মানবীয় ক্রিয়াকর্মের পর্যালোচনা - আবুল হাশিম

বর্তমান দুনিয়া এক পরস্পর বিধংসী যুদ্ধাবস্থায় অবস্থান করছে। যুদ্ধের লেলিহান শিখা পুড়িয়ে দগ্ধ করছে সারা পৃথিবীকে। এই দাহন থেকে উইন্ডসর প্রাসাদের রাজা, হোয়াইট হাউসের ধন কুবের কিংবা আফ্রিকার জঙ্গলের দরিদ্র গুহাবাসী, কারো নিস্তার নেই। অসন্তোষ যেমন গভীর তেমনি ব্যাপক। প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রত্যেক জাতির লক্ষ্য হচ্ছে সম্ভাব্য সবরকম উপায়ে একে অন্যের রক্ত শোষণ করা—এই শোষণের প্রয়োজন থাক বা না থাক। যখন প্রকাশ্য যুদ্ধ আরম্ভ হয়, তখন হত্যা ও লুন্ঠন ব্যাপকভাবে চলতে থাকে। হত্যা ব্যাপকতর হত্যার এবং লুন্ঠন ব্যাপকতর লুণ্ঠনের উন্মত্ততা সৃষ্টি করে; আর বিশ্ব ক্ষত-বিক্ষত হ’য়ে সম্পূর্ণরূপে অবসাদগ্রস্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত এই হত্যা ও লুন্ঠন চলে। অবসাদগ্রস্ত বিশ্ব কিছুকাল বিশ্রাম গ্রহণ করে। এই বিশ্রামের কালকে শান্তির কাল বলা হয়, কিন্তু এই তথাকথিত শান্তির সময়ে বৃহত্তর যুদ্ধের গোপন প্রস্তুতি চলে। এই প্রস্তুতিকে মোনাফিকি ও কূটনৈতিক ভাষায় বলা হয় যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন। বাহ্যত যুদ্ধের অবসান ঘটাবার জন্য জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হ’লেও এর আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, পরবর্তী যুদ্ধের জন্য মিত্রপক্ষ সংগ্রহ করা। মানুষে-মানুষে, শ্রেণীতে-শ্রেণীতে, জাতিতে জাতিতে বিদ্যমান রয়েছে ঘৃণ্য বিভেদ ও বিরোধ। প্রত্যেকের মুখেই সাম্য মৈত্রীর কথা লেগে আছে , কিন্তু তা যেন আধুনিকা মহিলার ঠোঁটের লিপস্টিক–উপহাস আর মিথ্যার বেশাতি আর কি! এই হল আধুনিক সভ্য জগতের মানবিক কর্মকান্ডের প্রকৃত অবস্থা।

মানব জাতি আজ তার পরিবেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা একেবারে হারিয়ে ফেলেছে এবং সবরকমের প্রচলিত জীবনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। মানুষের এই মনোভাব মুক্তির সন্ধান খুঁজছে। কিন্তু কোথায় সে মুক্তি? দরিদ্রের মধ্যে এরূপ মনোভাব সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ শুধু টিকে থাকার জন্যে তাদেরকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অবিরাম কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। তারা অভাবের মধ্যে জন্মে, অভাবের মধ্যে জীবন কাটায়, অভাবের মধ্যে মারা যায়। জীবনের স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ তারা পায় না। কিন্তু ধনীরা কি সুখী ? যদি প্রাচুর্যের মধ্যে সুখ থাকতো তবে ধনীরা সুখী হতে পারতেন। দু’শ বছর আগে রুশো যা বলেছিলেন আজও তা সত্য। তিনি বলেছিলেন,

“মানুষ জন্মায় স্বাধীন কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত ।”

