আরবি সাহিত্যে সর্বপ্রথম ‘দর্শন নির্ভর উপন্যাস’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে ইবনে তুফাইলের ‘হাই ইবনে ইয়াকযান’। সেখানে একজন ব্যক্তির জীবন আলোচিত হয়েছে, যে তরুলতা- হীন মরুভূমিতে জন্মগ্রহণ করে এবং নিঃসঙ্গতায় যাপন করতে থাকে জীবনের প্রাথমিক পর্বগুলো। ধর্ম ও জগতের সাথে চলতে থাকে তার অবিচ্ছিন্ন আলাপন। স্রষ্টার সন্ধান ও সান্নিধ্যে অবিরত চলতে থাকে তার যাত্রা। এভাবে একটা পর্যায়ে গিয়ে সে স্রষ্টার অস্তিত্ব খুঁজে পায়।

‘হাই ইবনে ইয়াকযান’ এর চরিত্রে দর্শন নির্ভর আলোচনার সর্বপ্রথম সূত্রপাত করেন ‘ইবনে সিনা’। কারাগারে বন্দি জীবন যাপনকালে। এছাড়াও আরব ও মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা দর্শনকে কথাসাহিত্যের আরশিতে প্রতিবিম্বিত করেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন শিহাবুদ্দীন সহরাওয়ার্দী। ইবনে তুফাইলের আগমন ঘটে এরপরেই। পরবর্তীতে ইবনে নাফিস উপন্যাসের প্লট রচনা করেছেন ‘ইবনে সিনার রচনাকে ভিত্তি করে , তার উপন্যাসের নাম ছিল ‘ফাজেল ইবনে নাতেক’ এবং অনেক মৌলিক বিষয়াদি শামিল করেন। তবে এদের মধ্যে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেন ‘ইবনে তুফাইল’। তার হাই ইবনে ইয়াকযান উপন্যাসটি ইউরোপীয় দার্শনিক ‘জন লক’ -এর উপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। জন লক বুদ্ধি ও চেতনার উপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন , যাতে দর্শন ও জ্ঞানের কোন পূর্ব উপস্থাপনা ব্যতিত এ বিষয়টি পষ্ট করেন। [১]

পশ্চিমের ফিকশন জগতে ইবনে তুফাইলের প্রভাব:

ইবনে তুফাইল উক্ত উপন্যাস রচনা করেন খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকে। পরবর্তীতে এর ঘটনার আবেশ পূর্ব ও পশ্চিমের বহু সাহিত্যিকদের ব্যস্ত করে রেখেছিল। পশ্চিমে এধারার উপন্যাস রচনার একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তখন। বিশেষত হাই ইবনে ইয়াকযানের অনুবাদ নানা ভাষায় প্রকাশিত হয়। ১৬৭১ সালে ইউরোপে এডওয়ার্ড বুকক যে কিতাব রচনা করেন, সেটি ছিল হাই ইবনে ইয়াকযান এর ল্যাটিন অনুবাদ। কারণ, শুধুমাত্র আকল বা চিন্তার মাধ্যমে স্রষ্টা পর্যন্ত পৌঁছার যে নান্দনিক পথ ইবনে তুফাইল কথা সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে রচনা করেছিলেন, সেটা পশ্চিমের ধর্মীয় পটভূমিতে দারুণ রোমাঞ্চ তৈরি করেছিল। ফলে কাজটিকে তারা লুফে নিয়েছিল। [ ২]

