কালামদর্শন পড়লাম। মগজের ভেতরে কোলাহল করছে এর বিষয়াশয়। এর মানে হলো বইটি শক্তিশালী। এর শক্তির মূলকথা হলো চিন্তা। চিন্তা এক মানসিক শক্তি। এর মাধ্যম ইন্দ্রিয়। কিন্তু কালাম দর্শনের চিন্তার মাধ্যম শুধু ইন্দ্রিয় নয়, স্বজ্ঞা এবং এরপর ওহী অবধি। বাংলার দার্শনিকতায় বরকতুল্লাহ, আবুল হাশেম, দেওয়ান আজরফ সজ্ঞাকে মেনেছেন প্রধান মনুষ্য জ্ঞানহাতিয়ার। আল্লামা ইকবালের প্রভাব ছিলো তাদের অস্তিত্বজুড়ে। মুসা আল হাফিজও ইকবালের অনুরাগী। তবে তার মানসিক বিচরণভূমি কালামের গোটা পরিসর। চিন্তার প্রক্রিয়ায় চারপাশের প্রকৃতি ও প্রকৃতির মাঝে অবস্থিত বিভিন্ন বিষয়বস্তু সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করে তার সাথে স্বজ্ঞা ও ওহীর আত্মীয়তা দেখানো তার দার্শনিকতার অন্যতম ধরণ। অভিজ্ঞতাজাত ধারণাগুলিকে পরস্পরের সাথে তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ এবং সেগুলিকে একত্রীকরণ বা পারস্পরিক সংযুক্তিকরণের জরুরী চেষ্টার ইসলামজাত একটি নিদর্শন এই কালামদর্শন।

বইটির বাক্যসমূহ সরল-সহজ। তবে এর অবধারণ অনেক গভীর। অবধারণ থাকে চিন্তা ও ভাষার মাঝখানে। এ হচ্ছে ভাষার মানসিক রূপ বা ভাষার হয়ে ওঠার পর্ব। অবধারণগুলি মুখের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে না, আচরণ বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। কালামদর্শনের গোটা আদল, বিন্যাস, বিচার, সংগঠন মিলিয়ে যে অবধারণ তৈরী হয়, সেটার আয়তন অনেক বড়। অবধারণের পরের স্তর হলো ভাষা। এ বইয়ে ভাষাটাও গুরুত্বপূর্ণ। একদম হৃদয় ও চিন্তা দিয়ে লেখা। জ্ঞানকে যদি হৃদয়ের কলমে, চিন্তার হাত দিয়ে লেখা হয়, কেমন হবে সেই লেখা? কালামদর্শনে তেমন লেখা আসলে।

বইটির বিষয় ইসলামবিশ্বাসের তত্ত্ব এবং মুসলিম চিন্তা ও চিন্তার উপাদানগুলির বোঝাপড়ার পরম্পরার সাথে সম্পর্কিত। কালাম ও দর্শনকে একত্রিত করে ইসলামের জ্ঞানসম্পদের তাত্ত্বিকতার বয়ান বইটিতে ক্রমাগত হাজির হয়। এর আধুনিক প্রস্তাবনা ও ধারণা (Concept) উপস্থাপন করা হয়। এটি পাঠের মাধ্যমে কালামদর্শনের পুনরোজ্জীবনের সড়কে হাটার পথ পাওয়া যায়। অতীতের পরম্পরা কীভাবে হযরত আলী রা., হাসান বাসরী, ইমাম জাফর সাদিক কিংবা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মধ্যে কালামী বিষয় বিচিত্র চরিত্রে প্রকাশিত হয়, তা বুঝতে পারলাম। এরপর আবুল হাসান আশআরী, আবু মনসুর মাতুরিদী, ইমাম বাকিল্লানী, ইমাম জুয়াইনী, গাযালী, ফখরুদ্দীন রাযী, নাসিরুদ্দীন তূসী, সোহরাওয়ার্দী মকতুল, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে রুশদ, শাহ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখের আলোচনা আমরা পাই। এর সাথে কাদারিয়া, জাহমিয়া, খারেজি, মুরজিয়া, শিয়া, সেফাতিয়া ইত্যাদি চিন্তাঘরানার সাথে বিশেষ মাত্রায় পরিচয় ঘটে। আসারী-আশআরী-মাতুরিদী চিন্তাঘরাণার সাথেও ঘনিষ্ঠ বুঝাপড়া হয়। এতে কালামের পক্ষের আলোচনা যেমন আছে, বিপক্ষের আলোচনাও আছে।

