Muhammad Iqbal-Fahmid-Ur- Rahman

তুমি তৈরি করেছ রাত্রি,
আমি তাে জ্বেলেছি আলােক ।
মাটি তােমার, তাই দিয়ে রচলাম পান-পাত্র। তােমার ছিল মরুভূমি, পর্বত, অরণ্য;
আমার হ’ল তৈরি ফুলের কানন,
গােলাপ,
ফলের বাগান।
আমি সে যে পাথর’কে করে দেয় আয়না,
বিষ হতে যে বানায় মধু ।[১]

মনুষ্যত্বের জাগরণ ও তেজস্ক্রিয়তার এরকম দুকূল প্লাবী নমুনা ইকবালের কবিতা , দর্শন ও উচ্চাঙ্গের বক্তৃতাতে ভূরি ভূরি দেখতে পাওয়া যায়। কবি মানুষের অপরাজেয় শক্তি ও সম্ভাবনার কথা যেমন বলেছেন তেমনি তার অশেষ সংগ্রাম ও মুক্তির কথাও তার কাব্য ও দর্শনের প্রধান উপজীব্য হয়ে আছে । ইকবাল মানুষের আত্মবিকাশ ও স্রষ্টার পাশে মানুষকে তার সহকর্মী (Co-worker) হিসেবে যেভাবে চিত্রিত করেছেন উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথের ভাষায় তা একালের ধর্মজগতে এক রীতিমত বিপ্লব হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। কেননা এটি খােদার দূরবর্তী অবস্থানের পুরনাে চিন্তাকে ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং খােদাকে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছে। এই নবতর চিন্তা খােদার সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষের সমস্যাগুলােকে বুঝবার এবং নতুন ও উন্নততর পৃথিবী নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । [২]

ইকবাল কেন এই গতিধর্মী ও বিপ্লবী ইসলামের ব্যাখ্যা দিতে গেলেন ? তিনি তার অফুরন্ত চিন্তাশক্তি ও উদ্যম দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন একদিকে সর্বভূক আগ্রাসী পাশ্চাত্যের দাপাদাপি অন্যদিকে স্বসম্প্রদায়ের রাষ্ট্রিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও তমুদ্দুনিক নির্জীবতা, অবক্ষয় ও দূষণের মধ্যে এটিই হচ্ছে উত্তরণের একমাত্র পন্থা। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মুসলমানের আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার নির্ভুল উপায়।

ইকবাল চেয়েছিলেন অবক্ষয়িত মুসলমানের পুনরায় আত্মশক্তিতে প্রত্যয়লাভ, আর দুর্জয় শক্তিলাভের জন্য দেশজাতির গন্ডিমুক্ত এক ধর্মবন্ধনের ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ একটি সৃষ্টিশীল উন্নতিপরায়ণ জাতি । সত্য ধর্ম ও নীতির প্রতিপালক, আত্মনাশা ও প্রয়ােজন পরিপন্থী প্লেটোনিক, বৈদান্তিক ও সুফী চর্চার প্রভাবহীন ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্র, হয়তাে ইসলামী
খেলাফত বা কমনওয়েলথের ভাবনাও তার ভিতরে ছিল । তবু তার সে স্বপ্ন যেভাবে যতদূর সাধিত হােক বা না হােক ইকবাল ঐতিহাসিকের বিচারে স্থান পেয়েছেন ইসলামী রেনেসাঁর কবি ও দার্শনিক হিসেবে।

মােহাম্মদ ইকবালের জন্ম ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর বর্তমান পাকিস্তানের শিয়ালকোটে ।শিয়ালকোট হচ্ছে জম্মু সন্নিহিত পশ্চিম পাঞ্জাবের এক প্রাচীন শহর ।ইকবালের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন সাপ্রু বংশীয় কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ। সপ্তদশ শতাব্দীর কোন এক সময় জনৈক সুফীর সংস্পর্শে এ পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেন। অনুমান করা হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে মােঘল সাম্রাজ্যের পতনের যুগে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সময় পরিবারটি কাশ্মীর ত্যাগ করে শিয়ালকোটে বসতি কায়েম করে। কবি তার ব্রাহ্মণ্য উৎস নিয়ে লিখেছিলেনঃ ‘ব্রাহ্মণজাদা আমি, ঋদ্ধ হয়েছি রোম আর তব্রিজের গূঢ় জ্ঞানে ।[৩]

