The Three Chapters of the Language Movement - Mohammad Abdul Mannan

মানুষ ভাষার সাহায্যে ভাব প্রকাশ করে। ভাষার মাধ্যমে গুছিয়ে চিন্তা করে। তার সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভাবধারা প্রকাশ পায় ভাষার মাধ্যমে। মানুষের আবেগ-অনুভূতি সঞ্চিত হয় ভাষার ভাণ্ডারে । অন্য প্রাণীরাও শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। সে ভাষায় তারা তাদের আবেগ-অনুরাগ, আনন্দ-বেদনা, ভয়-বিস্ময়-ক্রোধ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু বাক্য গঠন ও ভাষার নির্মাণ মানুষদের কাজ। মানুষ তার চাহিদামতো ভাষাকে নির্মাণ ও বিকশিত করে। এটা তাদের মানবিক বৈশিষ্ট।

ভাব প্রকাশের প্রবাহ ব্যাহত হলে ব্যক্তির মানসিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে জাতির বিকাশধারা রুদ্ধ হয়। সমাজ ও সভ্যতার বিকাশধারায় ভাষার ভূমিকা তাই প্রত্যক্ষ এবং শক্তিশালী। এ কারণে বিভিন্ন দেশে আধিপত্যবাদী শক্তি জনগণের মুখের ভাষাকে প্রভাবহীন করে দেয়ার চেষ্টা চালায়। বাংলাদেশের জনগণের ভাষার বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদের এ বৈরিতা নানা সময়ে প্রবল এবং কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ভাষার গৌরব রক্ষায় এ দেশের মানুষ যুগে যুগে সংগ্রাম করেছেন। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জীবনপাত করার গৌরব বাংলাদেশ ছাড়া আর কেবলমাত্র বুলগেরিয়ার জনগণেরই রয়েছে।

ভাষার লড়াইয়ের তিন অধ্যায়ঃ

আমাদের ভাষার লড়াই কেবল ঊনিশ’শ বায়ান্নর ঘটনার মধ্যে সীমিত নয়। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনা হয় উনিশ’শ সাতচল্লিশ সালে। আটচল্লিশ সালেই তা’ একটি পরিণত পর্যায়ে উপনীত হয়।

সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্নর মুদ্দতে পরিচালিত আন্দোলনই ভাষার প্রশ্নে আমাদের সংগ্রামের একমাত্র ইতিহাস নয়। এ জনপদের মানুষের ভাষার লড়াই তাদের ভাষার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। এ দেশের মানুষকে বিভিন্ন যুগে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব, কৃষ্টিক স্বাতন্ত্র্য ও আর্থ-সামাজিক অধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়েছে। তাদের এই লড়াইয়ে সাম্প্রতিক কালের ন্যায় অতীতেও ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। এ জনপদের মানুষের মুখের ভাষার এই লড়াইকে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অভিহিত করেছেন ‘অভিজাততন্ত্র’ ও ‘গণতন্ত্রের’ মধ্যকার রাজনৈতিক লড়াইরূপে।

এ লেখায় আমরা আমাদের ভাষার সংগ্রামকে তিনটি ভাগে চিহ্নিত করে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। প্রথম পর্যায়ে এখানে প্রাচীন কাল থেকে পাল আমলের পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ আট শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়কাল এবং পাল শাসনের পরবর্তী সেন-বর্মন যুগ, দ্বিতীয় পর্যায়ে ইংরেজ আমল এবং তৃতীয় পর্যায়ে পাকিস্তান আমলের ভাষা আন্দোলনের ওপর আলোকপাত করবো। পাল শাসনকাল ও মুসলিম শাসনামল এ দেশের জনগণের মুখের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের যুগ হিসেবে চিহ্নিত। সবশেষে আমরা বাংলাদেশ আমলে বাংলা ভাষার অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করবো।

আর্য ভাষার আগ্রাসনঃ

বাংলাদেশের ধারাবাহিক ইতিহাস থেকে দেখা যায়, এই পাললিক জনপদের সংগ্রামী মানুষে কোন শক্তির কাছে কখনো সামরিক পরাভব মানেনি। ইতিহাসের কোন কোন পর্যায়ে তাদেরকে পরাজয়ের যে ক্লেশ সহ্য করতে হয়েছে, তা সামরিক ফ্রন্টে নয়, সংস্কৃতির ঘোরপথে। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের পরাজয়ই কখনো কখনো তাদেরকে রাজনৈতিক গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করেছে।