মানুষ অতিকষ্টে জীবনের পথ অতিক্রম করে তার পূর্ব পুরুষদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পরিবেশ রূপ কারাগারের ভিতরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এটাই হল মানব জীবনের সাধারণ অবস্থা। কিন্তু ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে কোন অসাধারণ মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যিনি পরম্পরাগত ও সাধারণ জীবনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাঁর মনোমত এক নতুন দুনিয়া গড়ে তোলার জন্য দৃঢ় সংকল্প ও আশা নিয়ে কঠোর প্রচেষ্টা চালান। এভাবে অতীত ও বর্তমানের সংঘর্ষের ভিতর থেকে উদয় হয় নতুন ভবিষ্যৎ। তবু কোথাও সুখ খুঁজে পাওয়া যায় না। শৃঙ্খলিত মানবজাতি নিজেকে এক বন্ধন থেকে মুক্ত ক’রে অপর বন্ধনকে আলিঙ্গন করে। সে তার পূর্ব পুরুষ রচিত কারাগার পরিত্যাগ ক’রে বন্দী হয় নিজের তৈরী কারাগারে। তবে কি মানব জাতির মুক্তি নেই ? জীবন কি তবে অবিরাম কারা- পরিবর্তন? পাখী যেমন পানিতে আর মাছ যেমন পানির বাইরে সুখী হতে পারে না, তেমনি মানুষ এমন কোন পরিবেশে সুখের সন্ধান পেতে পারে না যে পরিবেশ তার প্রকৃতি-বিরদ্ধ । এ কথা সত্য যে, অতীতের ভগ্নাবশেষের উপরই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ; কিন্তু এটা অধিকতর সত্য যে, যে জীবনব্যবস্থা মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটানোর এবং তার দেহ, মন ও মস্তিষ্কের ক্রমোন্নতি সাধনের অধিকার ও সংযোগ প্রদান করে না, পক্ষান্তরে অজ্ঞতাপ্রসূত ভ্রান্ত নীতির ভারী হাতুড়ি চালিয়ে মানুষের প্রকৃতিকেই পীড়ন, দমন ও বিকৃত করতে চায়, সে ব্যবস্থায় মানুষ সুখী হতে পারে না। যে জীবনব্যবস্থা মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সুসমঞ্জস্য, যে জীবনব্যবস্থা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনকে স্বীকার করে এবং এ সব প্রয়োজন পরিতৃপ্তির সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্দেশ করে সেই জীবনব্যবস্থায় মানুষ দাসত্ব বন্ধন থেকে মুক্ত হাতে পারে, হতে পারে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন।

কিন্তু প্রশ্ন হ’ল মানুষের সেই মৌল প্রকৃতি কিভাবে উদ্ঘাটন ও নিরূপণ করা সম্ভব ? মানুষে যখন প্রকৃতির ক্রোড়ে বাস করতে এবং যখন তার ভাগ্য প্রকৃতির প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত হত, সে সময়ের কাহিনী বিস্মৃতির কুহেলিকায় ঢাকা প’ড়ে গেছে। বর্তমানে বাহ্য দৃষ্টিতে যা মানুষের প্রকৃতি বলে মনে হয়, তা তার আসল প্রকৃতি নয়, এটা তার কৃত্রিম রূপ । আর এই কৃত্রিম রূপ সৃষ্টি হয়েছে অম্বাভাবিক উপায়ে গঠিত, মানুষের প্রকৃতি-বিরদ্ধে অভ্যাসের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে। একজন পাকা আফিংখোর যদি যথাসময়ে আফিং খেতে না পায় তবে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই বলে আফিং খাওয়া তার প্রকৃতিগত বললে মারাত্মক ভুল হবে বরং এটা তার একটি জঘন্য অভ্যাস, যা সে কৃত্রিমভাবে গড়ে তুলেছে এবং যা তার প্রকৃতির শত্রু। এভাবে, যেমন অনাবশ্যক দৈহিক প্রয়োজন কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্টি করা হয়, তেমনি মানুষের কৃত্রিম জড় পরিবেশ মানুষের মন ও মস্তিষ্ককে বিকৃত করে। বিকৃত দেহ মন ও মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক মানুষকে অস্বাভাবিক মানুষে পরিণত করে।

পরিবেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিবাসী এই কৃত্রিম মাননুষেরা প্রকৃতির সঙ্গে অবিরাম দ্বন্দ্বে লিপ্ত আছে। এই ভাবে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষের উপবাসী আত্মা পরমাত্মার সাথে তার যোগসূত্র হারিয়ে ফেলেছে। অসুখী মানষ মুক্তি ও স্বাধীনতার আশায় বিরামহীন সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। মানষ অতীতকে ধংস করে তার নিজের পছন্দমত ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে; কিন্তু তার বিকৃত দেহ, মন ও বুদ্ধি কিভাবে তাকে সত্যিকার সুখের সন্ধান দেবে? যখন বিকলাঙ্গ ও অঙ্গহীন মানুষের অনুভূতি ও চিন্তা মানুষের আসল প্রকৃতি প্রকাশ করতে পারে না, যখন যুক্তি ও বুদ্ধি একেবারে অসহায় তখন কে অসুখী ও অন্ধ মানুষকে আলো জ্বেলে সঠিক পথ দেখাবে ? জড় পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত মানুষের যুক্তি ও বুদ্ধি কিংবা বিবেক ও ভাব নয়, স্বজ্ঞা দ্বারা প্রাপ্ত অলৌকিক উপলব্ধি মানষকে সঠিক পথ দেখাতে পারে। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও বিবর্তনের ইতিহাস নিরপেক্ষভাবে অধ্যয়ন করলে এই অবিসংবাদী সত্য পরিস্ফুট হয়ে ওঠে যে, যুগান্তকারী আবিষ্কার ও সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে স্বজ্ঞা, স্থূল ইন্দ্রিয়ের নিরীক্ষণ ক্ষমতা নয়। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, এডিসনের বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহার, শেক্সপীয়র ও কালিদাসের মহাকাব্য, ডারউইনের বিবর্তনবাদ, কাল—মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব এগুলোর কোনটিই আত্মমূখী যুক্তি ও বুদ্ধির অবদান নয়, এগুলো হচ্ছে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির ফল।

হঠাৎ নিউটনের মস্তিষ্ক তরঙ্গিত হল, আর তাঁর মানসচক্ষে ভেসে উঠলো এক যুগান্তকারী প্রশ্ন “আপেল পড়ে কেন ?” নিউটন জীবনে অসংখ্য বার আপেল পড়তে দেখেছেন কিন্তু এর আগে তাঁর মনে এ প্রশ্ন আর কখনো জাগেনি। এভাবে স্বজ্ঞার মাধ্যমেই আবিষ্কৃত হয়েছে বাষ্পীয় ও বৈদ্যুতিক শক্তি। সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি থেকেই রুশো শিখেছিলেন, “মানুষ জন্মায় স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।” বাহ্যেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে এই প্রত্যক্ষ সত্যের উপলব্ধি সম্ভবপর নয়। এর জন্য প্রয়োজন বাহ্য পঞ্চেন্দ্রিয়ের অন্তরালে লুক্কায়িত অন্তরিন্দ্রিয়-সমূহের ক্রিয়া। এ সব অন্তরিন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে তুলতে হলে এ সবের উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধনে একান্তভাবে আত্মনিয়োগ করা প্রয়োজন। স্থূল জ্ঞানেন্দ্রিয়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মানবীয় যুক্তি ও বুদ্ধি মানুষকে তার জড় পরিবেশের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারে না। তাই বিভ্রান্ত ও বিপথগামী মানব জাতিকে তার প্রকৃত সত্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য অনুভূতিলব্ধ জ্ঞান হামেশা চেষ্টা চালাতে থাকে।

অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে আজও মানুষ কৃত্রিম উপায়ে গঠিত ও পথভ্রষ্ট ; তার দেহ, মন ও মস্তিষ্কের কুহেলিকা—যাকে বেদান্তবাদীরা অবিদ্যা বলেন, তা ভেদ করে তার আসল প্রকৃতির সন্ধান পেতে পারে। নিজের নগ্ন প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি ও ধারণা যখন সুস্পষ্ট হবে এবং এই নগ্ন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংগ্রাম বন্ধ হয়ে যখন পরিপূর্ণ ঐক্য ও শান্তি স্থাপিত হবে তখনই মানুষ সুখী হবে। পবিত্র কুরআনে ব্যক্ত আল্লাহর বাণী মানুষকে নির্দেশ দিচ্ছে ধর্মে দৃঢ় হতে। আর ধর্মকে বলা হয়েছে, আল্লাহর প্রকৃতি – যে প্রকৃতি মানুষের প্রকৃতিকে গঠন করেছে ।

তথ্য সূত্র: The Creed of Islam- Abul Hashim
ধারাবাহিক ভাবে চলবে –

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.