ইকবালের পিতামহ শেখ রফিক ছিলেন এক শাল বিক্রেতা। পিতা নূর মােহাম্মদ ছিলেন সূচী শিল্পী- টুপি ও শালের উপর নকশা তোলায় দক্ষতা ছিল তার । দরিদ্র হলেও নূর
মোহাম্মদ ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ ও ধার্মিক, তাসাউফের প্রতি আকর্ষণ ছিল তার । বস্তুত তিনি ছিলেন এক সুফী তরিকার অনুবর্তী।

নূর মোহাম্মদের স্ত্রী ইকবালের আম্মা ইমন বিবি ছিলেন সমান ধর্মপ্রাণা। দর্জির কাজে নূর মোহাম্মদের দক্ষতা দেখে একদা এক সরকারি কর্মচারী তাকে একটি সিঙ্গার সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমন বিবি যখন শুনলেন ঐ সরকারি কর্মচারী অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে মেশিনটি কিনে দিয়েছেন তখন তিনি মেশিনটি ফেরত দিতে বললেন স্বামীকে। নূর মােহাম্মদ স্ত্রীর কথা যুক্তিযুক্ত মনে করে সেলাই মেশিনটি ফেরত দিয়ে টুপির উপর নকশা তােলার কাজেই ফিরে আসেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তার সততা কিছুটা পুরস্কৃত হয়। তার টুপির উপর নকশা তােলার কাজ এমন সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে যে তাকে কয়েকজন কর্মচারী রাখতে হয় । ইকবাল তার বাল্যকালের একটি ঘটনা নিয়ে একটি কবিতা সৃষ্টি করেছিলেন, যা থেকে ধারণা করা যায় তিনি কি পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছিলেন। একবার তিনি এক ভিখারীকে প্রহার করে তার ভিক্ষালব্ধ অর্থ নিয়ে নেন। নূর মােহাম্মদ এই ঘটনা জেনে ব্যথিত হয়ে অশ্রুপাত করতে করতে বলেছিলেন শেষ বিচারের দিন এই ভিক্ষুক কাঁদবে আর পয়গম্বর আমাকে শুধাবেন, এই বালক মুসলমানকে তােমাকে দিয়েছিলাম মানুষ করার জন্য, কিন্তু এ মানুষ না হয়ে কাদার তাল হয়েছে কেন? ইকবালের লেখা সেই কবিতাটি হচ্ছেঃ

একটু চিন্তা করাে পুত্র, স্মরণে আনাে-
আমার সাদা দাড়ির দিকে তাকাও আর দেখাে, পয়গম্বরের সামনে শেষ জমায়েতে
ভয় আর আশার দোলাচলের মধ্যে,
কেমন কাঁপছি আমি।
পিতাকে এমন বিশ্রীভাবে আঘাত করােনা, আল্লাহর সামনে তাঁকে লজ্জায় ফেলাে না,
মুহাম্মদ বৃক্ষের একটি কুঁড়ি তুমি! [৪]

নূর মােহাম্মদ দুই পুত্র ও তিন কন্যার জনক ছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল কনিষ্ঠ পুত্র ইকবালকে মাদ্রাসায় দেয়া। কিন্তু পারিবারিক বন্ধু মৌলভী মীর হাসানের পরামর্শে তাকে শিয়ালকোট শহরে স্কটিশ মিশনারী স্কুলে ভর্তি করানাে হয়। মীর হাসানের সাহচর্য ইকবালের জীবনে খুব কাজে এসেছিল সন্দেহ নেই। ইসলামী বিষয়ে পণ্ডিত হয়েও মীর সাহেব বুঝেছিলেন প্রথাগত মাদ্রাসা শিক্ষা মেধাবী ইকবালের কোন উপকারে আসবে না। বলাবাহুল্য এই সুপণ্ডিত মওলানাই ইকবালকে প্রথম কবিতা চর্চায় উৎসাহিত করেন।

শিয়ালকোটে প্রাথমিক ও প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করার পর এই শহরের স্কচ মিশন কলেজ থেকে ইকবাল এফ.এ পাস করেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি লাহোরে এসে সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯৭ সালে তিনি বি. এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে একই কলেজ থেকে সম্মানের সাথে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে এম. এ পাশ করেন । তার কৃতিত্বের সাক্ষর হিসেবে তাকে একটি স্বর্ণপদকও দেয়া হয়। লাহাের সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালে ইকবাল প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী থমাস আর্নল্ডের সংস্পর্শে আসেন। ইতিপূর্বে আর্নল্ড ১৮৯৮ সালে লাহোর কলেজে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যােগ দেন। ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে অধ্যাপক আর্নল্ডের প্রগাঢ় জ্ঞান মুগ্ধ করে তরুণ ইকবালকে। অন্যদিকে অধ্যাপক আর্নল্ডও নব্য যুবক ইকবালের মধ্যে আবিষ্কার করেন এক প্রতিশ্রুতিবান কবিকে । আরম্ভ হয় এক গুরু- শিষ্য পরম্পরা।