ইতিহাসে এ জনপদের মানুষের প্রথম সংঘাতের ঘটনা পাওয়া যায় আর্যদের সাথে। মোহেনজোদাড়ো ও হারাপ্পা সভ্যতা ধ্বংস করে আর্যরা তাদের প্রভাব বাড়াতে বাড়াতে আরো পুব দিকে এগিয়ে আসে। এরপর বাংলাদেশে তারা অভূতপূর্ব প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়। অধ্যাপক মন্মথমোহন বসুর ভাষায় : “সমস্ত উত্তর ভারত যখন বিজয়ী আর্য জাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল, বঙ্গবাসীরা তখন সর্ব মস্তক উত্তোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইল।” (বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ)

এ দেশের জনগণের প্রতিরোধের মুখে আর্যদের সামরিক আগ্রাসন ব্যর্থ হয়। এ পটভূমিতেই মনু সংহিতায় বিধান দেয়া হলো:

‘অঙ্গবঙ্গ কলিঙ্গেষু সৌরাষ্ট্র মগধেষু চ।
তীর্থ যাত্রাং বিনা গচ্ছন পুন: সংস্কার মর্হতি।’

‘দেবতা’ ও ‘অসুরে’র লড়াইঃ

এরপর আর্যরা এদেশে ঘোরপথে অগ্রসর হয়। আর্য ক্ষত্রিয়দের বদলে আর্য ব্রাহ্মণরা বেদান্ত দর্শন প্রচারের নামে তীর্থযাত্রীরূপে এদেশে আসতে থাকে। এ পথেই তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিজয় সম্পন্ন হয়। এর পরই খৃষ্টপূর্ব চার শতকে এখানে মৌর্য রাজবংশের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মৌর্য শাসনামল থেকেই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বাড়তে থাকে। তারপর চার ও পাঁচ শতকে গুপ্ত শাসনামলে আর্য ধর্ম, আর্য ভাষা ও আর্য সংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রত্যক্ষভাবে শিকড় গাড়ে।

বিদেশাগত বৈদিক আর্য ব্রাহ্মণরা দাবি করতো যে, তারা দেবতার আশ্রিত ও আশীর্বাদপুষ্ট। তারা এদেশের জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সাধারণ জনগণের ভাষায় কথা বলতো না। জনগণের ‘লৌকিক’ ভাষাকে তারা ‘অপভাষা’ বা ‘অসুরের ভাষা’ বলে অবজ্ঞা করতো। এ বৈরি পরিস্থিতি এদেশের জনগণ সাহসিকতার সাথে মুকাবিলা করেন। ‘দেব-ঋষি’দের ধর্মের দোহাই তারা অগ্রাহ্য করেন। এ প্রতিরোধের ফলে আর্য ব্রাহ্মণদের বৈদিক ভাষা জনগণের মুখের ভাষারূপে ঠাঁই পায়নি। এভাবে অভিজাততন্ত্রী ব্রাহ্মণদের ভাষানীতি গণতন্ত্রী জনগণের ভাষাপ্রীতির কাছে সে যুগেও মার খেয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ব্রাহ্মণরা জনগণের লৌকিক ভাষাকেই ‘মেজে-ঘষে জাতে তোলা’র নামে সংস্কৃত করে নেন। কিন্তু বাংলার জনগণ সে সংস্কৃত ভাষার পথ মাড়াতেও রাযী হননি। জনগণ তাদের লৌকিক ভাষাকে প্রাকৃতরূপে উন্নত করেন। তার প্রতিক্রিয়ারূপে ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা প্রাকৃতভাষী এ জনপদের মানুষকে ম্লেচ্ছ, পক্ষী, ইতর বলে গালমন্দ করেন। জনগণের মুখের ভাষার বিরুদ্ধে তারা নিষেধের মন্ত্র উচ্চারণ করেন: “ন ম্লেচ্ছ ভাষা শিক্ষেত”। অর্থাৎ ম্লেচ্ছদের ভাষা শিখো না। এ শাস্ত্রীয় নিষেধ উপেক্ষা করে তখনকার আমাদের পূর্বপুরুষ দ্রাবিড় জনগণ পরম উৎসাহে প্রাকৃতের চর্চা অব্যাহত রাখেন।

বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশঃ

এই গণ-চেতনাকে ধারণ করেই এ দেশে সে সময় বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ঘটে। বৌদ্ধ ধর্ম এ এলাকার গণভাষাকে সমৃদ্ধ করার সাথে সাথে জন-সমর্থনে পুষ্ট হয়ে এ দেশে এক বিরাট শক্তিতে পরিণত হয়। এ আমলের গৌড় প্রাকৃত থেকেই আমাদের বাংলা ভাষার পূর্ববর্তী স্তরের গৌড় অপভ্রংশের উৎপত্তি হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’য় এ অপ্রভ্রংশ যুগের সূচনা কাল পাঁচ শতকেরও আগে বলে উল্লেখ করেছেন।

গুপ্ত যুগের দু:শাসনের পর সাত শতকের মধ্যভাগ থেকে আট শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় এক’ শ বছর বাংলাদেশে ঘোরতর অরাজক পরিস্থিতি বহাল থাকে। ইতিহাসে এ যুগ ‘মাৎস্যান্যায়’ বা মাছের নীতির যুগ নামে পরিচিত। এই অরাজক পরিস্থিতিতে ব্রাহ্মণরা জনগণের ওপর সংস্কৃত ভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।

পাল আমলঃ সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের ধুয়া

আট শতকের মধ্যভাগে ৭৫০ খৃষ্টাব্দে জন-সমর্থনের ভিত্তিতে গোপালের নেতৃত্বে পাল শাসনের প্রতিষ্ঠা ঘটে। এর ফলে শত বছরের মাৎস্যান্যায়ের অরাজক পরিস্থিতির অবসান হয়। পালদের চার’ শ বছরের শাসনামল বাংলার ভৌগোলিক সত্তা এবং বাংলা লিপি ও ভাষার বিকাশ এবং বাংলার মানুষের আত্ম-আবিষ্কার ও আত্ম-প্রতিষ্ঠার যুগ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত। এ যুগের নয় ও দশ শতকের জনগণের মুখের ভাষাকেই বিশেষজ্ঞগণ প্রাচীনতম বাংলা ভাষারূপে চিহ্নিত করেছেন। এই যুগই বাংলা ভাষার সৃজ্যমান কাল। পাল আমলে বাংলাদেশ পূর্ব ভারতীয় বৌদ্ধদের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল।

পাল শাসনের শেষের দিকে আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের নামে বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও বৌদ্ধধর্মের সাথে হিন্দু ধর্ম ও বৈদিক সংস্কৃতির মিলমিশাল বা আদর্শিক সমন্বয়ের নামে এক চতুর কৌশল অবলম্বন করে। তাদের তথাকথিত সমন্বয়ের আদর্শের কাছে পাল রাজাদের অবচেতন আত্মসমর্পণের কারণেই বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ রাষ্ট্র বিপর্যয়ের সম্মুখিন হয়। জাতির সাংস্কৃতিক সীমানা পাহারা দেয়ার ক্ষেত্রে পাল রাজাদের দুর্বলতা ও অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে এখানে জেঁকে বসলো কর্ণাট দেশীয় সেন শাসকরা।

সেন শাসন ও রৌরব নরকঃ

প্রায় দেড়’ শ বছরের সেন-বর্মন শাসনামল ছিল বাংলার ইতিহাসের ঘোরতর দুর্যোগকাল। এই শাসনামলে বাংলাদেশের হাজার বছরের সংস্কৃতিতে আনা হয় আমূল পরিবর্তন। ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায় : ‘‘সেন-বর্মন রাষ্ট্রকে অবলম্বন করেই বাংলাদেশে ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা একাধিপত্য ও একনায়কত্ব বিস্তারে সমর্থ হয়’’।

সেন-বর্মন শাসনামলে মানুষকে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অধীন করার চেষ্টা চলে। সে চেষ্টার অংশ হিসেবে জনগণের মুখের ভাষার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন-বর্মন শাসকরা সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং সৃজ্যমান বাংলা ভাষার বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেন। সে রুদ্ধ দুয়ার দিয়ে প্রবেশ করা দূরে থাক, উঁকি মারাও মহাপাপ বলে ব্রাহ্মণরা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তারা বিধান দিলেনঃ

“অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ
ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ”

অর্থাৎ অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ-মহাভারত যে মানব বাংলা ভাষায় শুনবে তার ঠাঁই হবে ভয়াবহ রৌরব নরকে।

বাংলা ভাষার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সংস্কৃতের চাষঃ

জনগণের মুখের ভাষাকে এই সংস্কৃত পন্ডিতরা অপবিত্র, ইতর আর পক্ষীর ভাষা বলে গাল দিলেন। তাদের চোখে এ দেশের সাধারণ মানুষ স্লেচ্ছ, দস্যু, দাস, পক্ষী আর ইতর। তাই তাদের ভাষা পরিত্যজ্য। পাল আমলের সদ্যোজাত বাংলা ভাষার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে ‘বিশুদ্ধ ব্যাকরণসম্মত’ সংস্কৃত লেখা হতে থাকলো। এই আমলের বাংলা ভাষার দুরবস্থার কথা তুলে ধরে ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন: “ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গ ভাষাকে পন্ডিতমন্ডলী “দূর দূর” করিয়া তাড়াইয়া দিতেন, হাড়ি-ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন, বঙ্গ-ভাষা তেমনই সুধীজনের অপাংক্তেয় ছিল, তেমনি ঘৃণার, অনাদরের ও উপেক্ষার পাত্র ছিল।” (সওগাত, চৈত্র, ১৩৩৫)

দেশান্তরী বাংলাভাষাঃ

ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে বাংলা ভাষার চরম দুর্গতির বিবরণ দিয়ে অধ্যাপক দেবেন্দ্রকুমার ঘোষ ‘প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস’ বইয়ে লিখেছেন: “পাল বংশের পরে এতদ্দেশে সেন বংশের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চিন্তা অতিশয় ব্যাপক হইয়া ওঠে ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রবাহ বিশুষ্ক হইয়া পড়ে। সেন বংশের রাজারা সবাই ব্রাহ্মণ্যধর্মী, তাহাদের রাজত্বকালে বহু ব্রাহ্মণ বঙ্গদেশে আসিয়া বসতি স্থাপন করে ও অধিকাংশ প্রজাবৃন্দ তাহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। এভাবে রাজা ও রাষ্ট্র উভয়ই বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ হইলে বাংলার বৌদ্ধরা স্বদেশ ছাড়িয়া নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি পার্বত্য দেশে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। বাঙ্গালার বৌদ্ধ সাধক কবিদের দ্বারা সদ্যোজাত বাঙ্গালা ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলোও তাহাদের সঙ্গে বাঙ্গালার বাহিরে চলিয়া যায়। তাই আদি যুগের বাঙ্গালা গ্রন্থ নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য।” (পৃ. ৯-১০)

নেপাল থেকে পুঁথি উদ্ধারঃ

ব্রাহ্মণ্য নিপীড়নের মুখে সে যুগের বাংলা ভাষার বহু সাহিত্যকর্মী দেশের মাটি থেকে উৎখাত হয়েছিলেন। তাদের সে ভাষার সামান্য কিছু নমুনাও এতদিন আমাদের চোখের আড়ালে ছিল। ১৯০৭ সালে ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে চর্যাপদ নামে পরিচিত প্রাচীনতম বাংলা ভাষার চারটি পুঁথি সংগ্রহ করে আনেন।

দশ থেকে বারো শতকের মধ্যে রচিত এ চর্যাপদগুলোতে সে আমলের ব্রাহ্মণ্য নিপীড়নে বিপর্যস্ত সমাজের চিত্র পাওয়া যায়। এসব রচনার সাহিত্যিক মূল্যও বিপুল। এ সব চর্যা সাহিত্যের একটি নমুনা হলোঃ

“উঞ্চা উঞ্চা পাবতা,
তহি বসই শবরী বালী
সোরঙ্গী পিচ্ছ পরহিন,
গিমদ গুঞ্জরী মালী।”

এর আধুনিক বাংলা করলে দাঁড়ায়, “উঁচু-উঁচু পর্বত, সেখানে শবরী বালিকা বাস করে। সে ময়ূর-পুচ্ছ পরিহিতা, তার গলায় গুঞ্জীর মালা”।

