Shama and Shayer - Muhammad Iqbal

শায়ের

কাল রাতে মাের মােমবাতিরে বলনু ডেকে মাের পাশেঃ
পতঙ্গরা কতই আসে তােমার রঙিন কেশ-পাশে।মেঠো ফুলের মতন নীরব একলা জ্বলে আমার দ্বীপ:
নাইক’ আমার কুঞ্জ-ভবন, নাই জলসার খুশ-নসীব ।
তােমার মতই জ্বলছি আমি, ফেলছি কতই অশ্রুজল;
কেউত’ তাতে দেয় না সাড়া, দহন আমার হয় বিফল
কত রঙিন স্বপ্ন ও সাধ জেগে আছে মাের প্রাণে, তবুত’ কেউ দিল-দিওয়ানা আসে না মাের সন্ধানে!
কোথায় পেলে এই জৌলুস দূর আকাশের সুর-মেশা
মুসার মতন পতঙ্গদের চক্ষে দিলে রূপ নেশা?

শামা

যে-নিশ্বাসের তরঙ্গ-দোল মৃত্যু আনে মাের তরে, সে-নিশ্বাসই তােমার ঠোটে ছন্দ সুরে গান করে। দহন-সে ত’ স্বভাব আমার, অন্য আশা নাই ক’তায়,
পতঙ্গদের মন-ভুলানাে তােমার শিখার অভিপ্রায়। আঁসুর তুফান অন্তরের মাের, তাই বহে মাের অশ্রুধার,
শিশির সম অশ্রু তােমার-ফুল-ফোটানােই লক্ষ্য তার !

প্রভাতে তাই সার্থক হয় আমার রাতের রক্তদান, অনিশ্চিত সম্ভাবনায় গাইছ তুমি তােমার গান । লােক-দেখানাে কাঁদন, সাচ্ছা দরদ নাই হিয়ায়, তােমার আলাে তাইত’ মাঠের লালা-ফুলের প্রদীপ প্রায়।
ভেবে দেখ, মােতার মুখে সাজে কি আর সাকীর নাম?
মাহফিল্ ত’ প্রেম-পিয়াসী, কোথায় তােমার শরাব-জাম?
ধর্ম-স্বভাব তােমার সে এক, করছ তুমি আর-এক কাজ,
তােমার ঝুটা বদ্ চেহারায় আর্শিও তাই পায় যে লাজ ।

বগল-তলে কা’বা তােমার তুমি প্রেমিক বুৎখানার, তবু তুমি বে-পরােয়া-লজ্জা-শরম নাই তােমার? কায়েস কভু জন্মাবে না তােমার প্রেমের মাহফিলে,
লায়লা কভু আসবে না ক’ তােমার ছােট মঞ্জিলে।

ঢেউ-এর দোলায় জন্ম তােমার, হে দরিয়ার লাল মােতি।
তুফান তােমার নাই ক’ এখন তাই তােমার এই দুর্গতি।
কী ফল বল তােমার গানে বিরান যখন গুলিস্তান?
তােমার গানের নয় এ সময়, তােমার গানের নয় এ স্থান।
ছিলো যারা প্রেমিক তারা নিয়েছে আজ সব বিদায়,
এখন তুমি দাওয়াৎ দিলে কেউ কি তাতে আসবে হায়!

সভা যখন ভেঙে গেছে, বিদায় নেছে প্রেমিক দল, তখন তুমি শরাব- হাতে আসলে কী আর ফলবে ফল?
শুকিয়ে গেছে ফুল যেখানে, ব্যর্থ সেথায় সকল গান;
দখিন হাওয়া এলেই বা কী ?
সাড়া দেবে কাহার প্রাণ?
রাতের শেষে হাজার তারার কুরবানি হয় আকাশ-গায়,
সকাল বেলার ছাদ থেকে কি সেই ছবি কেউ দেখতে পায়?
পতঙ্গদের কাম্য যে-রূপ, নাই তােমার সেই রূপ উজল,
প্রেমিক যদি আসেই এখন, কী ফল তাতে সব বিফল!

