Shikwa-Muhammad Iqbal

শিকওয়া

আসিলে সময় পূত নামাজের
চলিতেছে যবে ঘোর সমর ,
কা’বামুখী হয়ে চুম্বিত মাটি
হেজাজের বীর বংশধর ।
বাদশাহ মাহমুদ ভৃত্য আয়াজ
দাঁড়াইত দোঁহে এক কাতার ;
কেহ গণিত না ভৃত্য কাহারে ,
প্রভু রহিত না কেহ কাহার ।

আমীর ফকীর বাদশাহ নফর
ক্ষুদ্র মহতে অভেদ জ্ঞান,
তোমার মহান দরবারে আসি ‘
হইত সকলে এক সমান ।

সকাল সন্ধ্যা ঘুরিয়াছি আমি
এই বিশ্বের মহাসভায় ,
তব তৌহীদ -শিরীণ-শারাবে
পূর্ণ পানের পাত্র প্রায় ।
লঙ্ঘিত ভূধর দুস্তর মরু
প্রচার করেছি তোমার নাম ,
শুনেছ কি হায় হেন অঘটন –
ফিরেছি বিফল মনষ্কাম ?

মোর গতি -মুখে ছার মরুভূমি,
তুচ্ছ করেছি ঘোর পাথার ;
কৃষ্ণসাগরে বক্ষ আলোড়ি ‘
ছুটিয়াছে মোর ঘোড়-সওয়ার ।

মুছিয়া ফেলেছি ধরণী হইতে
কালিমা -চিহ্ন অসত্যের,
মানুষে করেছি মুক্ত আযাদ
শৃঙ্খল কাটি দাসত্বের ।
নোয়াইয়া মোর উন্নত শির
জিন্দা রেখেছি খানে -কা’বায়,
তব পবিত্র কালাম কো’রান
বক্ষে চাপিয়া ধ’রেছি তায় ।

হায় পরিহাস ,তবু অভিযোগ !
তোমাতে নহিক ভক্তিমান ?
বিশ্বাসহীন হই যদি আমি ,
তুমিও তো নও হৃদয়বান !

রহিয়াছে জাতি কত শত আরও
পাপীতে পূর্ণ আমার প্রায় ,
ধনের গর্ভে কত গর্বিত
দীন ও প্রার্থী রয়েছে তায় ;
কত সুচতুর আছে তার মাঝে ,
কত না বিলাসী অলস ঘোর ,
শতেক এমন আস্থাবিহীন
নামটি সহিতে পারে না তোর ।

ভাণ্ডার দ্বার মুক্ত তোমার
তবু চিরকাল তাদের তরে ;
বজ্রনিপাত কত শুধু হায়
যত মুসলিম -মাথার পরে ।

মন্দির মাঝে মাটির প্রতিমা
উল্লাস- ভরে হাসিছে আজ ,
কা’বার খাদেম মুসলিম আর
নাহিক ধরণী-বক্ষ -মাঝ ।
মরু মঞ্জিল ছাড়িয়া করেছে
হুদী -গায়কেরা চিরপ্রয়াণ,
বিদায় লইয়া যায় নাই শুধু ,
সাথে লয়ে গেছে আল-কোরান ।

অনুভূতি কিছু আছে কি তোমার?
মুসলিমে হেরি হাসে কাফের ,
নাহি কি ভাবনা এতটুকু হায় ,
কিবা দশা হবে তৌহীদের?

নহে অভিযোগ দিয়াছ বলিয়া
ধনাগার করি পূর্ণ তার ,
তব সনে যার কহিতেও কথা
নাহিক চিহ্ন ভদ্রতার ।
আফসোস হায় হুরীসহ তারা
করিছে রম্য হম্ম্যে বাস ;
মুসলিম তরে রাখিয়াছ বাকী
কেবল হুরীর প্রাপ্তি -আশ ।

সে দিনের মত মুসলিম -শিরে
ঝরে না তোমার করুণা- ধার ;
কোন অপরাধে বল আজ প্রভু !
হতাদর এত কেন আমার ?