সেন আমলে লক্ষণ সেনের দরবারে ভীড় ছিল জয়দেব, ধোয়ী, হলায়ুধ মিশ্র, উমাপতি ধর প্রমুখ সংস্কৃত পন্ডিতদের। রাজসভায় বা মন্দিরে নর্তকীরা জয়দেবের ‘প্রিয়ে মুঞ্চময়ী মান মন্দিরানাং’ গেয়ে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করতো। সেখানে দেশী ভাষার কোন ঠাঁই ছিল না।

ইসলাম প্রচারকদের হাতে বাংলা ভাষার প্রদীপঃ

এই অবস্থার মধ্যেও সে সময় বাংলা ভাষা চর্চার একটি ক্ষীণ ধারা তখন বিদ্যমান ছিল। ইসলাম প্রচারকগণ টিকিয়ে রাখেন বাংলা ভাষার ধারা। সে সম্পর্কে ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন : “ইসলাম প্রভাবে প্রভাবান্বিত কিছু লোক বোধ হয় বাংলার কোথাও কোথাও সেই প্রাকৃতধর্মী বৌদ্ধ সংস্কৃতের ধারা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন : সেক শুভোদয়া গ্রন্থের ভাষায় তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।” (বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, পৃ. ১৭৬)

‘ইসলাম প্রভাবে প্রভাবান্বিত’ এই ‘কিছু কিছু লোক’ সম্পর্কে ধারণা পেতে কষ্ট হবার কথা নয়। ইসলাম প্রচারের মক্কী যুগেই এ জনপদে তার ঢেউ এসে লেগেছিল। এর পর থেকে বখতিয়ার খিলজীর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ’ শ বছর এদেশে ইসলাম প্রচারকদের আগমনধারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। তাঁরা প্রত্যন্ত এলাকায় ইসলামের সাম্য ও মুক্তির বাণী প্রচার করেন। সেন-বর্মন যুগের ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং জাতিগত ও অর্থনৈতিক শোষণে বিপন্ন তখনকার মযলুম দ্রাবিড় বাঙালীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ইসলাম প্রচারকগণ। শুরু থেকেই ইসলাম প্রচারকগণ জনগণের মুখের ভাষাকে অবলম্বন করেছিলেন। এ কথার সত্যতা ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। শশাংক -হর্ষবর্ধনের সময় থেকে শুরু করে মাৎস্যান্যায় যুগের অন্ধকার ভেদ করে বাংলায় ব্রাহ্মণ্য নির্যাতনের ঝঞ্ঝা-তাড়িত সময়টিতে এসে ইসলাম প্রচারকদের নেতৃত্বে বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের একটি নতুন ধারাও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলো।

জননন্দিত বিজয়ঃ

ইসলাম প্রচারকগণ মযলুম জনগণের পক্ষের শক্তিরূপে যালেম শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে রুখে দাঁড়াচ্ছিলেন। দশ ও এগারো শতক থেকে ইসলামের মুক্তিমন্ত্র গুঞ্জরিত হচ্ছিল গৌড় থেকে চট্টগ্রাম এবং সিলেট থেকে মঙ্গলকোট পর্যন্ত। ইসলাম প্রচারক সুফী-দরবেশ-মুজাহিদগণ জনগণকে সাথে নিয়ে বর্ণাশ্রয়ী ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসনের শিকল-বেড়ি ভাঙার জন্য সংগ্রাম পরিচালিত করেন। সে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রতি জনগণের সমর্থন গড়ে ওঠে। জনসমর্থনের সেই দৃঢ় ভিত্তির ওপরই বাংলায় মুসলিম বিজয় সম্পন্ন হয়।

মুসলিম বিজয় বাংলার জনগণের প্রত্যাশাকে বিপুলভাবে ধারণ করেছিল। তার উল্লেখ পাওয়া যায় তেরো শতকের ‘শূন্য পুরাণ’-এর লেখক বৌদ্ধকবি রামাই পন্ডিত থেকে শুরু করে আধুনিক কালের ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনসহ অনেকের লেখায়। এ প্রসঙ্গে ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আধিপত্যবাদী নির্মূল অভিযানের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বাংলার মুসলিম বিজয়কে দু’বাহু বাড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল। (বৃহৎবঙ্গ, পৃ. ৩৩৩)

