Asrar e khudi -Allama Iqbal(The Secrets of the Self)

পূর্বাভাষ

বিশ্ব-উজ্জ্বলকারী সূর্য
যখন ঝাঁপিয়ে পড়ল রাত্রির বুকে
দস্যুর মতো,
আমার কান্নার অশ্রু
শিশির-সিক্ত করে তুলল
গোলাব-পাপড়ির মুখ।
আমার অশ্রু
ধুয়ে নিয়ে গেল নিদ্রা
নার্গিস ফুলের আঁখি থেকে,
আমার অনুরাগ
জাগ্রত করে দিল তৃণরাজিকে
আর করল তাদেরকে বর্ধিষ্ণু।
মালী পরীক্ষা করলে
আমার সঙ্গীতের শক্তি,
সে বপন করলে আমার সঙ্গীত
আর আহরণ করলে একখানি তরবারি।
মৃত্তিকার বুকে
সে বপন করল আমার অশ্রুর বীজ,
বয়ন করল আমার আর্তনাদ
বাগিচার সাথে
তাতের সূতার মতো।

যদিও আমি একটি ক্ষুদ্র পরমাণু মাত্র,
তবু অত্যুজ্জ্বল বিভাময় সূর্য আমারই ;
বক্ষোমাঝে আমার
শতেক পূর্বাশার আলো
আমার ধূলিকণা
জামশেদের সুরাপাত্রের চাইতে উজ্জ্বলতর,
সে জানে সেইসব পদার্থকে
যারা আজো জন্ম নেয়নি এই বিশ্বে।

আমার চিন্তাধারা
ছিনিয়ে এনেছে এক মৃগীকে,
যে আজো ছুটে আসেনি প্রকাশমান হয়ে
অনস্তিত্বের অন্ধকার থেকে।

সুন্দর আমার বাগিচা,
পত্রপুট তার তারুণ্যে সবুজ ;
আমার পরিচ্ছদের মাঝে
লুক্কায়িত আছে।
কত অস্ফুট গোলাব।
মূক করে দিয়েছি আমি সেই গায়কমণ্ডলীকে
যারা মিলিত হয়েছিল
এক জলসায়,
আঘাত দিয়েছি আমি
সারা বিশ্বের হৃদয়গ্রন্থিতে,
কারণ আমার প্রতিভার বাশিতে
নিহিত রয়েছে।
এক অভূতপূর্ব সুর;
সঙ্গীত আমার নূতনতম ।
আমার সঙ্গীদের কাছেও।

জন্ম নিয়েছি আমি এই ধরিত্রীর বুকে
নবীন সূর্যের মতো,
আকাশের নীহারিকা-লোকের সাথে
নেই আমার পরিচয় ;
এখনো আত্মগোপন করেনি তারকারাজি
আমার আলোকৈশ্বর্য এর সম্মুখে,
আমার তাপমানের পারদ আজো হয়নি স্থির ;
আমার নৃত্যপর আলোকরশ্মি
আজো স্পর্শ করেনি সমুদ্রের বুক,
আমার রক্তিম আভা
আজো স্পর্শ করেনি পর্বতের শিখর।

অস্তিত্বের আঁখি
আজো নহে পরিচিত
আমার কাছে ;
জাগ্রত হয়ে উঠি আমি কম্পায়মানভাবে,
ভীত আমি নিজকে প্রকাশ করতে ।
আমার উষা সমাগত হল
প্রাচী-র তোরণ থেকে
আর মিশে গেল রাত্রির অন্ধকারে,
একটি নবীন শিশির বিন্দু
পড়ল বিশ্ব-গোলাবের মুখে।
প্রতীক্ষা করছি আমি সেই ভক্তদের
যারা উত্থান করে উষালোকে
ওগো সুখী তারাই-
যারা পূজা করবে আমার অন্তরের অগ্নিকে।

প্রয়োজন নেই আমার আজকের মানুষের কর্ণের,
আমি বাণী
অনাগত যুগের কবির ।
হৃদয়ঙ্গম করে না আমার বাণীর গূঢ় অর্থ
আমার নিজের যুগ,
ইউসুফ আমার এই বাজারের জন্য নয় !
হতাশ আমি আমার প্রাচীন সঙ্গীদের জন্য ;
আমার সিনাই দগ্ধ হয়
সেই মুসার জন্য-
যে আসবে ভবিষ্যতে।

সমুদ্র তাদের শান্ত নিস্তরঙ্গ
শিশিরের মতো,
কিন্তু শিশির আমার ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ
মহাসমুদ্রের মতো।
আমার সঙ্গীত আর এক পৃথক জগতের
তাদের থেকে ;
এই বংশী আহ্বান করে আর সব পথচারীকে
পথ ধরবার জন্য।