শিয়ালকোটের মৌলভী মীর হাসান ইকবালের জীবনে যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, লাহােরের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হন অধ্যাপক আর্নল্ড। ইকবালের কবি প্রতিভাকে উৎসাহিত করলেও তিনি তাকে বোঝান কাব্যচর্চা ভারতের মত অনগ্রসর দেশে মানুষের জীবিকা হতে পারে না। মূলত তার প্রেরণায় উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন ইকবাল। ১৯০৪ সালে আর্নল্ড লন্ডনের উদ্দেশ্যে ভারত ত্যাগ করলে ইকবাল ব্যথিত হয়ে লেখেন ‘নালায়ে ফিরাক’ নামক এক কবিতা।

এম.এ পাশ করার পর ইকবাল লাহােরের ওরিয়েন্টাল কলেজে আরবীর প্রভাষক হিসেবে যােগ দেন। কিন্তু কিছুদিন পর ইংরেজি ও দর্শনের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে লাহাের সরকারি কলেজে বদলি হয়ে আসেন। এই কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে ১৯০৫ সালে ইকবাল ইংল্যান্ড যান। এখানে তিনি অগ্রবর্তী ছাত্র হিসেবে কেম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে যােগ দেন। পাশাপাশি লিংকনস ইনে আইন অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন। কেম্ব্রিজে প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ম্যাকটেগার্টের তত্ত্বাবধানে তিনি কাজ করেন এবং ‘ফিলসফিক্যাল ট্রিপস’ ডিগ্রি অর্জন করেন। এসময় তিনি মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ডক্টরেট ডিগ্রীর জন্য যােগ দেন এবং এখানে তার বিখ্যাত অভিসন্দর্ভ ‘দ্যা ডেভেলপমেন্ট অফ মেটাফিজিকস ইন পারসিয়া’ জমা দেন। ডক্টরেট ডিগ্রী পাওয়ার পর ইকবাল ইংল্যান্ডে ফেরেন এবং লিংকনস ইন থেকে ১৯০৭ সালে ব্যারিস্টারি পাস করেন। তিন বছর প্রবাস জীবন শেষে ইকবাল ১৯০৮ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন ।

উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথ লিখেছেন, ইকবাল যখন ইংল্যান্ডে যান তখন তার যােগ্যতা ছাড়া উল্লেখ করার মতাে কিছু ছিল না। ইতিপূর্বে তিনি যা বলেছিলেন হয়তাে ভারতে তা অনেকেই একইভাবে উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু তিন বছর পর তিনি যখন ইংল্যান্ড ও জার্মানী থেকে ফিরে আসেন তখন তার কণ্ঠে নতুন ও উত্তেজক সুর। এটা শুধু অভাবনায় বলিষ্ঠতার সাথেই উচ্চারিত হয়নি, স্যার সৈয়দ আহমদ খানের পর ভারতীয় ইসলামের জন্য এটি ছিল সবচেয়ে বড় অবদান। [৫]

বিলাত যাওয়ার আগেই ইকবালের কবিখ্যাতি ঘটেছিল । লাহোরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আঞ্জুমান-ই হিমায়েত -ই ইসলাম’ ছিল ইকবালের প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত স্থান। ইকবাল তার কোন কোন সাড়া জাগানো কবিতা এ সংগঠনটির সাহিত্যসভায় প্রথম পাঠ করেছিলেন ।তার কবি জীবনের প্রথম অংশের কবিতাসমূহ মূলত তার দেশাত্ম সাধনার ধারায় উজ্জীবিত । বিদেশ যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতবর্ষ ছিল ইকবালের স্বপ্ন আর আবেগের বস্তু । তিনি লিখলেন ‘সারে জাহাঁ সে অচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হমারা।’ এ সময় তার মুখে ছিল হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ভাবনার কথা, ভারতীয় ওয়াতানিয়াত ও ন্যাশনালিজমের কথা। এটা সত্য ইউরােপীয় সংঘ শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের সামনে তার স্বাদেশিকতা জাগ্রত হয়েছিল, পাশাপাশি তখনকার মতাে তার মনে হয়েছিল ভারতের কল্যাণ আসতে পারে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের ভিতর দিয়ে। এ পর্যায়ে ইকবাল একজন পুরােপুরি ন্যাশনালিস্ট। তার এ সময়ের একটা কবিতার নমুনা নেয়া যাকঃ