ঘুমিয়ে গেছে ফুলকুঁড়িরা, তােমার বাঙ্গ-ই-দারা শুনবে কে?
প্রেমিক হয়েও দিল্ যে তােমার নয়ক ব্যথায় রঞ্জিত,
পতঙ্গরা তাইত’ তােমার সেই বেদনায় বঞ্চিত । তসবী-মালার দানাগুলাে ছড়িয়ে কেন রয় এখন
বিদায় নেছে দুঃসাহস আর আকাশচারী তােমার জ্ঞান,
দিওয়ানা নাই, জ্ঞানীও নাই, তােমার সভা তাই বিরান।
অন্তরে নাই দহন তােমার, রূপ-শরাবও নাই ক’ আর;
পতঙ্গদের চাইছ কেন?
তাদের তােমার কী দরকার?
সাকী তুমি, মানছি আমি, করবে কারে শরাব দান?
শরাব -খানা কোথায় তােমার?
করবে কে আর শরাব পান ?
কাল ছিল যে শরাব-রঙিন,
আজ ভাঙা সেই পাত্র হায়,
নীরবে সে কাঁদছে বসে তােমার প্রেমের আস্তানায়!
আশিক-মাশুক ছিল যেথায়, বাজত যেথায় প্রেমের বীণ,
পুরানাে সেই খানকা এখন মলিন মুখে কাটায় দিন।

এই কাফেলা স্তব্ধ এখন, উঠছে না তার চলার গান,
আফসােস! তার ধ্বংস দেখে কাঁদছে না আজ কারােই প্রাণ।
কালকে যারা করলাে আবাদ বিরান মুলুক এ- বিশ্বের,
তাদের আপন আবাদ-ভূমিই বিরান হল আজকে ফের !
যে নামাজে উঠত নিজে বিজয়-বাণী তৌহিদের, আজ সে নামাজ ঠিক যেন সে অঞ্জলি ভাই ব্রাহ্মণের!
শান্তি ও সুখ আইন-কানুন শৃঙ্খলারই মধুর দান, তরঙ্গদের স্বাধীনতাই তরঙ্গদের মৃত্যুবান।
যাদের দিদার পাবার আশায় ব্যাকুল ছিল খুদার নূর,
খুদার রহম তাদের থেকে আজকে দেখি অনেক দূর।
হাজার হাজার বুলবুলি যার উড়ত সুখে আসমানে,
কোন খেয়ালে বাসায় এসে বসল তারা- কে জানে!
বিশ্ব-নয়ন ঝলসে দিত বিজলি-চমক যাদের হায়, মেঘস্তুপের মধ্যে সে আজ শান্ত হ’য়ে ঘুমিয়ে যায়!

ফুলের শােভা দেখতে কেন যাব আমি ফুলবনে? আঁচল -ভরা ফুল যে আমার অশ্রুধারার বর্ষণে।
সুবহে-ঈদের দিচ্ছে খবর আজকে মােদের দুখের সাঁঝ ,
আশার আলাে দেখছি দূরে আঁধার-রাতের বুকের মাঝ ।
হেজায -ভূমির প্রেমিক যারা, শােন সে এক খুশ খবরঃ
গাফিলরা সব জাগছে আবার অনেক দিনের ঘুমের পর ।

আপন মানের মূল্যে তুমি কিনতে পরের দ্রব্যভার,
তােমার মালের দোকানে আজ জুটছে আবার খরিদ্দার ।
পড়ছে টুটে যাদুর মায়া অপর জাতির তাহজীবের,
বিপ্লবী এক নূতন আওয়াজ শুনছি দূরে ইসলামের ।
বিশ্ববাসী চাইছে এখন তােমার নূতন প্রেম-শরাব, মাগরিবী ওই শরাব তাদের করেছে ভাই দিল খারাব ।
চুপ থেকো না এখন তুমি, নগমা শুনাও-হও প্রকাশ ।
অরুণ-আলাের শরাব কাঁধে ওই আসে ভাই পুব-আকাশ ।
পরের ব্যথা বুঝতে শিখ,ব্যথার ব্যথী হও তাদের,
মন দিয়ে আজ গ্রহণ কর এই বাণী মাের অন্তরের।
শায়েরী- সে নবুয়তের অংশ- তাহার অনেক দাম,
মিল্লাতের এই মাহফিলে দেই ফিরিশতাদের সে-পয়গাম ।