জন্ম নিয়েছিল কত কবি
তার মৃত্যুর পরে,
খুলে দিয়েছিল আমাদের আঁখি।
যখন তার নিজের আঁখি হল নিমিলিত।
চলতে লাগল আবার সম্মুখের দিকে
অনস্তিত্ব থেকে,
ফুটনোন্মুখ গোলাবের মতো।
তার সমাধি-মৃত্তিকার উপর।
যদিও কত কাফেলা
অতিক্রম করে গেছে এই মরুভূমি,
তারা চলেছিল,
যেমন চলে উষ্ট্র
নিঃশব্দ পদক্ষেপে।

আমি একজন প্রেমিক ;
উচ্চ নিনাদ আমার ধর্ম ;
রোজ কেয়ামতের চিৎকার।
আমার কাছে তোষামোদ
আমার সংগীত
তন্ত্রীর শক্তিকে করেছে অতিক্রম
তবু আমার ভয় নেই বাশি ভেঙে যাবার।

আমার স্রোতের সাথে পরিচয় না-হওয়াই ছিল ভালো
সেই বারিবিন্দুর,
তার ভয়ংকর রূপ বরং উম্মাদ করে দেবে
মহাসমুদ্রকে।

কোনো নদী
ধরতে পারবে না আমার ওমানকে ;
সমস্ত সমুদ্রের প্রয়োজন।
ধরে রাখতে আমার বাত্যা।
যদি কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হয়ে
না হয় গোলাবের আস্তরণ,
কোনো মূল্য নেই
আমার বসন্ত-মেঘের করুণার।
বিদ্যুৎ-ঝলক তন্দ্রাভিভূত হয়ে আছে।
আমার আত্মার ভিতরে।
বয়ে চলি আমি।
পর্বত ও সমতলের উপর দিয়ে।

যুদ্ধ করো আমার সমুদ্রের সাথে,
যদি তুমি হও সমতলক্ষেত্র ;
গ্রহণ করো আমার বিদ্যুৎ-চমক,
যদি তুমি হও সিনাই।

আমায় দেওয়া হয়েছে আবে-হায়াত
পান করতে,
আমি হয়েছি মহাজ্ঞানী
জীবন বহস্যের।

ধূলিজাল শক্তি সঞ্চয় করেছে
আমার অগ্নি-গীতি থেকে ;
বিস্তার করেছে সে তার পক্ষ,
পরিণত হয়েছে খদ্যোতে।
কেউ বলেনি সেই রহস্য, যা বলব আমি,
অথবা বিস্তার করেনি চিন্তার রত্ন
আমার মতো।

এসো—
যদি তুমি জানতে চাও
চিরন্তন জীবন-রহস্য !
এসো—
যদি তুমি চাও
স্বর্গ-মর্তকে জয় করতে!
স্রষ্টা শিখিয়েছেন আমায়
এই সঙ্গীত,
আমি পারি না তা গোপন করতে।
আমার সঙ্গীদের কাছ থেকে।

ওগো সাকি!
ওঠো–ঢালো সুরা আমার পাত্রে,
কালের কোলাহলকে করো দূরীভূত
আমার অন্তর থেকে!

জমজম থেকে বয়ে আসে
যে উজ্জ্বল সুরা,
যদি ভিখারিও করে তার পূজা।
সে হয়ে উঠবে রাজ্যেম্বর।
তাতে চিন্তাকে করে তোলে।
আরো প্রশান্ত—জ্ঞানময়,
তীক্ষ্ন আঁখিকে করে তোলে তা তীক্ষ্ণতর।
তৃণকে সে প্রদান করে পর্বতের ভার,
শৃগালকে দেয় সিংহের শক্তি।
ধূলিকণাকে তা তুলে নেয় সপ্তর্ষিমণ্ডলে,
আর বারিবিন্দু ফুলে উঠে
ধারণ করে সমুদ্রের আকার।

রোজ কেয়ামতের কোলাহলের মাঝে
আনে সে গভীর নিস্তব্ধতা
তিতির পক্ষীর পদযুগল রঞ্জিত করে সে
বাজপক্ষীর শোণিতে।

ওঠো—ঢালো আমার পিয়ালায়।
স্বচ্ছ সুরা,
এনে দাও চন্দ্রালোক
আমার চিন্তার অন্ধকার নিশীথিনীর বুকে,

