Jawab-e-Shikwa- Muhammad Iqbal

দিল থেকে যদি আসে কোন বাণী,
প্রভাব রাখে সে সুনিশ্চয়,
পাখনা না থাক,
তবুও তাহার উর্ধ্বে উড়ার তাকৎ রয়।
পাক বিহিশতে জন্ম তাহার ,
টান থাকে তার তাই সেথায়,
ধূলার ধরায় রয় নাক’ বাঁধা—নীল-আকাশের গান সে গায়।
প্রেম ছিল মাের বেয়াড়া ভীষণ,
কোঁদল-পাকানাে স্বভাব তার ।
বাগ মানিল না, তীব্র গতিতে চলিল ছুটিয়া আকাশ-পার।

আকাশ-বুড়াে—সে চমকিয়া কয়ঃ কার কথা শুনি এইখানে?
তারারা কহিলঃ তাই ত! দেখ ত উপর-তলার আসমানে!
চাঁদ কহেঃ হাঁ! হাঁ! মাটির মানুষ হবেই এ ঠিক! তারি এ-স্বর!
কয় ছায়াপথ আমাদেরি মাঝে লুকালাে কি সেই ধূর্ত নর!
রিওয়ানই শুধু চিনিল আমারে আমার করুণ কান্নাতে,
দেখেছিল সে যে আমারে সেদিন—ছাড়িনু যেদিন জান্নাতে!

ফিরিশতারাও চঞ্চল হ’লঃ “কার এ আওয়াজ?” কয় তারা,
রহস্য এর জানিতে সকল আরশবাসীই হয় সারা!
মাটির মানুষ উঠিল কি আজ পবিত্র এই আরশ-পর?
আদম-শিশু কি হ’ল এতবড় শক্তিময় ও ধুরন্ধর?
দুনিয়ার এই মানুষগুলাে—সে কত ধড়িবাজ! দেখেছ ভাই!
রূঢ় ভাষায় কথা বলে এরা! আদব-লেহাজ মােটেই নাই!

এতই ইহারা বে-তমীজ ভাই! খােদার পানেও চোখ রাঙায়! এই মানুষেরই পায়ে দিয়েছিল ফিরিশতাকুল সিজদা, হায়!
জ্ঞান-বিজ্ঞান তত্ত্ব-কথায় ইহাদের জুড়ি নাহিক আর,
কিন্তু ইহারা উদ্ধত বড় ! জানে না কোনই শিষ্টাচার !
এরাই-কেবল ভাষা জানে, তাই গুমর কত সে! বাপরে বাপ!
ভদ্র ভাষা ত শিখিল না কেউ ! নাদানরা সব বদ-স্বভাব।

হঠাৎ আসিল কালাম-ই-আযীমঃ তােমার এ গানে কাঁদায় প্রাণ,
হৃদয় হইতে উছলিয়া-পড়া তােমার প্রেমের এই সে গান।
আকাশেরও দিল কেঁদে ওঠে আজ তােমার করুণ কান্নাতে,
বুঝিয়াছিঃ এই গান আসিয়াছে কত না গভীর বেদনাতে।
শিকওয়া’ এ নয়, প্রশস্তি মাের! এমন বাচন-ভঙ্গি তার,
বান্দা এবং খােদার মাঝারে বাঁধিয়াছ সেতু চমৎকার!

দান-ভাণ্ডার খােলাই ত মাের;
সে দান নেবার সায়েল কই?
কারে আমি বল পথ দেখাইব,
পথ চলা সেই পথিক বৈ?
শিক্ষা ত মাের সবার তরেই,
কোথায় বল না ছাত্র তার?
যেই মাটি দিয়ে গড়িব আদমে,
সেই মাটি কই পাচ্ছি আর!
যােগ্য জনের শীর্ষেই আমি রত্ন-মুকুট দেই আনি,
নতুন পৃথিবী-তাও পেতে পারে থাকে যদি তার সন্ধানী!

হৃদয় তােমার ঈমান-বিহীন, বাজু সে তােমার শক্তিহীন,
তােমরা নবীর উম্মৎ? হায়! শরমে তাঁহার মুখ মলিন!
বুৎ-ভাঙা দল বিদায় নিয়েছে, বাকী যারা তারা গড়িছে বুৎ,
ইব্রাহিমের ছেলেরা এখন ‘আযর’ সেজেছে—কী অদ্ভুত!
শারাব, জাম ও পানকারীদের দেখছি এখন নূতন সব।
কা’বাও নূতন, বুৎও নূতন! চলিছে মজার কী উৎসব!

তােমরাই ছিলে উৎস একদা সত্য এবং সুন্দরের
লালা-ফুল সম ফুটিয়া উঠিতে অগ্রপথিক বসন্তের।
খােদার প্রেমিক ছিলে সকলেই—যেই দিন ছিলে মুসলমান।
‘হরযায়ী’ এই খােদার পায়েই করেছিল সবে আত্মদান।
যাও না, এখন পূজা কর গিয়ে নূতন কোন সে ‘একযায়ী’র?
খণ্ডিত কর মহামানবতা বিশ্বপ্রেমিক নূর নবীর!

ফযরে উঠিয়া নামায পড়িতে পাও তুমি আজ কষ্ট ঘাের
আমারে ভুলিয়া অলস-আবেশে নিঁদমহলায় রও বিভাের।।
প্রগতিপন্থী তুমি ত এখন! রাখাে নাক’ রােযা রামজানে।
এই কি তােমার প্রেমের নিশান?
ওফাদারী’র কি এই মানে?
ধর্ম দিয়েই মিল্লাত গড়ে,
ধর্মহীনের নাহিক’ মান, আকর্ষণ না রইলে রহে না চাঁদ-সিতারার আঞ্জুমান!