নূতন কিছু দেখাবে-এই দিবি দিয়ে তােমার চোখ
দাও খুলে আজ, সৃষ্টি কর নূতন আশার স্বপ্নলোক।
বিলাসিতার মায়ায় তােমার শক্তি-সাহস নাই মনে,
দরিয়া ছিলে তেপান্তরে, ঝর্ণা হলে ফুলবনে!
নিজ স্বভাবে ছিলে যখন, শান্ত ছিল দিল তােমার;
গন্ধ যখন ফুলহারা হয়, তখনই হয় বে-কারার । বিচিত্র এই মানব-জীবন, ঠিক যেন একবিন্দু জল,
কভু শিশির, কভু আসু কভু বা সে মুক্তা ফল। আবার গড় জীবন তােমার, জীবন অতি মূল্যবান;
একঘেয়ে যে স্তব্ধ-জীবন, কে করে তার কদর দান?
ঐক্য যখন ছিল তােমার, আসন ছিল মর্যাদার
ঐক্য যখন গেছে তােমার, শেষ নাহি আর লাঞ্ছনার।
মর্যাদা পায় ব্যক্তি যখন রয় সে বুকে মিল্লাতের
ঢেউ-এর মরণ হয় তখনি-বাইরে এলে সমুদ্রের ।
অন্তরেতে গােপন রাখাে তােমার শরাব মুহাব্বৎ।
বােতল মাঝে বন্দী হয়ে হও কেন ভাই বেইজ্জত। মুসার মতন তাঁবু ফেলে থাকো আপন দিল-সিনায়,
ভুল করাে না অন্ধকারে তােমার আলাের অন্বেষায় ।

জানুক প্রদীপ শেষ নতীজা কী আনে তার অত্যাচারঃ
পতঙ্গদের ছাই এর পরেই ভিত্তি রচে প্রভাত তার।
চাও যদি মান, সাকীর কাছে চেয়াে না আর শরাব ফের;
সাগর বুকেই থাক পিয়ালা উপুড় করা বুদ্বুদের।

পুরাতন এই শুষ্ক মাঠের নাইক’ কোনই আকর্ষণ,
নূতন যমীন আবাদ কর- আছে তােমার সখ যখন।
মাটির লেখা ভাগ্যে তােমার আছেই যখন পরিষ্কার,
বীজের মতন মাটি হতেই উর্ধ্বে তােল শির তােমার।
পুরাতন এই বৃক্ষ- শাখায় রচ আবার নূতন নীড়,
মন – মাতানাে গান গেয়ে এই মাহফিলে ফের জমাও ভীড়।
এই বাগিচার বুলবুলি হও, না হয় ত’ হও খামুশ” ফুল ,
হয়ত কাঁদো কাঁদার মতন, নয়ত ধর অন্য কূল!শিশির সম চুপটি করে থাকবে কেন গুলশানে।

বিশ্ব-বীণার সুর যে তুমি, দাও দোলা আজ সব প্রাণে ।
কিষান, তােমার হােক পরিচয় আপন হকিকতের সাথ-
বিজও তুমি, ক্ষেতও তুমি- ফসল-ফলান তােমার হাত।

কাল তালাশে আজকে তুমি পথ হারালে, জানত চাই,
পথিক তুমি, পথও তুমি, মঞ্জিলও ত’ তুমিই ভাই!
তুফান ভয়ে আজকে তােমার দিল্ কেন ভাই হয় আকুল?
মাঝি তুমি, দরিয়া তুমি, কিশতি তুমি, তুমিই কূল। মনের গােপন গহন-তলে দৃষ্টি মেলে দেখনা তুই-
লায়লা-কায়েস্ মেহরাব-মাঠ-তুই-ই যে ভাই সব-কিছুই।
ওরে নাদান, আজকে তুমি করছ সাকীর পায়রবী।
সাকী শরাব মহফিল জাম- তােমার মাঝই রয় সবি।
অগ্নি-শিখা তুমি যে ভাই, অসত্য সব জ্বালিয়ে দাও,
মিথ্যারে ভয় করবে কেন? সত্য-আলাের গান সে গাও ।