কেন পার্থিব সম্পদ হতে
চির বঞ্চিত মুসলমান ?
তব ক্ষমতার নাহি যে অন্ত ,
তুমি যে সর্বশক্তিমান ।
ইঙ্গিতে তব উঠে বুদ-বুদ
উষর মরুর বক্ষ ‘পর ‘
মরীচিকা হয় স্নিগ্ধ সলিল
পান্থ -পরাণ তৃপ্তিকর ।

সদা বিদ্রুপ সহি অপরের
হইব দৈন্য পীড়িত হায় !
মরে যে তোমার মহিমার লাগি ,
ঠিক প্রতিদান দিয়েছ তায় !

কাফেরভোগ্যা বসুন্ধরা এ ,
নাহিক হেথায় আমার স্থান ।
সম্মুখে রাখি চলিয়াছি তাই
আশার ফানুশ বেহেশতখান ।
চালাক পৃথ্বী তারাই এখন ,
লইলাম আমি চির বিদায়,
অপবাদ মোর দিয়ো না কো ফের ,
যদি তৌহিদ ডুবিয়া যায় ।

বাসনা আমার এই চিরকাল
থাকুক জগতে তোমার নাম
নহে সম্ভব! সাকীর বিহনে
থাকে কি কখন শারাব-জাম ?

গিয়েছে প্রেমিক গেছে তার সাথে
বাসর-সুরভি হইয়া লীন ,
ঝরে না নিশীতে মিলনের আসুঁ,
বাজে না প্রভাতে বেদন -বীণ ।
প্রতিদান কিছু পাইনি তো হায় ,
সঁপিয়া শুধুই গেল সে প্রাণ ;
বসিতে পার্শ্বে একটি নিমেষ
বিদায়- বাঁশীর শুনিল গান ।

লয়ে বুকভরা আশার আশা
আঁধারে যে -জন ডুবিল হায় !
জালিয়া বদন -সুষমা- প্রদীপ
আবার খুঁজিয়া লও হে তায় ।

সে দিনের মতো মজনু কায়েস
জ্বালিছে বহ্নি লায়লা -বুকে ,
মৃগকুল হের নেজদের বনে
বিচরণ করে তেমনই সুখে ।
নিভে যাই আজও প্রেমের দাহন ,
সুষমা তেমনই হরিছে মন ,
তুমি আর তব ভক্ত নবীর
আছে তো সবাই ছিল যেমন!

কেন তবে আর বল হে নিঠুর
আচরণ আজি করিছ হেন ?
বিনা অপরাধে ভক্তের প্রতি
অহেতুক রোষ-দৃষ্টি কেন ?

ভুলি নাই প্রিয় আরব-রসূলে ,
ভুলি নাই মোরা তোমারে প্রভু ।
মূর্তি চূর্ণ করি চিরকাল
মূর্তি ব্যবসা করেছি কভু ?
চলেছি তোমার প্রেমের সুরায়
পরাণ -পেয়ালা পূর্ণ করি ,
ওয়ায়েস- করনী আর সালমাঁ’
চলেছিল যেই পথটি ধরি ।

তব তকবীর- বহ্নি আজিও
হিয়ার পরতে করি গোপন ,
স্বার্থবিহীন বেলালের সম
শুভ্র জীবন করি যাপন ।

মানিনু সত্য আশেকের বুকে
ইশকের নাই সেই দাহন ;
নাহি অনুরাগ মানব হৃদয়ে
বিশ্বাসী আর নাই তেমন ।
প্রেমাবেগে হৃদি চুম্বক জিনি ‘
নহে দুরু দুরু কম্পমান;
হয়তো তোমাতে আমরাও আর
নহিক তেমন ভক্তিমান !

একদিন মোরে বাসিয়াছ ভাল ,
আন জনে এবে সঁপিছ কায়;
তব আচরণ নহে তো শোভন ,
চির হরজায়ী তুমিও হায় !

ফারাণ -শিখর হইতে যে দিন
ইসলামে দিলে পূর্ণ করি ,
মোহন আঁখির এক ইশারায়
হাজার পরাণ লইলে হরি ।
বিজিত হইল নিমেষের মাঝে
প্রেমের বহ্নি- বাহকগণ;
তব গণ্ডের মোহিনী শোণিমা,
করিল দগ্ধ সকল মন ।

সে পাবকশিখা কেন তবে আর
দীপ্তী -উজল করে না প্রাণ ?
ভুলিলে কেমনে আমিই তো সে
মুসলিম ত্যাগ -মূর্তিমান ।

তথ্য সূত্র: শিকওয়া- মুহাম্মদ ইকবাল
তর্জমা: মুহাম্মদ সুলতান

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.