কেমন চুপ চাপ, খুব কম কথা বলে আর বেশি বেশি ভাবে । এরপর শেষ বার হিম শীতল লাশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম তুমি তো সেই জাদুকর ।একটা গানের লাইন বার বার মনে পড়ছিল মরিলে কাঁন্দিসনা মোর দায় ! তাই চোখ চেপে ছিল সেই অনুরোধ । আমিও কাঁদিনি ,চোখের জল ফেলে বলিনি কেন চলে গেলে ?
তবুও ছোট্ট হৃদয় ব্যথায় আনমনে হয়ে উঠল । হৃদয়ের অদ্ভুত অনুভূতি আমার পরান সত্ত্বার আকাশে উড়তে থাকা এক খন্ড মেঘের সাথে ছোটাছুটি করছিল । চিন্তা বুদ্ধি জ্ঞান আর ভাবনার সব দিয়ে মহাজগত রেখে গেছো । কৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার মতো নেই ।

বেশ কয়েক বার তার সঙ্গে এই দেখাদেখি কিন্তু কখনো মনে হয়নি আমার সাথে তার কথা হয়নি ।
আনমনে ভেবেছি কত কথা । এখনো জোৎস্না রাতে হেঁটে বেড়াই পিচঢালা পথে নদী ভেবে ।
এখনো হৃদয়ে তোমার শব্দ গুলো জেগে বসে । মধ্যরাতে ক্লান্ত হয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে শরীর এলিয়ে দেই ।
মিসির আলী, হিমু ,রূপা,বাকের ভাইদের নিয়ে তার সঙ্গে জম্পেস আড্ডা হয়েছে । তার কথা শুনে এক পর্যায়ে হাসছিলাম আমার ডান হাঁটুতে হাত রেখে বললো “ঐ মিয়া এই চরিত্র গুলা ফেমাস করছে আমার দর্শক ও পাঠকরা । গল্প শেষ করেছি কিন্তু অনুপ্রেরণা কলম চালিয়েছে । একসময় গল্প শেষ করতে বাধ্য হয়েছি ।” আমার হাতে মিসির আলী সমগ্র , মিসির আলীর অমানিবাস বরাবর তর্জনী রেখে বললাম আপনার নাটক চলচ্চিত্রে অন্যরকম ফ্লেবার আছে । দূর থেকে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে নিরব প্রতিবাদ বলা যায়। উড়ে যায় বক পক্ষী,কোথাও কেউ নেই ,আজ রবিবার, নক্ষত্রের পতন ,নন্দিত নরকে,শ্যামল ছায়া ,এছাড়া ছোট ছোট বেশ কিছু নাটক । আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো “বাঙালি তো বলে আমি পাঠক তৈরি ছাড়া আর আনন্দ ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি “। আচ্ছা বাঙালি পেট ভরে খাওয়া ছাড়া কখনো কি শুকরিয়া আদায় করেছে আপনি বলেন ? তবে আপনি বুদ্ধিমান লেখক । রগচটা বদমেজাজি ও অস্থির প্রকৃতির নয়। আপনার শেষ সৃষ্টি “দেয়াল” সে কথা গোপনে খোদাই করে রেখে গেছে । কিন্তু বাঙালি তো প্রতিক্রিয়াশীল সে ইনসন্ট্যান্ট ক্যাশ ব্যাক চায় । আপনার কাছেও চেয়েছে । আপনি বিপথগামীদের পথে আনার চেষ্টা করেছেন । কিন্তু তারা মজা হিসেবে গ্রহণ করেছে । বাঙালি যাকে সাহিত্যে পায় তাকে ধর্মে, রাজনীতিতে, সমাজে ও পরিবারে চায় । আপনাকেও চেয়েছে । আপনি সাহিত্যের বটবৃক্ষ তাই ধর্ম ও পঁচা রাজনীতিতে চেয়েছে । জনতা চেয়েছে এই চুরি ,দুর্নীতি ও লুটপাট রুখে দেবে এই নয়া জামানার ন্যায়বান সাহিত্যের জাদুকর ।
সাহিত্যে যেভাবে মহারাজ হয়ে ছিলেন তেমনি ধর্ম ও রাজনীতিতে মহারাজ হবেন ।
এখানেও পাবলিক বিজয়ের আশা করেছে ।
জানেন তো আমাদের ক্রিকেট ছাড়া বিশ্ব মাঠে তেমন কোন অর্জনও নেই, তাই বিজয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের থেকেই যায় ।।

বেঞ্চিতে বসে গল্প করছিলাম হঠাৎ উঠে হাঁটতে হাঁটতে কালো তুলসি গাছের কাছে দাঁড়াল । পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল । আমি বললাম তুলসী গাছ আমার খুবই প্রিয় । বিশেষ করে পাতার গন্ধ আমাকে মুগ্ধ করে । পুকুর ঘাটে এক প্রেমিক যুগল হাত ধরাধরি করছিল বললো “বাঙালি সব কিছুতে কাম খোজে ধর্মে, রাজনীতিতে , সমাজে । মসজিদে ইবাদাত ধ্যানে নিমগ্ন থাকবে কিন্তু তবারক ছাড়া মহফিল জমে না সেখানেও ভোগের আনজাম । রাজনীতির উদ্দেশ্যটা এখন নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়েছে । রাজনীতিতে এখন কেবল লুটপাট টুকু আছে । ঠিক প্রেমের ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের অন্তিম উদ্দেশ্য কেবল কাম ।” আমি হেসে বললাম প্রেমের পিনিকের সাথে গাঁজার পিনিকের তুলনা চলে কি বলেন ! গাঁজা খেলে অন্য নেশায় ধরে না এমনকি অন্য নেশায় মনও বসে না তেমনি প্রেমের পিনিক প্রেম ছাড়া মজে না ।। হা হা হা করে হেসে বললো “তুমি তো দেখি এক সঙ্গে গাঁজা এবং প্রেমের সমিকরণ দাঁড় করে ফেলেছো ।”

আজ হুমায়ূনের জন্মদিন ।। কত কিছু মনে পড়ছে । আমি তাকে লেখক বলি না । কয়েক লাইন কবিতার জন্য আমি তাকে কবি বলেই সম্বোধন করি । মাঝ রাতে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে সারা রাত হিমু মিসির আলী পড়ে জন্মদিন পালন করেছি । ছোট বেলার অনুভূতি গুলো কেমন লাগামহীন ঘোড়ার মতো । মাঝে মাঝে মনে পড়ে বড্ড হাসি পায় । ভালো থাকুক প্রিয় কবি । আমার হৃদয় কথন পৌছে যাক ঘুমিয়ে থাকা হৃদয়ে ।
হৃদয় জেগে উঠুক ,
আত্মা মরে না,
মরে কেবল দেহের খোলস।
শুভ জন্মদিন ।

আবদুল কাদের জিলানী
সম্পাদক

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.