যুগ-যমানার আর্শি তুমি, রাখ কি ভাই তার খবর? তুমি খুদার শেষ-পয়গাম-থাকবে কায়েম নিরন্তর। সঠিক স্বরূপ চেনাে তােমার, ওরে নাদান অর্বাচীন,
কাৎরা তুমি, তবু তুমি, সমুদ্র- সে অন্তহীন। অক্ষমতার মন্ত্রে তুমি থাকবে কেন ভয়-বিভল? ঘুমিয়ে আছে তােমার মাঝে অসীম সাহস মনের বল ।
আঁ-হুযুরের প্রিয় বাণীর রক্ষক সে দিল তােমার, জগত মাঝে জাহির-বাতিন আজও শাসন চলছে যার।
তেগ -তলােয়ার ছাড়াই যারা বিশ্ব-জাহান করল জয়,
সেই হাতিয়ার আজ আছে তােমার কাছে, কিসের ভয়?
ফারান-গিরির স্তব্ধতা দেয় সাক্ষ্য আজও সইে কথার,
ওরে গাফিল, মনে কি নাই সেই সেদিনের অঙ্গীকার
মূর্খ তুমি, গােটা কতক ফুলেই তােমার ভরল, প্রাণ!
চাইতে যদি, মিলত তােমার সবটুকু এই ফুল-বাগান।

আমার কথার অন্তরালে পাচ্ছে প্রকাশ মাের বেদন –
বোতল-মাঝে শরাব যেমন প্রকাশ হয়েও রয় গােপন।
প্রজ্বলিত সুরের আগুন জ্বালিয়ে দেছে জীবন মাের,
লক্ষ্য আমার এই জীবনের তাই ত’ দহন অশ্রুলোর ।
অগ্নি-সুরের ভেদ বুঝে নাও আমার গােপন অন্তরের,
আমার দিলের আর্শিতে ভাই মুখ দেখে নিজ তকদীরের।

প্রভাত-আলােয় রঙিন হবে মােদের আকাশ-তল আবার,
দূর হবে এই মরীচিকা-রাতের কালাে অন্ধকার। শীতের শেষে বসন্তবায় আবার এসে গাইবে গান, ফুল-কুঁড়িরা ফুটবে আবার, হাসবে আবার গুলিস্তান।
এই বাগানের ফুলের সাথে মিশবে আরও অনেক ফুল
দুলবে আবার শাখায় শাখায় ভােরের বায়ু দোদুলদুল।
আমার ঝরা শবনমে ভাই জাগবে ব্যথা ফুলবনে,
ফুল-কুঁড়িরা মেলবে আঁখি নূতন আশার স্পন্দনে।
চলবে ব’য়ে চিরদিনের গতি-স্রোত এই সমুদ্রের,
এই গতি-বেগ রুদ্ধ করার শক্তি নাই তরঙ্গের । ধর্ম-নীতির পড়বে ছায়া সবার মনের অংগনে, শির লুটাবে আবার সবাই কারা-ঘরের প্রাঙ্গণে। শিকারীদের আওয়াজে ফের উঠবে জেগে সব পাখী,
দুশমনদের রক্তে রাঙা হবে আবার ফুল-সাকী । ভাষায় ধরা দেয় না আমার মনের কোণের গােপন ভাব,
এই দুনিয়ায় আসছে আবার নও-যমানার ইনকিলাব ।
দূর হবে এই রাতের আঁধার, সূর্য হেসে উঠবে ফের-
এই বাগিচা মুখর হবে সুরে সুরে তৌহীদের।

তথ্য সূত্র: আল্লামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা
বাঙ্গেদারা
মােহাম্মদ ইকবাল

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.