মুসা আল হাফিজের বৈশিষ্ট হলো অবধারণ বা Judgement। তিনি সকল চিন্তার অবধারণ করে চিন্তাগুলোর মধ্যকার তুলনামূলক সম্পর্কের মানসিক প্রকাশ ঘটান। অবধারণের মাধ্যমে ধারণাগুলির মধ্যে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত দুই বা ততোধিত ধারণাকে তুলনা করে, হয় ধারণা দুটিকে স্বীকার করা হয়, না হয় অস্বীকার করা হয়।

যখন মানুষের সামনে বিভিন্ন ধারণা উপস্থিত হয় তখন সেগুলোর তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে সেগুলোকে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির পর্যায়ে নেয়া যায়। যেমন: ফুল, পারদ, সুন্দর, কঠিন ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে কিছুটা ধারণা মানুষের থাকেই। দুই বা ততোধিক ধারণাকে মনে-মনে সংযুক্ত করতে যেয়ে, মানুষ কোন সময় তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে স্বীকার করে, আবার কোন সময় অস্বীকার করে। ‘ফুল’ ও ‘সুন্দর’-এ দুটি ধারণার মধ্যে সম্পর্ক স্বীকার করে, সে মনে মনে ভাবে যে, ‘ফুল হয় সুন্দর।’ আবার ‘পারদ’ ও ‘কঠিন’-এ দুটি ধারণার মধ্যে সম্পর্ককে অস্বীকার করে ভাবে যে, ‘পারদ নয় কঠিন’। সুতরাং অবধারণ একটি মানসিক প্রক্রিয়া এবং তা মনের মধ্যেই সংঘটিত হয়। কালামদর্শন ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাচর্চায় অবধারণের ইতিহাস ও ঘরাণাসমূহের সাথে আমাদের যোগসূত্র ঘটিয়ে দেয়।

ইসলাম ও দর্শন-বুদ্ধিবৃত্তি যেন দুই এলাকার দুই দুশমন– এমনটি ইসলামের বাইরের দুনিয়া থেকে বলা হয় গর্জন করে। ইসলামের ভেতরের অনেকেও বলেন। কালামদর্শন উভয় ধারার বক্তব্যের সাথে এমনভাবে তর্ক করেছে, যা খুবই মজাদার। পশ্চিমা দাবিকে শুধু উড়িয়ে দেয়নি, তাদের বুদ্ধিবৃত্তির শরীরের রক্ত-মাংসে ধরিয়ে দিয়েছে মুসলিম দর্শনের ঋণ। ইসলামী দর্শনের বিপরীতে প্রাচ্যবাদীদের আপত্তিগুলোর এমন শক্তিশালী মোকাবেলা বইটিতে আছে, যেমনটি খুব কমই চোখে পড়ে। মুসলিম দুনিয়ার কালামবিরোধিতার সকল দাবি দাওয়াকে আয়নার সামনে এনেছে এ বই। ধরিয়ে দিয়েছে এর ক্ষেত্র, যথাস্থান এবং প্রয়োগ-অপপ্রয়োগের নীতি।

মুসলিমদের সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় অঙ্গের নাম মস্তিষ্ক। কিন্তু সেটা এখন, অতীতে ছিলো না। অতীতে কীভাবে ছিলো না এবং কেন ছিলো না, তা আমরা একে একে দেখি কালামদর্শনে। আর বর্তমানে কেন নিষ্ক্রিয়, কীভাবে নিষ্ক্রিয় এবং তা থেকে উদ্ধারের পথে কী করণীয়, তার নির্দেশনাও পাই কালামদর্শনে।

একজন সৈন্য অনেক সময় একটি বাহিনীর সমান কাজ করে। একটি বই অনেক সময় একটি গ্রন্থাগারের সমান সহায়তা করে। কালামদর্শন পাঠ করে কথাটি মনে পড়লো।

পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৪১৬
বিক্রয়মূল্য : ৩৮৫
প্রকাশক: শোভা প্রকাশ, বাংলা বাজার
অনলাইন অর্ডার : রকমারি, ওয়াফিলাইফ

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.