তোমাকে ভালোবাসি হে নবী -গুরুদত্ত সিং

সত্যের আলাে ছড়াতে, পুণ্যের পথ দেখাতে এক মহামানবের আবির্ভাব হলাে। তার শুভ দর্শনে দৃষ্টি যাদের প্রেমমুগ্ধ হলাে এবং হৃদয় যাদের ভালবাসায় স্নিগ্ধ হলাে জনম তাদের সার্থক হলাে, জীবন-স্বপ্ন তাদের সফল হলাে। এ পরশমণির পরশ-সৌভাগ্য যারা লাভ করলাে, খাঁটি সােনার চেয়ে খাটি তারা হলাে। এ স্বর্গ-পুষ্পের সান্নিধ্য-সৌরভ যারা পেলাে বিশ্ব-বাগানে তারা গােলাবের খােশবু ছড়ালাে।

উষর মরুর বাসিন্দা হে উম্মি আরব! জানি না; মর্তলােকের মানব, না স্বর্গলােকের দেবতা তােমরা! হাবীবে খােদার দীদার-দর্শন পেলে কোন্ সে মহাগুণে! নূরে খােদার তাজাল্লিতে ধন্য হলে কোন্ সে মহাপুণ্যে!! ইতিহাস তাে বলে, লুটতরাজ ও খুনখারাবি ছিলাে তােমাদের পেশা, আর নাচ-গান ও মদ-জুয়া ছিলাে তােমাদের নেশা। এমন কোন অন্যায় ছিলাে না যা তােমরা জানতে না, এমন কোন পাপও ছিলাে না যা তােমরা করতে না । ‘আকারে ইনসান, প্রকারে শয়তান’ এই তাে ছিলাে তােমাদের ‘পহচান’। অথচ সারা বিশ্বে আজ তােমাদেরই জয়গান, তােমাদেরই ‘শওকত-শান’!

বলাে না কোন্ সে প্রতিভা সুপ্ত ছিলাে তােমাদের মাঝে, কোন সে অমৃতজলের সন্ধান ছিলাে তােমাদের কাছে, যার ফলে তােমাদের জীবনে হলাে নব প্রাণের সঞ্চার এবং চরিত্রে এলাে এমন মহাবিপ্লব, সময়ের মুহূর্ত ব্যবধানে ‘রাহজান থেকে হয়ে গেলে রাহবার!

কাফেলা লুণ্ঠনকারী এই তােমাদের কাছেই বিভ্রান্ত মানব কাফেলা পথের দিশা পেলাে! মুক্তির মহাসড়কে পথচলা শিখলাে! মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়ও যে হার মানে তােমাদের কাছে!

হে বালু সাগরের ‘আরবিস্তান’! বিশ্ব মানচিত্রে একদা তুমি এমনই অখ্যাত অবজ্ঞাত ছিলে যে, সভ্য জগত জানতাে না, আরব নামের কোন দেশ আছে, আর সেখানে মানুষের সমাবেশ আছে, অথচ বিশ্ব-জাতি আজ তাকিয়ে আছে তােমার পানে কী বিপুল বিস্ময় নিয়ে! তােমার প্রেমে কাতর নয় কোন্ সে মন! তােমার দর্শন-পিপাসু নয় কোন্ সে নয়ন! এবং তােমার আশীর্বাদের ভিখারী নয় কোন্ সে রাজা! কোন্ সে রাজ্য!

হাবীবে খােদার পদধূলি, নূরে খােদার তাজাল্লি তােমাকে দিয়েছে নব জীবনের নব সাজ। তাই মানব সভ্যতার মুকুট তুমি আজ। সর্বদেশের ঈর্ষা, সর্বজাতির শ্রদ্ধা এখন লুটিয়ে পড়ে তােমারই পায়ে, সুতরাং গর্ব করা তােমাকেই সাজে, মান করা তােমাকেই শােভে।

কী আর বলতে পারি বঞ্চিত এই আমরা! ভগবানের লীলা যে চির রহস্যঘেরা! কে জানে কখন কাকে সিক্ত করে তার করুণাধারা। তাই তাে আহমদী নূরের সওগাতে ধন্য হলে তুমি! মুহাম্মদী নবুয়তের অরুণালােকে স্নাত হলাে তােমার বালুভূমি। অথচ বঞ্চিত হলাে স্বর্ণপ্রসবা ভারতভূমি! গঙ্গা-হিমালয়ের এই ভারতভূমি!