ওগাে ব্রাহ্মণ!
মন্দিরের দেবতা তোর পুরনাে হয়ে গেছে! নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ – এতাে তুই তাঁর কাছেই শিখেছিস,
খােদাইত শিখিয়েছেন ওয়ায়েজকে ঝগড়া বিবাদ করতে ,
মসজিদ মন্দির কোনটাতেই আমার ভক্তি নেই। ব্রাহ্মণ মােল্লা দুইই ছেড়েছি আমি ।
তুই ভেবেছিস পাথরের মন্দিরে দেবতা আছে, জন্মভূমির প্রতি ধূলিকণা কিন্তু আমার দেবতা! নূতন শিবালয় তৈরি করব প্রাণের বসতভূমিতে, উদার আকাশে মেলে দেবে এ চূড়ার পাখা । সকল তীর্থের সেরা তীর্থ হবে এই,
মানুষের মুক্তি আসবে প্রেমের ভিতর দিয়ে। [৬]

তার এ যুগের কবিতার মধ্যে আছে হিমালা, নালায়ে এতীম, পরিন্দে কি ফরিয়াদ,তসবির-ই-দর্দ, গুল-ই-রঙিন, শামা ও পরওয়ানা, এক আরজু, চাঁদ, রাভি কিনারে, তরানা-ই-হিন্দ প্রভৃতি। এসব কবিতার অধিকাংশের ভাষা এক রােমান্টিক জাতীয়তার মধুস্রাবী গন্ধে আমােদিত। ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ সালে ইউরােপ প্রবাসের সময় ইকবালের কবি জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে তার মনােভাবের পরিবর্তন ঘটে। আতঙ্কিত হয়ে তিনি লক্ষ্য করেন দেশপ্রেম প্রবল ব্যাধিজ্বরের উত্তাপে শক্তিমান সব জাতি রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটিয়েছে ইউরােপে। এই সব নেশনের মধ্যে রেষারেষির ফল হলাে প্রাধান্য লাভের আর নতুন নতুন উপনিবেশ অধিকারের উন্মত্ত প্রতিযােগিতা। অন্য নেশনকে জয় করে নেয়ার পৈশাচিক উচ্চাশায় সবাই বিভাের। ইউরােপের ইতিহাস বিশদ বিশ্লেষণ করে যুক্তিবিচার সহকারে ইকবাল দেখানাের চেষ্টা করেন মার্টিন লুথারের আবির্ভাবের ফলে খ্রিস্টধর্ম আর ইউরােপের ঐক্যবিধায়ক শক্তি রইলাে না। আর তারই পরিণামে জাতি রাষ্ট্রগুলাে উন্মাদ হয়ে পড়ল পররাজ্য দখলের নেশায় ।

ইকবাল আধুনিক সভ্যতার সংকট প্রত্যক্ষ করলেন এর সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ধনতন্ত্রী চরিত্রের ভিতর। তিনি গভীর প্রজ্ঞার সাথে বিশ্লেষণ করে দেখলেন ইউরােপীয়
সভ্যতার যে চাকচিক্য তা নির্মিত হয়েছে ধর্মহীনতার সৌধের উপর যার শুরুহয়েছিল ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার পদ্ধতির ভিতর দিয়ে।

তাই তিনি এই সভ্যতাকে অভিশাপ দিলেন। তিনি বললেন, এটি এখন ভেঙ্গে পড়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে,ধ্বংসের পূর্বাভাষ দিচ্ছে এর আগ্রাসী রাজনীতি আর ঔপনিবেশিকতা । দূরদৃষ্টি দিয়ে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন অচিরেই রাজনৈতিক হারিকিরি (আত্মহত্যা) করবে ইউরােপঃ

হে পাশ্চাত্যবাসী
আল্লাহর পৃথিবী একটি দোকানঘর নয় ।
আর তােমরা যাকে সত্যিকারের স্বর্ণমুদ্রা মনে করেছ
তা মেকী বলেই প্রমাণিত হবে।
তােমাদের নিজেদের খঞ্জরের উপরই
আপতিত হবে তােমাদের সভ্যতা।
ভঙ্গুর বৃক্ষ শাখায় নির্মিত কুলায়
ভেঙ্গে পড়বে – আজ নয় আগামীকাল।।
কখনাে এ স্থায়ী হবার নয়।[৭]