যেন আমি পারি
ফিরিয়ে আনতে মুসাফেরকে তার গৃহে,
আলস্যপরায়ণদের মাঝে আনতে পারি।
অশান্ত ব্যাকুলতা ;
যেন এগিয়ে যেতে পারি উৎসাহের সাথে
নূতনের সন্ধানে-
আর পরিচিত হতে পারি
নূতনের অগ্রদূতরূপে;
অক্ষিতারকার মতো হতে পারি
অস্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানবের কাছে,
যেন প্রবিষ্ট হতে পারি বিশ্বের কর্ণে
কণ্ঠস্বরের মতো ;
বর্ধন করতে পারি কাব্যের মূল্য,
আর অভিষিক্ত করতে পারি।
শুষ্ক গুল্মকে
আমার অশ্রুবিন্দু-পাতে।

রুমির প্রতিভায় অনুপ্রাণিত আমি
আবৃত্তি করে যাই গোপন রহস্যের মহাগ্রন্থ।
আত্মা তার জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড,
আমি শুধু ফুলিঙ্গ-
যা জ্বলে ওঠে মুহূর্তের জন্য।

জ্বলন্ত দীপশিখা তার
গ্রাস করেছে আমায় পতঙ্গের মতো,
তাঁর সুরা
কানায় কানায় পূর্ণ করেছে আমার পিয়ালা।
রুমি স্বর্ণে পরিণত করেছিলেন
আমার মৃত্তিকাকে,
আর আমার ভস্মকে করেছিলেন।
প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ড।

বালুকণা উঠে এল মরুভূমি থেকে,
যেন সে ছিনিয়ে আনতে পারে
সূর্যের ঔজ্জ্বল্য।

আমি একটি তরঙ্গ,
আসব আমি বিশ্রাম নিতে
তার সমুদ্র-বুকে,
যেন আমি আপনার করে নিতে পারি
তার দীপ্তিমান মুক্তারাজি।
আমি তার সঙ্গীতের সুরায় মাতাল,
জীবন সঞ্চয় করি আমি
তার বাণীর হাওয়া থেকে।

তখন রাত্রি,
অন্তর আমার শোকোচ্ছাসে পরিপূর্ণ,
নিস্তব্ধতার বুক ভরে দিল
আমার ফরইয়াদ
বিশ্বপ্রভুর কাছে।

অভিযোগ করছিলাম আমি
বিশ্বের দুঃখ-ব্যথার জন্য,
বিলাপ করছিলাম
আমার পিয়ালার শূন্যতায়।
অতঃপর আঁখি আমার
পারল না আর সহ্য করতে,
পরিশ্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়ল।
গভীর ঘুমে।

আবির্ভূত হলেন সেই পির,
সত্যের উপাদানে যিনি গঠিত-
লিখেছিলেন যিনি কোরান ফারসি ভাষায়।

বললেন তিনি-
“ওগো উম্মত্ত প্রেমিক,
পান করে নাও প্রেমের স্বচ্ছ সুরা।
আঘাত করো তোমার হৃদয়-গ্রন্থিতে,
জাগিয়ে তোলো তাতে উদাত্ত সুর,

নিক্ষেপ করো তোমার মস্তক পিয়ালায়
আর তোমার আঁখি অস্ত্রমুখে!
করে তোলো তোমার হাস্য।
শতেক দীর্ঘশ্বাসের উৎসমুখ,
মানবের অন্তর হোক রক্তাক্ত
তোমার অশ্রুজলে!
কতকাল থাকবে তুমি নীরব।
কুঁড়ির মতো?
বিক্রয় করো তোমার সুরভি সুলভে
গোলাবের মতো!

জিহ্বা তোমার আড়ষ্ট বেদনায় ;
নিক্ষেপ করো নিজকে অনল-কুণ্ডে
ইন্ধনের মতো!
ঘণ্টার মতো ভঙ্গ করো নিস্তব্ধতা,
আর প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে
উচ্চারণ করো বিলাপ-ধ্বনি !

তুমি অগ্নি :
পরিপূর্ণ করো সারা বিশ্ব
তোমার আলোয়।
দগ্ধ করো অপরকে তোমার দাহনে !