অজেয় হিমালয়ের তুষারশুভ্র হে গর্বিত চূড়া! তুমিই বলাে না, কতশত ঋষির ধ্যানমগ্ন রজনী প্রভাত হয়েছে তােমার কোলে! কত সাধু, কত সাধক সিদ্ধি লাভ করেছে তােমার প্রেম-সরােবরে অবগাহন করে, তােমার হিম শীতল চরণে প্রাণ উৎসর্গ করে! কিন্তু বলাে, সত্যি করে বলাে; মরু মক্কার এতীম দুলালের সেই মােহিনী রূপ কখনাে দেখেছাে তুমি! প্রিয়। মদীনার প্রিয়তমের সেই নূরানী দীপ্তি কোথাও নজরে পড়েছে তােমার! তাই বলি, কী আছে তােমার মাথা উঁচিয়ে গর্ব করার!

মহাকালের স্রোত প্রবাহের নিরব সাক্ষী হে গঙ্গা! তােমার তরঙ্গছন্দে বিমুগ্ধ কত ভক্ত পূজারী গঙ্গামন্ত্রযােগে প্রণাম করেছে তােমাকে। তাদের প্রেমতপ্ত হৃদয় শান্ত শীতল হয়েছে তােমারই পবিত্র জলে। কিন্তু বলাে, সত্যি করে বললা; মরু মক্কার আবে-জমজম অধিপতি একবারও কি দাড়িয়েছিলেন তােমার তীরে এসে! আঁজলা ভরে জল কি পান করেছিলেন তােমার বুকে নেমে!
হে দিল্লীভূমি! সেই ‘আকবরের দেখা কি পেয়েছিলে তুমি! হে ময়ূর সিংহাসন! তােমাকে ধন্য করেছিলাে কি সেই ‘শাহজাহানের’ পদধূলি!

হে দুর্ভাগিনী ভারতমাতা! ভগবানের অকৃপণ দানে, অশেষ আশীর্বাদে তুমি ধন্য, হিমালয় তােমার গর্ব; আগ্রা, দিল্লী, আজমীর ও মুলতান তােমার গৌরব । ভগবানের অশেষ কৃপায় ধনে, জনে, সম্পদে, গর্বে কোন কিছুতেই অপূর্ণতা নেই তােমার। কিন্তু মক্কা-মদীনার গৌরব তুমি পেলে
! জাবালে নূরের ঐশী নূর তাে ভগবান তােমায় দিলেন না! ইসলাম ও মানবতার কাবা-কেবলা তাে তােমার ভাগ্যে জুটলাে না!

দুর্ভাগিনী ভারতমাতা! সে জন্য দুঃখ করাে না, চোখের জলে বুক ভাসিও না। অশ্রুসাগর পাড়ি দিলে বিরহ বঞ্চনার যদি অবসান হতাে, কান্নার ভেলায় হাজার বছর না হয় ভেসে বেড়াতাম। কিন্তু ভগবানের দান তাে সম্পদে কেনা যায় না, ছিনিয়েও আনা যায় না। নইলে তােমার ‘সুপুত্ররা’ বিশ্বের সম্পদ ভাণ্ডার লুটিয়ে দিতাে তােমার চরণতলে। এ অমূল্য হার যে কোন মূল্যে পরাতাে তােমার কণ্ঠে। কিন্তু তা যে হবার নয়! ভগবানই শুধু জানেন, কাকে তিনি কৃপা করেন। তাই ভগবানের বিচার মেনে ধৈর্য না ধরে উপায় কি বলাে! ত্যাগ ও প্রেমই তাে তােমার ধর্ম । শান্তি ও অহিংসাই তাে তােমার বৈশিষ্ট্য। এতাে উতলা হওয়া কি তােমাকে সাজে?