জে জ্যাক রুশো ইবনে তুফাইলের গ্রন্থের এ প্রভাব সঙ্কোচহীন ভাবে তুলে ধরেছেন, তিনি তাঁর ‘Profession de foi du viciare
savoyard’ নামক গ্রন্থে যে চরিত্র এবং দার্শনিক উপস্থাপনা তুলে এনেছেন, তার সাথে হাই ইবনে ইয়াকযান এর ব্যাপক সাজুয্য আছে। রুশোর এ বইয়ের আরবি অনুবাদ হয়েছে ‘দ্বীনুল ফিতরাহ’ নামে। অনুবাদ করেছেন আব্দুল্লাহ আল উরওয়া। হাই ইবনে ইয়াকযান উপন্যাসটিতে যেভাবে একজন বালক জনমানব হীন প্রান্তরে বেড়ে ওঠে, বুদ্ধির সাহায্যে স্রষ্টার পরিচয় লাভ করে, তদ্রুপ রুশোর উপন্যাসে দেখা যায় ‘ কিছ’ নামক এক বালকের পর্বতের চূড়ায় থেকে স্রষ্টা নিয়ে ভাবছে , পরিচয় লাভ করছে।

Rudyard Kipling যখন ১৮৯৪ সালে “The jungle book” লিখেছেন, আরবিতে যেটা “কিতাবুল আওগাল” নামে ছেপেছে। সেখানে রুডয়ার্ড -এর উপস্থাপন ভঙ্গি রুশোর ভঙ্গির সাথে ব্যাপক মিল পাওয়া যায়। তবে পরবর্তীতে রবিনসন ক্রুসো (ইংরেজি: Robinson Crusoe) ড্যানিয়েল ডিফো রচিত একটি উপন্যাস। ১৭১৯ সালে এই উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটিতে রবিনসন ক্রুসো নামে এক ভগ্নপোত ব্যক্তির কাল্পনিক আত্মজীবনীর আকারে রচিত। এই ব্যক্তি ভেনেজুয়েলার কাছে একটি নির্জন বিষুবীয় দ্বীপে ২৮ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় অবস্থান করেন। এই সময় আমেরিকার উপজাতীয়, বন্দী ও বিদ্রোহীদের সঙ্গে তার সংঘর্ষও হয়। পরে তাকে উদ্ধার করা হয়।
এখানে রবিনসন ক্রুসোর সাথে যদিও হাই ইবনে ইয়াকযানের উপপাদ্য ও আলোচনার পটে বিপুল ফারাক আছে , কিন্তু নির্জন যাপনের কাল্পনিক যে চিত্র আকা হয়েছে, সেখানে একটা মিল অবশ্যই পাওয়া যায়। [৩]

তাছাড়া একটা দীর্ঘ সময় ধরে ইবনে তুফাইল স্পেনে বসবাস করেছেন, ড্যানিয়েল ডিফোর জীবনের একটা বিশেষ অংশ কেটেছে এখানেই। সুতরাং, ইবনে তুফাইলের দ্বারা প্রভাবিত হবার দাবি করাটা খুবই স্বাভাবিক। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, হাই এবং রবিনসন ক্রুসো – উভয়েই তাদের মুক্তির জন্য আকলকে ব্যবহার করছে। হাই ইবনে ইয়াকযান বুদ্ধির দ্বারা আত্মিক মুক্তির পথ রচনা করেছেন, দুনিয়ার ভোগ ও বিলাসিতা পরিহার করছেন। পরমাত্মার সান্নিধ্যে অবগাহন করছেন। আবার রবিনসন ক্রুসো দৈহিক মুক্তির জন্য বুদ্ধির প্রয়োগ করছেন , ডুবন্ত নৌকার পাটাতন দিয়ে কুড়েঘর বানাচ্ছে, টেবিল তৈরি করছে এবং শেষে ফসলের আবাদ আরম্ভ করছে।

হাই ইবনে ইয়াকযান যেভাবে স্রষ্টাকে খুঁজে পায় :

হাই ইবনে ইয়াকযান হিন্দুস্তানের একটি উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করে, পিতামাতা ছাড়াই। একটি গাছ আছে যে নারী জন্ম দেয়, অপর একটি গাছ যা পুরুষ লোকের জন্ম দেয়। এভাবে উপন্যাসের একটি চরিত্র প্রথমে তিনি দাড় করান , যা অবাস্তব ও বিস্ময়কর।