ঘোষণা করো রহস্য।
সেই প্রাচীন সুরা-বিক্রেতার ;
তুমি হও সুরার তরঙ্গ,
স্বচ্ছ পিয়ালা হোক তোমার বসন।
চূর্ণবিচূর্ণ করো ভয়ের দর্পণকে,
বোতল ভেঙে দাও বাজারের মধ্যে !
নলের বাশির মতো।
নিয়ে এসো বাণী নলবন থেকে;

মজনুর কাছে বয়ে আনো সন্দেশ
লায়লার কাছ থেকে!
সৃষ্টি করো নূতন ধারা তোমার সঙ্গীতের,
ঐশ্বর্যশালী করে তোলো সমাজকে
তোমার উদ্যমে।

ওঠো, প্রেরণা দাও আবার
প্রত্যেক জীবিত আত্মাকে ; •
বলো ‘জাগ্রত হও’—
আর তোমার বাণীর জাদুতে
জেগে উঠুক জীবন্ত আত্মা।

ওঠো-বাড়িয়ে দাও তোমার চরণ
অন্যতর পথে ;
দূর করো সৰ অতীতের
একঘেয়েমির তদ্রা!
সঙ্গীতের আনন্দের সাথে হও পরিচিত;
ওগো কাফেলার ঘণ্টা,
জেগে ওঠো!”

বক্ষ আমার আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল
এই বাণীতে,
উৎসাহে উদ্দীপনায় ফুলে উঠল
বংশীর মতো;
আমি জেগে উঠলাম
যেমন করে জাগে সঙ্গীত তন্ত্রী থেকে,
নির্মাণ করতে এক ফিরদাউস
মানব-কর্ণের জন্য।
তুলে দিলাম আমি পর্দা
আত্মার রহস্যের,
খুলে দিলাম তার বিসয়কর গোপন-তত্ত্ব।
সত্তা ছিল আমার একটি অসমাপ্ত মূর্তি,
অসুন্দর, মূল্যহীন, অশোভন।

প্রেম করল আমায় পূর্ণ :
আমি হলাম মানুষ,
জ্ঞান লাভ করলাম বিশ্ব প্রকৃতির।
দেখেছি আমি আকাশের স্নায়ুসমূহের গতি,
চন্দ্রের শিরায় প্রবাহিত
শোণিত-ধারা।
কত রাত্রি ধরে।
ক্রন্দন করেছি আমি মানবের জন্য
যেন আমি ছিড়ে ফেলতে পারি
জীবন-রহস্যের পর্দা ;
তুলে আনতে পারি জীবনের গঠন-রহস্য
প্রকৃতির বিজ্ঞানাগার থেকে।

আমি সৌন্দর্য বিতরণ করি রাত্রিকে
চন্দ্রের মতো,
আমি শুধু ধূলিকণার মতো ভক্তি-বিনত
সত্য ধর্মের কাছে
(ইসলামের কাছে),
যে ধর্ম বহু পরিচিত পর্বতে প্রান্তরে,
জ্বালিয়ে দেয় যে মানব-হৃদয়ে
অমর-সঙ্গীতের অগ্নি –
সে বপন করেছিল একটি ক্ষুদ্র পরমাণু,
তুলে নিয়ে গেল একটি সূর্য,
ফসল তার শত শত কবি।
রুমি-আত্তারের মতো।

আমি একটি দীর্ঘশ্বাস :
উত্থান করব আমি আকাশের উচ্চতায় ;
আমি ধূমমাত্র,
তবু উত্থান আমার
জ্বালাময় অগ্নি থেকে ।
উচ্চ চিন্তা দ্বারা উর্ধ্বে চালিত হয়ে
লেখনী আমার ।
প্রকাশ করছে সেই রহস্য,
যা লুক্কায়িত ছিল এই পর্দার অন্তরালে,
যেন একটি বিন্দু হতে পারে
সমুদ্রের সমতুল,
আর বালুকণা পরিণত হয় সাহারায়।

কাব্য-সৃষ্টি নয় এ মসনভির লক্ষ্য
এর লক্ষ্য নয় সৌন্দ-পূজা
আর প্রেম সৃষ্টি।

ভারতবাসী আমি ;
ফারসি নহে আমার মাতৃভাষা;
অর্ধচন্দ্রের মতো আমি, পিয়ালা নহে আমার পূর্ণ।
চেয়ো না আমার কাছে ভাব প্রকাশের জাদু,
আশা কোরো না আমার কাছে।
খানাসার ও ইসফাহান।
যদিও ভারতীয় ভাষা সুমিষ্ট ইক্ষুর মতো,
তবু সুমিষ্টতর ফারসি ভাষার ভঙ্গি।
সৌন্দর্যে তার অন্তর আমার হল আবিষ্ট,
লেখনী আমার হল পল্লবের মতো
জ্বলন্ত কুঞ্জের।
আমার চিন্তাধারার ঐশ্বর্যের জন্য।
শুধু ফারসিই হল এর বাহন।
ওগো পাঠক,
দোষ দিও না আমার সুরাপাত্র দেখে,
গ্রহণ করো অন্তর দিয়ে
এই সুরার স্বাদ ।

আসরারে খুদী
আল্লামা ইকবাল
তর্জমা-সৈয়দ আবদুল মান্নান

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.