দুর্ভাগিনী ভারতমাতা! হয়ত বলবে, আমাকে উপদেশ দিতে এসাে না। যুগে যুগে কত দুর্যোগ গেলাে আমার উপর দিয়ে, আঘাতে আঘাতে কত রক্ত ঝরলাে আমার বুক থেকে। তখন ধৈর্য ধরিনি আমি! বুক ফেটেছে তবু তাে আমার মুখ ফুটেনি। ধৈর্যের দুর্গম পথে হাজারাে চড়াই-উত্রাই পাড়ি দিয়েই তাে ইতিহাসের একেকটি ধাপ অতিক্রম করেছি আমি। কিন্তু এ তাে ধৈর্য বা ঔদার্যের প্রশ্ন নয়, এ যে গৌরব ও মর্যাদার প্রশ্ন! এ বঞ্চনা কি করে সইবাে বলাে? মর্যাদার প্রশ্নে তাে আপন অস্তিত্বকেও আমি বিসর্জন দিতে রাজী। হিমালয়কে ডিঙ্গিয়ে আরবের আল-হেরা লুফে নেবে ভগবানের এ মহাদান, চোখ বুজে তা কি সহ্য করা সম্ভব কখনাে!

হে দয়ার নবী রাসূলে আরাবী! আপনার পবিত্র হাতেই সঁপে দিলাম বিচারের ভার। দুর্ভাগিনী ভারতমাতাকে আপনিই সান্ত্বনা দান করুন। তার অভাগা সন্তানদের প্রতি কৃপা দৃষ্টি করুন।

হে আহমদ! তােমার প্রেমে এ অধম হিন্দুস্তানীর কোমল হৃদয় যে ক্ষত-বিক্ষত! অনুগ্রহ করে তাতে সান্ত্বনার শীতল পরশ বুলাতে এসাে না প্রিয়তম! চৌদ্দশ বছর সাক্ষী! কোন ইউসুফ কোন মিসরে তােমার মতাে প্রেম-সমাদর পায়নি। কেননা, তােমাতেই শুধু ঘটেছে বিধাতার অপরূপ রূপ মহিমার অপূর্ব প্রকাশ। তাই হাজার বছরের ব্যবধানেও কোন পাষাণ এড়াতে পারে না তােমার স্বর্গীয় জ্যোতির্ময়তার হাতছানি।

প্রিয়তম! তােমার দর্শন-সৌভাগ্য লাভে না হয় বঞ্চিত হলাম, তাই বলে স্বপ্নের বাতায়ন পথেও কি একবার নসীব হতে পারে না তােমার দীদার!

হে মুহাম্মদ! তােমার দর্শন-সৌভাগ্য একবার যে লাভ করেছে, শুনেছি হৃদয় তার তােমাতেই চিরসমর্পিত হয়েছে। চোখে তােমার প্রেমের সুরমা একবার যে মেখেছে স্বর্গ-মর্তের সকল সৌন্দর্যের মােহ থেকে তার চিরমুক্তি ঘটেছে। পাথরও নাকি সােনা হতাে তােমার পরশগুণে। পাষাণ হৃদয়ও নাকি মােম হতাে তােমার দৃষ্টি’ পেয়ে। তাহলে এদিকে হােক না একবার সে করুণা দৃষ্টি! তােমার নূর তাজাল্লির একটুখানি ‘প্রসাদ’ লাভের আশায় দুয়ারে তােমার হাত পেতেছে হিন্দুস্তানী এ ভিখারী। দোহাই তােমার প্রেমের! বঞ্চনার দহনে আর দগ্ধ করাে না এ অভাগাকে!

স্বীকার করি; মহামহিমের স্তুতি-ধন্য তুমি, জগদীশ্বরের প্রেমাস্পদ তুমি, কিন্তু আমিও যে তােমার কৃতার্থ দাস!

প্রিয়তম! সেবাদাসত্বের সৌভাগ্য-তিলকও যদি ললাটে না জোটে, তাহলে মুহূর্তের জন্য হলেও একবার এসে বলে যাও, তুমিও কি মেনে চলাে আপন পরের পার্থক্য! নইলে কেন এ উপেক্ষা! কিসের এ পর্দা!

তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের আকুতি শোনাে প্রিয়তম! এসাে হে প্রিয়তম! তােমারই জন্য যে সাজিয়েছি আমার এ হৃদয় সিংহাসন!

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.