পরবর্তীতে তিনি হাই ইবনে ইয়াকযানের জন্ম প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় একটি ধারা আবিষ্কার করেন, যেটা বাস্তব ও ন্যাচারাল। তিনি বলেন – একজন বাদশাহ ছিল , তার বোন ছিল অনিন্দ্য সুন্দরী। বিবাহের মতো উপযুক্ত কোন পাত্র পৃথিবীতে আছে বলে বাদশাহ মনে করতো না। ফলে তার বোনকে সে বিবাহ থেকে বাধা দিতো। একদিন মেয়েটি পালিয়ে ‘ইয়াকযান’ নামক এক যুবককে বিয়ে করে, এবং তাদের যে সন্তান হয়, তার জীবন রক্ষার তাগিদে তারা তাকে সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত করে। একটি বাক্সে ভরে। এবং ফেলার সময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলে , হে আল্লাহ! তুমি তাকে হেফাজত করো। তুমি তো তাকে সৃষ্টি করেছো।
সমুদ্রে ফেলার পর বাক্সটি তরঙ্গের আঘাতে জঙ্গলের তীরে এসে হাজির হয়, সেখানে ছিল একটি হরিণ; কিছুদিন আগেই সে তার বাচ্চা হারিয়ে ফেলে। যখন বাক্সের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এলো , হরিণ তখন ধীরে ধীরে অগ্রসর হলো। কিন্তু, সে দেখলো , এটি তার বাচ্চা না। তবে অন্তরে এক ধরনের মায়া অনুভব করলো হরিণ। সে হাই নামের শিশুটাকে পালতে থাকলো।

এখানে ইবনে তুফাইল জন্মের একটি যৌক্তিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি দার্শনিক আলাপ বেশ নান্দনিক চিত্রে রূপায়িত করতে থাকলেন।

একসময়ে হাই নামের বালকটি যখন সপ্তম বছরে উপনীত হলো , তার পরিচর্যাকারী হরিণ মায়ের মৃত্যু হলো। তখন থেকে হাই ইবনে ইয়াকযান চিন্তা ভাবনা শুরু করলো জীবন ও জগত নিয়ে। জীবনের রহস্য উন্মোচন করতে আরম্ভ করলো। সে ভাবলো – আচ্ছা! আমার ‘মা’ এর শরীর থেকে যে জীবন চলে গেল , সেটা তো সবার মধ্যেই আছে। গোটা জগতেই তো ক্রিয়াশীল ইহা। এই যে জীব ও জীবন তার শুরু কোথায় , পরমাত্মা কোন সত্তা। সেটি তো কোন প্রানহীন বস্তু না , অবশ্যই একটি পরম সত্তা।
সে আরো চিন্তা করে , এইযে জগতের শৃঙ্খলা, অদ্ভুত পরিচালনা , অবশ্যই এর একজন পরিচালক আছে। সুতরাং, তার সাথে আমার মিলন দরকার, সাধনার চর্চা দরকার। জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একান্তে কাটাতে হবে তার সাথে আলাপনে। [ ৪]

তথ্যসূত্র :
[১ ]. আল আবআদুল ফালসাফিইয়া ফি কিস্সাতি হাই ইবনে ইয়াকযান ইনদা ইবনে তুফাইল, ওয়ায় বাক মেচিন।

[২ ]. হাই ইবনে ইয়াকযান আউওয়ালু তরযানুন আরাফাতহুল বাশারিইয়া , ৩ পৃ .

[৩ ]. Nawal Muhammad Hassan (1980), Hayy bin Yaqzan and Robinson Crusoe: A study of an early Arabic impact on English literature, Al-Rashid House for Publication

[৪ ]. হাই ইবনে ইয়াকযান, ইবনে তুফাইল। ২-৩ পৃ .

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.