ইউরােপের বণিক চরিত্রের দিকেও ইকবাল ছুটিয়েছিলেন তার শ্লেষাত্মক তীর ।তিনি তার বহুনন্দিত লেনিন কবিতায় পরলােকগত এই বলশেভিকের জবানীতে বলেছেনঃ
য়ুরোপে আলো ,জ্ঞান এবং শিল্প দেখো আজ অপর্যাপ্ত। তার প্রমাণ দেওয়া হচ্ছেঃ

স্থাপত্য চাও তাে দেখাে ব্যাঙ্কগুলির দিকে, ধনিকের সৌধগুলি চার্চের চেয়ে ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন।
বাণিজ্য-নিশ্চয় আছে,
বস্তুত সেটা জুয়ো খেলা,
একজনের লাভে হাজার জনের মৃত্যু । যে-মহাজাতি হারালাে ভগবানের প্রসাদ,
চরম তার উৎকর্ষ দেখাে ইলেকট্রিসিটি এবং স্টীম,,,
লক্ষণ স্পষ্ট- তকবির নামক দাবা-খেলিয়ে
করল বাজিমাত তদবির-দাবাড়ুকে।….. সরাইখানার ভিতে লাগল ধাক্কা,
সরাইরক্ষকেরাও বসে ভাবছে ভাগ্যের কথা । …. রাত্রে পথের লােকের মুখে দেখছ স্বাস্থ্যের রক্তিম আভা
তার কারণ ওদের শরাব পান,
অথবা কসমেটিক ।[ ৮]

মােটের উপর ইকবাল ইউরােপীয় সভ্যতার নৈরাজ্যের ফলে যে অন্ধকার আজ বিশ্বজনীনরূপে দেখা দিয়েছে তার সম্বন্ধে তিনি বারবার সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। এই সাবধানবাণী কবির দার্শনিক প্রজ্ঞার নিদর্শন। আরও দু একটি উদাহরণ নেয়া যাকঃ

য়ুরােপীয়েরা আবিষ্কার করেছিল গােপন রহস্য যদিও বিজ্ঞ লােকেরা তা প্রকাশ্যে বলেনি- ডেমােক্রাসি হ’ল সেই রাষ্ট্রবিধান
যাতে মানুষকে গােনা হয়,
ওজন করা হয় না । [৯]

রাষ্ট্রশক্তি মুক্ত হল চার্চের হাত থেকে ,
য়ুরোপীয় পলিটিকস সেই দানব যার শিকল কেটেছে;
কিন্ত অন্যের সম্পত্তি যখন দানবের চোখে পড়ে ,
চার্চের দূতেরা চলে যুদ্ধবাহিনীর আগে আগে।[১০]

রাজতন্ত্র কিংবা গণতন্ত্র যাই হোক না কেন
দীন থেকে পৃথক হলে তা চেঙ্গেজীই হবে জেন ।[১১]

গ্রন্থঋণঃ

[১] পায়ামে মাশরিক থেকে । উদ্ধৃতঃ অমিয় চক্রবর্তী শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। ঢাকা : মওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৮।
[২] Wilfred C. Smith, Modern Islam in India. Delhi. Usha Publications, 1979.
[৩] উদ্ধৃতঃ সৈয়দ মুজফফর হােসেন বারনী, ইকবাল।
অনুবাদ : দেবী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।
কলকাতাঃ সাহিত্য অকাদেমী, ১৯৯৮।
[৪] রমুজে বেখুদী থেকে । উদ্ধৃতঃ রুদ্রপ্রতাপ চট্টোপাধ্যায়, প্রাচ্যের কবি ইকবাল।
কলকাতাঃ অমৃতশরণ প্রকাশন, ১৪০৯।
[৫] C. W. C. Smith, Modern Islam in India
[৬]বাঙ্গ-ই-দারা থেকে। উদ্ধৃতঃ মুহম্মদ হবীবুল্লাহ, কবি ইকবাল। কলিকাতঃ বুলবুল হাউস ।
[৭]উদ্ধৃতঃ মীযানুর রহমান (সম্পাদনা), ইকবাল : দেশে বিদেশে। ঢাকা ইকবাল
একাডেমী, ১৩৭৪।
[৮]বাল-ই-জিব্রীল থেকে । উদ্ধতঃ অমিয় চক্রবর্তী, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ।
[৯] যরবে কলীম থেকে। উদ্ধৃতঃ অমিয় চক্রবর্তী, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ।
[১০] পূর্বোক্ত ।
[১১] উদ্ধৃতঃ মীযানুর রহমান (সম্পাদনা), ইকবাল : দেশে বিদেশে।

লেখক পরিচিতিঃ
ফাহমিদ-উর-রহমান
মননশীল লেখক, প্রাবন্ধিক
বুদ্ধিজীবি

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.