কর্মবিমুখ অলস যাহারা—তােমরাই হলে সেই জাতি,
স্বদেশের প্রতি নাহিক’ দরদ, উদাস খেয়ালে রও মাতি।
বজ্রপাতের অনুকূল তব জীর্ণ গৃহেই পড়িছে বাজ,
বাপ-দাদাদের মাজার বেচিয়া বেশ ত সবাই খাচ্ছ আজ!
কবর লইয়া তেজারতি করে যেসব ঘূণ্য ব্যবসাদার ।
মূর্তি পেলে যে বেচিবে না তারা কোথায় তাহার অঙ্গীকার ?

মুছিল কাহারা কালের পাতায় চিহ্ন ছিল যা’ কলঙ্কের?
মানব জাতির মুক্তি আনিল বন্ধন কাটি’ দাসত্বের?
কা’বার কপােলে বােসা দিল কারা -তুলিল তৌহিদের আযান ?
ছিনায়-ছিনায় গেঁথে নিল কারা আমার বাণী— সে পাক-কুরআন্?
তারা কি তােমরা?
সে ত তােমাদের বাপদাদা—যারা ছিল মহৎ,
তোমরা ত সব হাতে-হাত রেখে ভাবিছ শুধুই ‘ভবিষ্যৎ’ !

কী বলিলে তুমি? মুসলমানের ‘হুর’সে শুধুই ‘ওয়াদা’ সার?
কান্না যতই হােক না করুণ, থাকা চাই কিছু যুক্তি তার!
শ্বাশ্বত মাের আইন-কানুন, শাশ্বত মাের নীতি-বিধান,
কাফির যখন মুসলিম হয়—সেও পাবে ‘হুর’ এক-সমান!
তোমাদের মাঝে কারা বল চায় সত্যিকারের ‘হুর-কসুর’?
মুসাই ত নাই!—‘তুর’ পাহাড়ে ত তেমনি করিয়া জ্বলিছে নূর!

লাভ-লােকসান এক তােমাদের, এক মঞ্জিল, এক মােকাম,
এক তােমাদের নবী ও রসূল, এক তােমাদের দীন-ইলাম।
এক তােমাদের আল্লাহ্ এবং এক তােমাদের আল্-কুরআন,
আফসােস, হায়, তবুও তােমরা এক নহ সব মুসলমান!
তােমাদের মাঝে হাজার ফিরকা, হাজার দল ও হাজার মত,
এমন জাতি কি দুনিয়ার বুকে খুঁজে পায় কভু মুক্তি-পথ!

কারা, বল, ত্যাগ করেছে আমার পাক-রাসূলের পাক্-বিধান,
সুখ-সুবিধার যুক্তি-মাফিক কারা চলে আজ আযাদ-প্রাণ?
কাহাদের চোখে ভালাে লাগে আজ অপর জাতির রূপ ও সাজ?
বাপ-দাদাদের তরীকাতে আজ চলিতে কাহারা হয় নারাজ?
অন্তরে নাই প্রেমের আগুন, আত্মাতে নাই তার দহন,
মুহম্মদের পয়গাম আর তােমাদের কারাে নাই স্মরণ!

মসজিদে আজ নামায পড়িতে যায় সে শুধুই গরীব লােক,
তারাই এখন রােযা রাখে সব যতই না কেন কষ্ট হােক!
গরীব যাহারা তাদের মুখেই শুনি যাহা-কিছু আমার নাম,
তারাই দিতেছে গৌরবে ঢাকি তােমাদের যত অসৎ কাম।
ধনীরা ত সব মত্ত-মাতাল শারাব পিয়ে সে সম্পদের
গরীব রয়েছে বলেই আজিও জ্বলিছে চেরাগ মিল্লাতের!

কওমের যারা ওয়ায়েজ, তারা ধার ধারে নাক’ সুচিন্তার,
বিদ্যুৎ সম তাদের কথায় হয় না এখন আছর আর।
রােসম রয়েছে আযানের বটে, আযানের রূহ বেলাল নাই ।
ফালসুফা আছে প্রাণহীন পড়ে’, আল-গাযালীরে কোথায় পাই !
মসজিদ আজি মর্সিয়া গায়—নামাযী নাহিক’ তার ভিতর,
হেজাযীরা ছিল যেমন-তেমন কোথায় মিলিবে ধরার পর!

খুব ত কহিছঃ দুনিয়া হইতে বিদায় নিয়েছে মুসলমান!
প্রশ্ন আমারঃ মুসলিম কোথা? সে কি আজো আছে বিদ্যমান?
চলন তােমার খৃস্টানী, আর হিন্দুয়ানী সে তমদদুন,
ইহুদীও আজি শরম পাইবে দেখিলে তােমার এ-সব গুণ!
হ’তে পার তুমি সৈয়দ, মীর্জা, হ’তে পার তুমি সে আফগান,
সব কিছু হও, কিন্তু শুধাইঃ বলত’ তুমি কি মুসলমান?

সত্য-ভাষণে মুসলমানের কণ্ঠ ছিল সুনির্ভীক,
সবার প্রতিই অপক্ষপাত ন্যায্য বিচার করিত ঠিক।
বৃক্ষের মত স্বভাব তাহার নম্র হইত ফল-ভরে,
ধৈর্য, সাহস, বীর্য ও বল ছিল তাহাদের অন্তরে।
প্রীতি-উৎসবে সে ছিল যেমন অধরে স্নিগ্ধ লাল-শারাব,
ত্যাগে ছিল তার তেমনি আবার পান-পিয়ালার রিক্তভাব।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.