মুসলিম বিজয় ও বাংলাভাষার ‘দ্বিতীয় জন্মঃ'

বাংলায় মুসলিম বিজয়ের ফলে এ দেশের মানুষের মুখের ভাষা অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। এ প্রসঙ্গে ডক্টর এম.এ. রহীম লিখেছেনঃ

“মুসলিম বিজয় ছিল বাংলার প্রতি বিরাট আশীর্বাদস্বরূপ, যা বাংলা ভাষাভাষী লোকদেরকে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যমঞ্চে সংঘবদ্ধ করে, বাংলা ও বাঙ্গালীর ইতিহাসের ভিত্তি স্থাপন করে দেয়। কেবল এ বিরাট সংহতি এবং মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার গুণেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি উৎসাহিত হয়। যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় ত্বরান্বিত না হত এবং এ প্রদেশে আর কয়েক শতকের জন্য হিন্দু শাসন অব্যাহত থাকত, তাহলে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেতো এবং অবহেলিত ও বিস্মৃত হয়ে অতীতের গর্ভে নিমজ্জিত হতো।” (বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, প্রথম খন্ড, ভূমিকা)

ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনও এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেনঃ ‘বঙ্গ ভাষা মুসলমান সম্রাটদের কৃপায় দ্বিতীয় বার জন্মগ্রহণ করিয়া দ্বিজের ন্যায় সম্মান লাভ করিল’।

যাদের কথা ভুলা যাবে নাঃ

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছেনঃ “মুহম্মদ-ই-বখতিয়ারের বাংলা জয়ের পর যখন হইতে মুসলমান বুঝিল, এই চির হরিতা, ফলশস্য পুরিতা নদ-নদী ভূষিতা বঙ্গভূমি শুধু জয় করিয়া ফেলিয়া যাইবার জিনিস নহে, এদেশ কর্মের জন্য, এদেশ ভোগের জন্য, এদেশ জীবনের জন্য, এদেশ মরণের জন্য, তখন হইতে মুসলমান জানিয়াছে বাংলা চাই। তাই বাংলার পাঠান বাদশাহগণ বাংলাকে আদর করিতে লাগিলেন। যে ভাষা দেশের উচ্চ শ্রেণীর অবজ্ঞাত ছিল, তাহা বাদশাহ’র দরবারে ঠাঁই পাইল। নসরত শাহ, হোসেন শাহ, পরাগল খাঁ, ছুটি খাঁর নাম বাঙ্গালী ভুলিতে পারিবে না। বাদশাহের দেখাদেখি আমীর-ওমরাহ বাংলার খাতির করিলেন। আমীর ওমরাহের দেখাদেখি সাধারণে বাংলার আদর করিল। গোড়া ব্রাহ্মণের চোখ রাঙানীকে ভয় না করিয়া বাঙ্গালী নবীন উৎসাহে তাহার প্রিয় ধর্মপুস্তকগুলো বাংলায় অনুবাদ করিল, কত দেশ-প্রচলিত ধর্মকথা বাংলায় প্রকাশ করিল, কত মর্মগাঁথা বাংলায় প্রচার করিল।”

‘আল্লাএ বুলিছে মুঞি যে দেশে যে ভাষঃ’

বাংলার জনগণের মুখের ভাষার ব্যাপারে মুসলিম শাসকগণ যে নীতি অনুসরণ করেন, তা ইসলামের ভাষা-নীতিরই প্রতিফলন। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘ওমা আরসালনা মির-রাসূলিন ইল্লা বি লিসানী কাওমিহি লিয়ূ বায়্যিনা লাহুম’।

সৈয়দ সুলতান ইসলামের এই ভাষানীতিটিকেই তাঁর অপূর্ব কাব্যভাষায় তুলে ধরেছেনঃ

‘আল্লাএ বুলিছে মুঞি যে দেশে যে ভাষ
সে দেশে সে ভাষে কৈঁলু রছুল প্রকাশ।
এক ভাষে পয়গম্বর আর ভাষে নর
না পারিব বুঝিবার উত্তর-পদুত্তর।
যথেক রছুল-নবী-পয়গম্বর হৈছে
উম্মতের যে ভাষা সে ভাষে সৃজিয়াছে।’

লেখক পরিচিতি:

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
লেখক
গবেষক
ইতিহাসবিদ

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.